চ্যানেল আই অনলাইন
Advertisement
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • চ্যানেল আই টিভি
  • আরও
    • কর্পোরেট নিউজ
    • কৃষি
    • তথ্যপ্রযুক্তি
    • মতামত
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

বুড়ি ও একটি কুকুর

আরখান সোহেল by আরখান সোহেল
2:44 অপরাহ্ন 28, জানুয়ারি 2025
in শিল্প সাহিত্য
A A
একটি সুন্দর কুকুরের মুখের ছবি, চোখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

কাজ শেষ করে প্রতিদিনের মত আজও বের হয়েছি রাত দশটার পর। আমার দুইটা-দশটা শিফট। এখান থেকে বাসায় যেতে যেতে প্রায় এক ঘণ্টা থেকে সোয়া ঘণ্টা লেগে যায়। আজকে যাওয়ার সময় মায়ের জন্য ওষুধ কিনে নিয়ে যেতে হবে। দুপুরে বের হবার আগে মা দ্বিতীয়বারের মত আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যেন তার রাতে তার ওষুধ নিয়ে যাই। কাজের জায়গার আশেপাশে কোন ফার্মেসি নেই। বাসার কাছের শেষ বাস স্টপেজে নামার পর কয়েকটা ফার্মেসি আছে। সাধারণত ওগুলি রাত বারোটার আগে বন্ধ হয় না। কাজেই ওষুধ নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করার কিছু নেই।

আমার মায়ের জটিল একটা শ্বাসকষ্টের রোগ। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি। এদেশে তার পুরোপুরি ভালো হবার মত চিকিৎসা যে নেই তা নয়, কিন্তু তাতে প্রচুর টাকা পয়সার মামলা। আমার মত সাধারণ একটা চাকরি করে এতো টাকা সারা জীবনেও জোগাড় করা সম্ভব হবে না যদি না কোন অলৌকিক উপায়ে ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। জীবনে অনেক অলৌকিক কাহিনী শুনেছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কারো কপালে ওটা ঘটেছে বলে স্বচক্ষে দেখিনি, নিজেরটা তো দূরে থাক।

মায়ের কষ্ট দেখে প্রতিদিন মন খারাপ হয়। মনে মনে ভাবি আমি এমন এক অক্ষম সন্তান যে জন্মদাত্রী মায়ের সামান্য চিকিৎসাটুকু পর্যন্ত করাতে অসমর্থ। প্রায় রাতেই শুনি মা শ্বাস কষ্টে ভুগছেন। পাশের ঘর থেকে মায়ের কষ্ট করে শ্বাস প্রশ্বাস নেয়ার শব্দ শুনি। এক একটা শব্দে আমার বুকটা কেঁপে ওঠে। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারি ওভাবে শ্বাস নিতে মায়ের কি কষ্টটাই না হচ্ছে। তার কষ্টের কথা ভাবি আর কেঁদে কেঁদে বালিশ ভেজাই।

মা কতবার বলেছে –খোকা, একটা বিয়ে-শাদি কর। বয়স তো কম হল না তোর। এখন না করলে আর কবে বিয়ে করবি। আমি হেসেই উড়িয়ে দিয়ে বলি –বেতনটা একটু বাড়ুক মা, তারপর দেখি কি করা যায়। মা হাল ছেড়ে দেয়। আমার মনে হয় মাও বুঝতে পারে আমি কেন বিয়ে করতে চাই না। আমার যা রোজগার, তাতে বিয়ে করলে সংসার খরচ চালিয়ে মায়ের জন্য আর সামান্য ওষুধ কেনার টাকাটাও অবশিষ্ট থাকবে না। জরুরি প্রয়োজনে ডাক্তার দেখানো বা অসুখের পরীক্ষা নিরীক্ষার খরচের কথা তো বাদই দিলাম।

এসব চিন্তা করতে করতে বাসটা আমার গন্তব্যের স্টপেজে এসে থামল। রাস্তা পার হয়ে বিসমিল্লাহ ফার্মেসি থেকে মায়ের জন্য ওষুধগুলি কিনে পকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে নিলাম। এখান থেকে বাসায় যেতে প্রায় পনেরো মিনিটের হাঁটা পথ। বড় রাস্তা থেকে একটা গলি চলে গেছে ঝিলের দিকে।সেই ঝিলটা থেকে সামান্য একটু পড়েই আমার দুই রুমের ছোট ভাড়া বাসা। আমি গলিটা ধরে হেঁটে যাচ্ছি। রাস্তায় খুব একটা আলো নেই। রাস্তার দুপাশের অধিকাংশ বাতিই অকেজো। আশেপাশের বাসাবাড়ি থেকে আলো এসে সেই আলোর স্বল্পতা কিছুটা লাঘব করেছে। ঝিলের পাশ ধরে যাচ্ছিলাম। কিছুটা যাবার পরেই একটা মানুষের মত অবয়ব চোখে পড়লো। মনে করলাম হয়তো কোন ভিখারি। শহরের শত শত ভিখারি অথবা গৃহহীন মানুষের মত এও একজন। কাছে আসতেই দেখলাম প্রায় ময়লা জীর্ণ শীর্ণ একটা সাদা শারি পড়ে কে একজন বসে আছে। মাথাটা নোয়ানো থাকায় তার চেহারাটা ঠিক দেখা গেলো না। কিন্তু মাথার চুল উষ্কখুষ্ক, সাদা আর জটপাকানো। দেখে মনে হল অতি বয়স্ক কোন নারী হবে। আর কোলের সামনে ছোট একটা কুকুর। হয়তো এই নারীর পালিত কুকুর হবে। আমি পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। কিন্তু চলতে গিয়েও মনে হল আমার প্যান্টটার নিচের অংশ কে যেন টেনে ধরেছে। ঘাড় ঘুড়িয়ে চেয়ে দেখি সেই বৃদ্ধ মহিলা তার বা হাত দিয়ে আমার প্যান্টটা টেনে ধরেছে। আর মুখটা উঁচিয়ে ডান হাতটা নিজের মুখের দিকে এগিয়ে দিয়ে সংকেতে বোঝাতে চাচ্ছে সে খুব ক্ষুধার্ত, খাবার চায়। বৃদ্ধের এই আচরণ দেখে খুব বিরক্ত হলাম আমি। এতো রাতে একজন পথচারিকে রাস্তায় থামিয়ে এভাবে খাবার চাওয়া কি ধরনের আচরণ। আমাকে এখন বাসায় যেতে হবে। মাকে ওষুধ খাওয়াতে হবে। এই সময়ে একজন এভাবে এতো রাতে খাবার চাচ্ছে। এদিকে পকেটে সামান্য কয়েকটা টাকা আছে মায়ের জন্য ওষুধ কেনার পর। ইচ্ছে করলেও তো এখন এদেরকে কোন খাবার কিনে দিতে পারবো না। এতো রাতে কোন দোকানপাটও এদিকটায় খোলা নেই যে কিছু খাবার কিনে দিবো। আমি আবার চলে যেতে উদ্যত হলাম। কিন্তু মনে হল বৃদ্ধা এবার আরও শক্ত করে আমার প্যান্টের কোণাটা টেনে ধরেছে। দেখে আমার বিরক্তি আরও বেড়ে গেছে। কোন মতে এই বৃদ্ধার কাছ থেকে পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে তার দিকে এগিয়ে দিলাম। কিন্তু টাকার প্রতি বৃদ্ধার কোন আগ্রহ আছে বলে মনে হল না। সে আবার ডান হাতটা মুখের সামনে নিয়ে এসে বোঝাতে চেষ্টা করলো সে খাবার চায়। ঠিক এই সময়ে কুকুর ছানাটিও তার কোল থেকে কেমন যেন একটা গোঙানির শব্দ করতে লাগলো। সেও বৃদ্ধার কোল থেকে বের হয়ে আমার পায়ে মাথা ঘসতে শুরু করে দিল। এই সময়ে খুব আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করলাম কুকুর ছানাটি তার পিছিনের একটা বা বাংলা অক্ষর “দ” এর মত করে উঁচিয়ে আছে। মনে হচ্ছে ওর একটা পা হয়তো আহত।

বৃদ্ধা আর ওই কুকুর ছানাটির এতো রাতের এই অদ্ভুত আচরনে আমি কেমন যেন বিচলিত হয়ে পড়লাম। একবার মনে হল, চারপাশে মানুষের এতো ঠগ জোচ্চুরি, ছিনতাই রাহাজানি। কতো খারাপ মানুষ কতো নানান বেশে এসে মানুষের সর্বনাশ করে যাচ্ছে। এরাও কি সেরকমের কেউ? আবার মনে হল, এরা যদি সত্যিই অনাহারে ক্ষুধার্ত অথবা বিপদগ্রস্ত হয় আর আমি যদি এদেরকে এভাবে অসহায় অবস্থায় পথে ফেলে যাই তাহলে কি আমার পাপ হবে না? কপালে যা থাক হবে। আমি মনস্থির করলাম এই ক্ষুধার্ত প্রাণী দুটিকে যদি আমি কিছু খাবার দিয়ে সাহায্য করতে পারি তাহলে আমার মন শান্তি পাবে। কিন্তু সেটা করতে গেলে এতো রাতে এদেরকে আমার বাসায় নিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। জানি না মা কি মনে করবে এদেরকে দেখে। আর বাসায় এই মুহূর্তে এদের জন্য কোন বাড়তি খাবার না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। একটা কিছুর ব্যাবস্থা হয়েই যাবে-এই ভেবে আমি বৃদ্ধার হাত ধরে তুললাম অনেক কষ্টে। তার দাঁড়াতে খুব কষ্ট হচ্ছিল বুঝতে পারলাম। সোজা হয়ে সে দাঁড়াতে পারে না, শরীরটা ধনুকের মত বাঁকানো। তাকে হাতে ধরে আস্তে আস্তে বাসার দিকে এগোতে লাগলাম। আর পিছনে সেই কুকুর ছানাটি তিনপায়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে আমাদেরকে অনুসরণ করতে লাগলো।

ভয়ে ভয়ে বাসার সামনে এসে দাঁড়ালাম। বুকটা দুরু দুরু করতে লাগলো। বাসার দরজার কড়া নেড়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম মা কখন দরজা খুলবে। সাধারণত এই সময়ে মা বিছানাতেই শুয়ে থেকে থেকে আমার জন্য অপেক্ষা করেন। আমার খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে তারপর উনি ঘুমাতে যান। মিনিট খানেক অপেক্ষার পর মা দরজা খুলেই ঘুম ঘুম চোখে বললেন –কিরে আজ এতো দেরি কেন? এটা বলেই মা পাশ ফিরে ঘরের ভিতর যাবার উদ্যোগ নিয়েও আবার আমার দিকে তাকালেন। হয়তো এতক্ষণ সে ধরেই নিয়েছিলেন আমি প্রতিদিনের মতই একা। আমার সাথে যে অন্য কেউ রাতে বাসার আসতে পারে সেটা ওনার মনের মধ্যেই কখনও ছিলনা। এবার আমার পাশে বৃদ্ধাকে দেখে একটু চোখ কচলিয়ে বললেন –এরা কারা? আমি মুখ কাচুমাচু করে বললাম –মা, এদেরকে পথে বসে থাকতে দেখলাম। খাবার চাইলো। কোথাও তো এতো রাতে খাবার পাওয়া যাবে না, তাই বাসাতেই নিয়ে নিয়ে এলাম। এতো রাতে এরকম ভিক্ষুক ধরনের এক বুড়ি আর সাথে একটা কুকুরের ছানা দেখে কারো যে উল্লসিত হবার কথা না সেটা আমি ভালো করেই বুঝি। মা বললেন –খাবার চাইলো আর বাসায় নিয়ে এলি? তোর মাথাটা কি গেছে? মুখে বললেন বটে, কিন্তু দরজার দুটি পাল্লাই খুলে দিলেন। আমি বুড়ি আর কুকুর ছানাটি নিয়ে আমাদের ছোট খাবারের ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। আমি আর মা ফ্লোরে মাদুর পেতেই খাওয়া দাওয়া করি। ওদেরকে বসিয়ে রেখে রান্না ঘরে গেলাম। দেখলাম মা এর মধ্যেই হাড়ি পাতিলে খাবার কি আছে না আছে পরখ করে দেখছে। আমাকে দেখেই বললেন –খাবার যা আছে তা ওদেরকে খেতে দেবার পর আমাদের জন্য আর থাকবে না। আগে ওদেরকে খাইয়ে বিদায় কর। আমি চুলায় চাল বসিয়ে দেই। ওরা যাবার পর আমরা ভাত আর আলু ভর্তা খাবো।
মায়ের কথা মত বুড়িকে খাবার দিলাম। বুড়ি অনেক মজা করে ভাত আর মাছ খেলো। প্রায় দুই প্লেট ভাত খেয়ে বুড়িকে এখন একটু সতেজ দেখাচ্ছে। কুকুর ছানাটিকেও মা একটা পুরনো খবরের কাগজের উপর একটু মাছ আর ভাত দিলো। সেও সবটুকু চেটেপুটে খেয়ে ফেললো।

খাবার দাবার শেষ হবার পর বুড়িকে বললাম –খাওয়া তো হল। এখন তোমরা যেতে পারো। আমার কথা শুনে বুড়ি অবাক হয়ে বলল –কি বল বাবা, এতো রাতে কোথায় যাবো? আমাদের কি আর থাকার জায়গা আছে? রাতটা থেকে সকালে যাই? একথা শোনার পরে আমি আর মা দুজনেরই বিরক্ত হলাম। মনের অবস্থা যে কিরকম হল ঠিক বলতে পারবো না। বলা নেই কওয়া নেই, রাতের বেলা এক পথের বুড়ি বাসায় এসে হাজির, সাথে আবার একটা কুকুরের ছানা। খাবার দেবার পর এখন তারা রাতটাও এই ছোট ঘরে থেকে যেতে চাচ্ছে। বুড়ির এই কথা শোনার পর মা আমাকে ওনার ঘরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন –কিরে এখন কি করবি? এরা তো রাতে ঘরে ঘুমাতেও চায়। কি যে ঝামেলা তুই রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে এলি। যা গিয়ে বল হবে না। ওদেরকে এখনই যেতে হবে। আমি এতো ঝামেলা সহ্য করতে পারবো না। কে জানে হয়তো দেখা যাবে রাতের বেলা চুরি করে হয়তো পালিয়েও যেতে পারে। মায়ের কথা শুনে আমি মাথা চুলকাই। কি করে যে এতো বয়স্ক একজন বুড়ো মানুষকে এই রাতে ঘরের বাইরে বের করে দেই। কোথায় যাবে ওরা এতো রাতে? দিনের বেলা হলেও না হয় কথা ছিল।

মাকে বললাম –ঝামেলাটা বুঝি মা। কিন্ত কি করে যে ওদেরকে চলে যেতে বলি…। একটা রাতই তো মাত্র। মা আমার মনের ভাবটা বুঝতে পারলেন। বললেন –আচ্ছা ওরা রাতে থাকুক। কিন্তু বলে দে সকাল সকাল যেন বিদায় হয়। মায়ের এই কথা শুনে আমি বুড়ির জন্য একটা চাদর আর কাঁথা নিয়ে গিয়ে খাবারের ঘরের মাদুরের উপর রেখে বুড়িকে বললাম –এখানে থাকেন আজ রাতে। কিন্তু সকাল হলেই কিন্তু চলে যাবেন, বুঝলেন? বুড়ি হেসে বলল –বাবা, অনেক উপকার করলে। সকাল হলেই আমরা চলে যাবো। কিছুক্ষণ পরে এসে উঁকি দিয়ে দেখি বুড়ি কাঁথা মুড়ি দিয়ে জবুথবু হয়ে ঘুমাচ্ছে। আর কুকুরের ছানাটিও সে কাঁথার ভিতরে বুড়ির বুকের মধ্যে সামান্য নড়াচড়া করছে। হয়তো সেও ঘুমানোর চেষ্টা করছে।

রাতে আমি আর মা আলূ ভর্তা দিয়ে ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। রাতের ঝামেলার পর ঘুমাতে ঘুমাতে যেমন দেরি হয়েছে, ঘুম থেকে উঠতে উঠতেও দেরি হয়ে গেলো। টেবিল ঘড়িটার দিকে চেয়ে দেখি নয়টা। আমি ঘুম থেকে উঠেছি টের পেয়ে মা আমার ঘরে এসে বললেন –যায়নি। বুঝলাম মা কি বলতে চাচ্ছেন। খাবারের ঘরে গিয়ে দেখি বুড়ি তখনও কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু কুকুর ছানাটি ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে। কাল রাতে ওকে যতটা খোঁড়াতে দেখেছিলাম এখন তার চেয়ে একটু ভালো মনে হচ্ছে, যদিও এখনও কিছুটা খোঁড়াচ্ছে।

বুড়ির ঘুম ভাঙতে ভাঙতে সকাল দশটা হয়ে হয়ে গেল। তাকে বললাম –অনেক বেলা হয়ে গেছে। এখন যেতে পারেন। আমার কথা শুনে বুড়ি মুখটা কিছুটা ব্যাথিত ভাব করে বলল -বাবা, শরীরটা খারাপ লাগছে। গায়ে জ্বর জ্বর। একটু ভালো হলেই চলে যাবো। তার কথা শুনে এবার আমার সত্যিই মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। বুড়ি বলে কি? রাতে দয়া করে ঘরে নিয়ে এসে কি আমি অন্যায় করেছি? আসলে মানুষের উপকার করতে নেই। এই বুড়ি কি এখন এখানে থেকে যাবার পরিকল্পনা করছে? একবার মনে হল বুড়ির মুখের উপর বলে দেই –দেখো বুড়ি, তোমার এইসব টালবাহানা শিকেয় তুলে রাখো। রাতে খেতে দিয়েছি, ঘুমাতে দিয়েছি এতেই তো তোমার শোকর করা উচিৎ। এখন আরও থাকতে চাচ্ছ? তুমি দেখনা আমাদের অবস্থা? নিজেদেরই খেতে পড়তে মাথার ঘাম পায়ে পড়ে। তার উপর তুমি আর তোমার কুকুরকে দিনের পর দিন খেতে আর থাকতে দিতে পারবো না। তাড়াতাড়ি বিদায় হও, এক্ষুনি। কিন্তু যা ভাবলাম, মুখ দিয়ে তার কিছুই বের করতে পারলাম না। হয়তো আমি মানুষ হিসেবেই দুর্বল। এরকম কড়া কথার বলার হিম্মতই হয়তো আমার নেই। মায়ের সাথে অনেক শলা পরামর্ষের পর এসে বুড়িকে বললাম – দেখো বুড়ি, আমাদের গরিবের সংসার। দুজনের চলতেই কষ্ট হয়। ইচ্ছা থাকলেও তোমাদের আজকের পরে আর রাখতে পারবো না। তার উপর মা অসুস্থ। রান্না বান্না করতেও তো তার সমস্যা। দয়া করে তোমরা আজকেই চলে যাও। আমার কথা শুনে বুড়ির মুখটা কালো হয়ে গেলো। তারপর জিজ্ঞেস করলো –তোমার মা অসুস্থ? কি হয়েছে? আমি বললাম –ওনার শ্বাসকষ্টের রোগ। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারেন না। তারপর বুড়ি মাথাটা একটু নিচু করে কিছুক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল –ঠিক আছে বাবা। আমার শরীরটা একটু ভালো হোক। আজ যদি নাও পারি, কাল সকালের মধ্যে অবশ্যই যাবো। কথাটা শুনে এই ভেবে একটু খুশি হলাম যে যাক, শেষ পর্যন্ত বুড়ির মুখ থেকে অন্তত চলে যাবার একটা ওয়াদা বের করা গেছে।

সেদিন দুপুর বেলা বুড়ি আর তার কুকুর ছানাটিকে খাবার দিলাম। দুপুরে আমাকে কাজে যেতে হবে। যাবার সময় দেখলাম বুড়ি বাসার সামনে ছোট সিঁড়িটায় বসে আছে। আর সামনে কুকুর ছানাটি এদিক ওদিক দৌঁড়ে বেড়াচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে ওর খোঁড়া ভাবটা অনেকটাই ভালো হয়ে গেছে। আমাকে দেখেই বুড়ি বলল-চিন্তা করবা না, আমি কালই চলে যাবো।

কাজ থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে যথারীতি রাত এগারোটা বেজে গেলো। আজ আর দরজার কড়া নাড়তে হল না। দেখি ঘরের দরজাটা খোলা। ঘরে ঢুকেই খুব আশ্চর্য হলাম। খাবারের ঘরে মা বসে আছে বুড়ির পাশে। দুজনারই মুখে হাসি। হয়তো তারা গল্প গুজব করছিল। দুপুর পর্যন্ত দেখে গেছি মা বুড়ির প্রতি খুব একটা প্রসন্ন না। আর এখন দেখি দুজনই বেশ খোশ মেজাজে আছে। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, কুকুর ছানাটি তার ঠিকানা বদল করে বুড়ির কোল থেকে আমার মায়ের কোলে আশ্রয় নিয়েছে। আমাকে দেখেই বুড়ি ফোকলা দাঁত বের করে বলল – তোমার মায়ের সাথে গল্প করি। খুব ভালো মানুষ। আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুখে একটা কৃত্রিম হাসি এনে বললাম –খুব ভালো।

আমাকে দেখে মা বললেন –তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে খেতে আয়। মা যেভাবে কথা বলছিলেন তাতে মনে হল তার মনের অবস্থা অনেক ফুরফুরে আজ। খেতে বসে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। মা মুরগির মাংস রান্না করেছে। সাথে ডাল। আমি জানি ঘরে কোন মুরগির মাংস ছিলনা। মাংস কোত্থেকে এলো জিজ্ঞেস করতেই মা বলল –আমিই আজকে বাজারে গিয়ে কিনে এনেছি। খুবই অবাক করা ব্যাপার। মা অনেক দিন হল বাজারে যায় না। কি এমন হল যে আজ একেবারে হুট করে এই পথের বুড়িটির জন্য একেবারে নিজেই বাজার থেকে মাংস কিনে আনলেন? একটু পরেই টের পেলাম উনি শুধু বুড়ির জন্যই না, কুকুর ছানাটির জন্য কিছু বাড়তি মাংস কিনেছে। খাবারের সময়ে বাটি থেকে মাংস তুলে তুলে কুকুর ছানাটির দিকে এগিয়ে দিচ্ছেন আর সেও সাথে সাথে সেগুলি পেটে চালান করে দিচ্ছে। বুড়ি আর তার কুকুর ছানাটি মহা তৃপ্তি নিয়ে রাতের খাবার সাবাড় করলো।

খাওয়া হয়ে গেলে আমি মায়ের ঘরে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম –তুমি ওই বুড়ির জন্য মুরগির মাংস কিনে এনেছ? ওদের জন্য এতগুলি টাকা খরচ করলে মা। মা আমার কথা শুনে হয়তো একটু নাখোশ হলেন। বললেন –কিরকম অমানুষের মত কথা বলছিস। গরিব মানুষ, ঠিক মত খেতে পারে না। একটা দিন একটু ভালো খেতে পারলে ওদের কতো ভালো লাগে জানিস? আর করকম অসহায় কুকুর ছানাটি? আমাদের অনেক ভাগ্য ভালো যে আমরা ওদেরকে দুবেলা খেতে দেবার মত সুযোগ পেয়েছি। মায়ের কথা শুনে আর কিছু বলতে পারলাম না। ভাবলাম, মা যদি খুশি হয় ওদেরকে কিছু খেতে দিয়ে তো হোকনা।

ঘুমাতে যাবার আগে আমি আর মা বুড়িকে দেখতে আসলাম। দেখি সে কুকুর ছানাটিকে বুকের মধ্যে নিয়ে শুয়ে আছে। তারা ঘুমায়নি তখনও। মাকে দেখেই কুকুর ছানাটি তার পায়ের কাছে এসে ঘুরঘুর করতে শুরু করলো। বুড়ি উঠে বসে বলল –আমার শরীরটা এখন অনেক ভালো। সকালেই চলে যাবো। আমি আর মা, দুজনের মুখ থেকে কোন কথা বের হল না। আমি জানি, আমি আর মা, দুজনের মনের মধ্যেই একটা কথা। কিন্তু কিছুই বলতে পারলাম না।

সে রাতে আমার খুব ভালো ঘুম হল। হয়তো মায়েরও ভালো ঘুম হয়েছে। রাতে তার শ্বাস কষ্টে কুকিয়ে ওঠার কোন শব্দ শুনলাম না। আমি ঘুম থেকে উঠেছি টের পেয়ে মা আমার ঘরে এসে ঢুকলেন। তার মুখটা মলিন। আমি ভাবলাম হয়তো বুড়ি এখনও বিদায় হয়নি হয়তো তাই তার মুখটা আঁধার। আমি কিছু বলার আগেই মা বললেন –চলে গেছে। ওরা চলে গেছে। বুড়ি চলে গেছে এই কথাটা বলার সময় মায়ের চোখে মুখে খুশির পরিবর্তে একটা বিষাদের ছায়া দেখলাম। আমি খাবারের ঘরে মাকে নিয়ে এসে দেখি, মাদুরের উপরে চাদর আর কাঁথাটি পরিপাটি করে ভাঁজ করা। বুড়ি আর তার কুকুর ছানাটি ছাড়া ঘরটাকে কেমন জানি খালি খালি লাগছে।

আমি আর মা সকালের সামান্য নাস্তা খেয়ে দুজনে মাদুরে উপরে বসে আছি। সকালে খাবারের পর মাকে আমি রোজ ওষুধ খাবার কথা মনে করিয়ে দেই। আজও দিলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে মা বললেন- ওষুধ খেতে ইচ্ছে করছে না। কালও তো খাইনি। এখন অনেক ভালো বোধ করছি। যখন খারাপ লাগবে, তখন খাবো। যে মায়ের একবেলা ওষুধ না খেলে শ্বাসকষ্টের শব্দ আরেক ঘর থেকে শোনা যায়, সেই মা আজ দুদিন ধরে ওষুধ না খেয়ে আছে। কী আশ্চর্য!

Tags: গল্পশিল্প সাহিত্য
Previous Post

কিশোরগঞ্জে ট্রেন বন্ধ থাকায় বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীদের ভিড়

Next Post

ট্রাম্পের আদেশে গুগল ম্যাপে মেক্সিকো উপসাগর হলো আমেরিকা উপসাগর

Next Post
Donald Trump with a map of the Gulf of America in the background. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

ট্রাম্পের আদেশে গুগল ম্যাপে মেক্সিকো উপসাগর হলো আমেরিকা উপসাগর

রাজশাহীর ক্রিকেটাররা হতাশ, চেক বাউন্সের অভিযোগে. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

আবার চেক বাউন্সের অভিযোগ, হতাশ রাজশাহীর ক্রিকেটাররা

সর্বশেষ

জেমসের নতুন গানের পরিবেশনা, মঞ্চে গিটার ও মাইক্রোফোন হাতে শিল্পী. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

ঘর ছেড়ে আজিজ বোর্ডিং, সংগীতে আজও অপ্রতিরোধ্য জেমস

অক্টোবর 2, 2026

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচ কবে, কার বিপক্ষে, কোথায়

অক্টোবর 2, 2026
প্রাকৃতিক পরিবেশে মিথিলা সুন্দরভাবে ছবি তুলেছেন. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

মিথিলার ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন

অক্টোবর 2, 2026

দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কাজ চলছে: মাহদী আমিন

অক্টোবর 1, 2026

২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ শুরু কবে, জানাল আইসিসি

অক্টোবর 1, 2026
iscreenads
চ্যানেল আই অনলাইন লোগো, বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংবাদ পোর্টাল. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: জাহিদ নেওয়াজ খান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
info@channelionline.com
online@channeli.tv (Online)
news@channeli.tv (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • প্রচ্ছদ
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT