এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
গণিতের অন্যতম কঠিন ও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা ‘নেভিয়ার-স্টোকস এক্সিস্টেন্স অ্যান্ড স্মুথনেস’-এর সমাধান খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রায় ১০ হাজার এআই এজেন্টকে কাজে লাগিয়ে মাত্র ৮৮ ঘণ্টায় সমস্যাটির একটি সমাধান খুঁজে পেয়েছে তারা।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
‘নেভিয়ার-স্টোকস এক্সিস্টেন্স অ্যান্ড স্মুথনেস’ গণিতের সাতটি বিখ্যাত ‘মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেম’-এর একটি। তবে ওপেনএআইয়ের এই দাবি এখনো বৃহত্তর গণিতবিদ সমাজের স্বাধীন যাচাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে।
নেভিয়ার-স্টোকস সমীকরণ তরল ও গ্যাসের গতিবিধি বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হয়। আবহাওয়ার পূর্বাভাসসহ তরলগতিবিদ্যার বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
এই সমস্যার মূল প্রশ্ন হলো নেভিয়ার-স্টোকস সমীকরণের সমাধান সব পরিস্থিতিতে মসৃণ ও সসীম থাকে কি না, নাকি নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতিতে সমীকরণটি এমন একটি ‘সিঙ্গুলারিটি’ তৈরি করতে পারে, যেখানে সীমিত সময়ের মধ্যে তরলের বেগ অসীম হয়ে যায়।
ওপেনএআইয়ের দাবি, তাদের তৈরি প্রমাণে এমন একটি পরিস্থিতির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
ওপেনএআই জানিয়েছে, পুরো প্রক্রিয়ায় এআই এজেন্টগুলোর মধ্যে প্রায় ৪৯ লাখ বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে এবং প্রায় ৩০ হাজার কোটি আউটপুট টোকেন ব্যবহার করা হয়েছে।
এর মধ্যে শুধু নেভিয়ার-স্টোকস সমস্যা সমাধানের কাজেই প্রায় ২৭ লাখ বার্তা এবং ১৩ হাজার কোটি টোকেন ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষণায় বিভিন্ন এআই এজেন্টকে আলাদা দলে ভাগ করে কাজ করানো হয়। ওপেনএআইয়ের গবেষক ড্যান রবার্টস এ প্রক্রিয়ায় নিজেদের ভূমিকার তুলনা করেছেন মৌমাছির সঙ্গে, যারা বিভিন্ন দলের মধ্যে ঘুরে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে নতুন ধারণার বিকাশে সহায়তা করেছে।
ওপেনএআইয়ের গবেষক সেবাস্তিয়ান বুবক বলেছেন, গত এক বছরে এআই সক্ষমতার ধারাবাহিক উন্নতির একটি উল্লেখযোগ্য ফল এই অর্জন।
গবেষণা প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন দলের মধ্যে মূল ধারণাগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আর লিইন নামের প্রোগ্রামিং ভাষায় রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং ব্যবহার করে গাণিতিক প্রমাণটি তৈরি করা হয়েছে।
বাইরের বিশেষজ্ঞদের যাচাইয়ের সুযোগ করে দিতে ওপেনএআই তাদের প্রমাণের ওপর একটি গবেষণাপত্রও প্রকাশ করেছে।
তবে ওপেনএআইয়ের গবেষণা বিজ্ঞানী নোয়াম ব্রাউন স্বীকার করেছেন, এ ধরনের কম্পিউটেশনাল প্রক্রিয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তার মতে, প্রযুক্তির দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের কাজের পরিচালন ব্যয় কমে আসতে পারে।
গণিতের এত উচ্চপর্যায়ের একটি সমস্যায় এআইয়ের সম্ভাব্য সাফল্যকে অনেকে যুগান্তকারী অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। তবে একই সঙ্গে গণিত গবেষণায় মানুষের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের গণিতের অধ্যাপক টেরেন্স টাও বলেন, এ ধরনের কঠিন সমস্যাগুলো বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টাকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে কেন্দ্রীভূত করে। তবে এআই যদি মানুষের হয়ে সমস্যার সমাধান করে দেয়, তাহলে গণিতের গভীর বোঝাপড়ার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তার মতে, নিজে কোনো সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করার মধ্য দিয়ে মানুষ যে জ্ঞান অর্জন করে, এআইয়ের তৈরি সরাসরি সমাধান সেই শেখার প্রক্রিয়াকে প্রতিস্থাপন করতে পারে।
টাও এ ধরনের প্রযুক্তিকে এমন একজন গাইডের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যিনি কোনো জলপ্রপাতের কাছে যাওয়ার একটি পথ দেখিয়ে দেন। পথটি কাজে লাগলেও মানুষ তখন অন্য সম্ভাব্য পথ খোঁজার আগ্রহ হারাতে পারে।
মার্কিন অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ক্লে ম্যাথমেটিকস ইনস্টিটিউট ২০০০ সালে নেভিয়ার-স্টোকস সমস্যাটিকে সাতটি ‘মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেম’-এর একটি হিসেবে ঘোষণা করে। সমস্যাটির সমাধানের জন্য ১০ লাখ ডলার পুরস্কার নির্ধারণ করা হয়।
সাতটি সমস্যার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি সমস্যার সমাধান গণিতবিদদের কাছে স্বীকৃত হয়েছে।
আমেরিকান ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটি ওপেনএআইয়ের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, এই সমস্যার সমাধানের প্রচেষ্টা ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষণা ভবিষ্যতে গণিত ও মানব জ্ঞানের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনতে পারে।
তবে ওপেনএআইয়ের দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার আগে স্বাধীন গণিতবিদদের যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নেভিয়ার-স্টোকস সমস্যার ‘সমাধান’ হিসেবে এই দাবিকে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দিতে এখনো আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।









