এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
কখনও কখনও একটি গল্প পড়া হয় চোখ দিয়ে, আর কিছু গল্প পড়তে হয় হৃদয় দিয়ে। আয়েশার গল্প তেমনই। একসময় হয়তো কেউ তার দিকে তাকিয়ে শুধু দেখেছে—দুই হাত নেই। কিন্তু আয়েশা নিজেকে দেখেছেন অন্যভাবে। তিনি দেখেছেন স্বপ্ন, দেখেছেন সম্ভাবনা, দেখেছেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি দীর্ঘ পথ।
সেই পথের শুরুটা সহজ ছিল না। প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল প্রতিবন্ধকতা, ছিল নতুন করে শেখার চ্যালেঞ্জ। তবু তিনি থামেননি। দুই হাত নেই—তাই বলে কি স্বপ্ন দেখার অধিকার নেই? আয়েশা সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন নিজের জীবন দিয়ে।
পা দিয়েই তিনি শিখেছেন লিখতে। যে হাত দিয়ে অন্যরা কলম ধরে, আয়েশার কাছে সেই কলমের ঠিকানা হয়েছে পায়ের আঙুল। একসময় যে অক্ষরগুলো ছিল কঠিন, ধীরে ধীরে সেগুলোই হয়ে উঠেছে তার আপন ভাষা। পায়ের আঙুলের ফাঁকে ধরা কলমে একেকটি অক্ষর লিখতে লিখতে তিনি আসলে লিখেছেন নিজের ভবিষ্যৎ।
হয়তো কোনো কোনো দিন একটি অক্ষর লিখতেও সময় লেগেছে। হয়তো একটি পাতার শেষে পৌঁছাতে অন্যদের চেয়ে বেশি শ্রম দিতে হয়েছে। কিন্তু আয়েশা জানতেন—একটি অক্ষর মানে শুধু একটি অক্ষর নয়; একটি অক্ষর মানে আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। আর এভাবেই এগিয়েছেন তিনি। শিক্ষার পথে, জীবনের পথে।
আয়েশার এই অসাধারণ সংগ্রামী জীবনকে পর্দায় উপস্থাপন করেছেন মোস্তফা মল্লিক। পেশায় সাংবাদিক। শিশুসাহিত্যিক ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরের প্রযোজনায় এটি পরিকল্পনা ও পরিচালনা করেছেন চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি মোস্তফা মল্লিক।
তার পরিচালিত ডকুমেন্টারি ‘পায়ের ছাপ’ যেন আয়েশার জীবনের সেই দীর্ঘ পথচলার দৃশ্যমান দলিল—যেখানে কষ্ট আছে, বঞ্চনা আছে, আছে সমাজের নানা সীমাবদ্ধতা; কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে আছে একজন মানুষের অদম্য আত্মবিশ্বাস।
‘পায়ের ছাপ’ নামটিও যেন গভীর কোনো প্রতীকের মতো।
আমরা প্রায়ই বলি, ‘হাত-পা ছাড়া মানুষ কীভাবে বাঁচবে?’ আয়েশার জীবন যেন সেই প্রশ্নটাকেই উল্টে দেয়।
তিনি যেন বলেন—হাত না থাকলেও মানুষ বাঁচতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে, পড়তে পারে, লিখতে পারে, সফল হতে পারে। শুধু দরকার বিশ্বাস। নিজের ওপর বিশ্বাস।
হয়তো আয়েশার পথ চলতে গিয়ে অনেকবার ক্লান্তি এসেছে। হয়তো কখনো মনে হয়েছে, অন্যদের মতো কেন নয় তার জীবন? হয়তো কোনো কোনো মুহূর্তে চোখের কোণে জমেছে অদৃশ্য জল। কিন্তু সেই জলকে তিনি থেমে যাওয়ার কারণ করেননি। বরং চোখের জল মুছে আবার কলম ধরেছেন—পা দিয়ে।
আমরা যাদের ‘স্বাভাবিক’ বলে ভাবি, তাদের কত সহজ সুযোগ! একটি কলম ধরতে আমাদের কোনো চিন্তা করতে হয় না। একটি বইয়ের পাতা উল্টাতে হয় না কোনো হিসাব। লিখতে বসলে হাতের দিকে তাকাতে হয় না। অথচ আয়েশার প্রতিটি লেখা যেন একটি অর্জন, প্রতিটি অক্ষর যেন একটি যুদ্ধজয়। তবু তিনি নিজেকে যোদ্ধা বলে দাবি করেননি। জীবনই তাকে যোদ্ধা বানিয়েছে।
মোস্তফা মল্লিকের ‘পায়ের ছাপ’ শুধু একটি ব্যক্তিজীবনের গল্প নয়। এটি আমাদের সমাজের জন্যও একটি আয়না। তার জীবনের গল্পে করুণার চেয়ে অনুপ্রেরণা বেশি। কান্নার চেয়ে সাহস বেশি। আর সীমাবদ্ধতার চেয়ে সম্ভাবনা।

আয়েশা উঠে দাঁড়িয়েছেন। হাত দিয়ে নয়, নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে। জীবনকে জয় করেছেন কোনো অলৌকিক শক্তিতে নয়—নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে। তাই ‘পায়ের ছাপ’ শেষ পর্যন্ত শুধু একটি ডকুমেন্টারির নাম হয়ে থাকে না। এটি হয়ে ওঠে একটি বার্তা— যে মানুষ স্বপ্ন দেখতে জানে, তার পথ কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয় না।
প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে শিক্ষা অর্জনের অদম্য আকাঙ্ক্ষায় এগিয়ে চলা আয়েশার জীবনসংগ্রাম এবার ছুঁয়ে গেল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি বোর্ডকে। বাংলাদেশের নির্মাতা মোস্তফা কামাল মল্লিক পরিচালিত প্রামাণ্যচিত্র ‘পায়ের ছাপ (Footprints)’ অর্জন করেছে ভারতের স্বামী বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২৬ এর ইন্সপেরিয়েশনাল ফিল্ম জুরি অ্যাওয়ার্ড।
ভারতের কলকাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। মল্লিকের পক্ষে আয়োজক কমিটি পুরস্কার গ্রহণ করেন।
অসাধারণ জীবনকাহিনিই ক্যামেরার ভাষায় তুলে ধরেছেন মোস্তফা কামাল মল্লিক। ‘পায়ের ছাপ’-এ আয়েশার ব্যক্তিগত সংগ্রাম, শিক্ষার জন্য তার লড়াই এবং আত্মবিশ্বাসের শক্তিকে অত্যন্ত অন্তরঙ্গ ও আবেগঘনভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল থেকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, আয়েশার অসাধারণ যাত্রা, শিক্ষালাভের জন্য তার নিরলস প্রচেষ্টা এবং গভীর আবেগ ও মানসিক শক্তির যে চিত্র নির্মাতা তার প্রামাণ্যচিত্রে তুলে ধরেছেন, তা উৎসবের জুরি বোর্ডকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছে।
শুধু পুরস্কারেই থেমে নেই ‘পায়ের ছাপ’-এর যাত্রা। উৎসব চলাকালে ৪ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যেই এসব প্রতিষ্ঠানে ছবিটি প্রদর্শিত হয়।
একজন মানুষের শারীরিক সীমাবদ্ধতা কীভাবে তার স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না—আয়েশার জীবন তারই উজ্জ্বল উদাহরণ। আর সেই গল্পকে পর্দায় তুলে ধরে ‘পায়ের ছাপ’ যেন হয়ে উঠেছে আরও অনেক মানুষের স্বপ্ন দেখার সাহসের গল্প।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই স্বীকৃতি তাই শুধু একটি পুরস্কার নয়; এটি আয়েশার অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং বাংলাদেশের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের জন্যও একটি সম্মানের মুহূর্ত।
‘পায়ের ছাপ’—নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে সেই বার্তা: মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার সংগ্রামের চিহ্ন থেকে যায়। আর কোনো কোনো মানুষের সেই চিহ্ন হয়ে ওঠে অন্যের পথচলার অনুপ্রেরণা। হয়তো পৃথিবী বারবার বলে দেবে—‘তুমি পারবে না।’ তবু কোথাও না কোথাও একটি পা সামনে বাড়ানো যায়। একটি পা। তারপর আরেকটি। আর সেই ছোট ছোট পায়ের ছাপই একদিন তৈরি করে দেয় সাফল্যের দীর্ঘ রাস্তা। আয়েশার সেই পথচলার নামই—‘পায়ের ছাপ’।









