মার্কিন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থা সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ২১ হাজারের বেশি মানুষ মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত হয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে এই ভাইরাসে আক্রান্ত কোন রোগী শনাক্ত হয়নি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাংকিপক্সের জন্য এখনই কোন ভ্যাকসিনের প্রয়োজন নেই। তবে তারা বলছেন, ভাইরাসটি প্রতিরোধ করার জন্য বেশ কিছু কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
মাঙ্কিপক্স একটি বিরল ও স্বল্প পরিচিত রোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার উষ্ণ ও আর্দ্র বনাঞ্চলের বানররা ছিল এ রোগের প্রথম শিকার। তারপর একসময় মানবদেহেও সংক্রমিত হওয়া শুরু করে রোগটি।
ভারতে মাঙ্কিপক্সে মৃত্যু ১
ভারতে এখন পর্যন্ত মাঙ্কিপক্সের নয়টি ঘটনা ঘটেছে যার মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার জাতীয় রাজধানীতে ৩১ বছর বয়সী এক মহিলা মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত হয়েছেন। দেশে নারীদের মধ্যে এই রোগের প্রথম ঘটনা এটি। মোট নয়টি কেসের মধ্যে চারটি মামলা দিল্লির এবং বাকি পাঁচটি কেরালা থেকে রিপোর্ট করা হয়েছে।
কেরলের ত্রিশূরে প্রথম মাঙ্কিপক্সে সংক্রমিত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ২২ বছরের এক যুবকের। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে কেরলে ফেরেন ওই যুবক। বিদেশে থাকাকালীন-ই ওই যুবক মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত হন। কিন্তু ওই যুবকের দেহে কোনও র্যাশ ছিল না। ফলে তার যে মাঙ্কিপক্স হয়েছে কিনা প্রথমে বুঝতে পারেননি চিকিৎসকরা। জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ থাকায় তাকে ২৭ জুলাই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে ভর্তির পর বিদেশ-ফেরৎ ওই যুবকের মৃত্যু হয়। যুবকের মৃত্যুর পরই জানা যায় যে, তিনি মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত ছিলেন।
কারণ মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত হয়ে ওই যুবকের মৃত্যু হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে নমুনা গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছিল। সেখানেই তার মাঙ্কিপক্সে সংক্রমণের রিপোর্ট পজিটিভ আসে। এমনটাই জানান কেরলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বীণা গর্গ।
বাংলাদেশেও ভাইরাসটি নিয়ে আতঙ্ক ছড়ায়। তুরস্কের এক নাগরিক দেশে আসার পর তার শরীরে ভাইরাসটি রয়েছে বলে আতঙ্ক ছড়ায়। অবশ্য বিমানবন্দর থেকে সরাসরি তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে জানানো হয়, তার শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়নি।
ভাইরাসটির দু’টি রূপান্তরিত ধরণ
মাঙ্কিপক্স একটি ভাইরাসজনিত অসুখ। স্মলপক্স ভাইরাস শ্রেণির একটি ভাইরাস এ রোগের জন্য দায়ী। ভাইরাসটির দুটি রূপান্তরিত ধরন রয়েছে—মধ্য আফ্রিকান ও পশ্চিম আফ্রিকান।
রোগটির বিভিন্ন লক্ষণের মধ্যে রয়েছে জ্বর, মাথাব্যথা, ঘেমে যাওয়া, পিঠে ব্যথা, মাংসপেশির টান ও অবসাদ। প্রথম পর্যায়ে রোগীর জ্বর আসে, পাশাপাশি শরীরে দেখা দেয় ফোস্কা ও অধিকাংশ ঘটনায় শুরুতে মুখে ফুসকুড়ি ওঠে। পরে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে; বিশেষ করে হাত ও পায়ের তালুতে।
১৯৭০ সালের পর থেকে আফ্রিকার ১১ দেশে মাঙ্কিপক্স সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়। ২০১৭ সালের পর নাইজেরিয়ায় এবার সবচেয়ে বেশি এ রোগের প্রকোপ দেখা গেছে। দেশটিতে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৪৬ জনের দেহে উপসর্গ দেখা গেলেও ১৫ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
গত ৭ মে প্রথম একজন ইউরোপীয় নাগরিকের দেহে মাঙ্কিপক্স শনাক্ত হয়। নাইজেরিয়া থেকে ওই ব্যক্তি ইংল্যান্ডে ফিরে এসেছিলেন। এরপর থেকে আফ্রিকার বাইরে ১০০ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড একাডেমিক।
উৎস ও রূপ বদল ঘটেছে কিনা বোঝার চেষ্টা করছে বিজ্ঞানীরা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, চলমান প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত মাঙ্কিপক্স শনাক্তের ঘটনাগুলো কিছুটা অস্বাভাবিক। যেসব দেশে ভাইরাস নিয়মিত ছড়িয়ে পড়ে না, সেসব দেশে বর্তমানে এই ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে। বর্তমানে শনাক্ত হওয়া এই ভাইরাসের উত্স এবং এর রূপ বদল ঘটেছে কিনা তা বোঝার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।
মাঙ্কিপক্সে এখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্য, স্পেন এবং পর্তুগালেই বেশিরভাগ রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তবে কানাডা, অস্ট্রেলিয়াতেও সংক্রমণ ঘটেছে এবং বোস্টনেও মাঙ্কিপক্সে একজনের সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে।মাঙ্কিপক্স রোগের জন্য এখনও সুনির্দিষ্ট কোনো টিকা বা ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। তবে ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, স্মলপক্স বা গুটিবসন্তে জন্য ব্যবহৃত টিকা মাঙ্কিপক্স প্রতিরোধে ৮৫ শতাংশ কার্যকর।
আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো এক জরুরি অবস্থা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মাংকিপক্সের প্রাদুর্ভাবকে বিশ্বের জনস্বাস্থ্যের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো এক জরুরি অবস্থা বলে ঘোষণা করেছে।
বিশ্বব্যাপী এই রোগের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার মধ্যেই সংস্থাটি এই সতর্কতা ঘোষণা করলো। কোনো ধরনের রোগের বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এটিই সর্বোচ্চ সতর্কতা।
এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার মহাসচিব টেড্রস আধানম গেব্রাইয়েসুস বলেন, ৭৫টির বেশি দেশে এবং এলাকায় এ পর্যন্ত ১৬,০০০ সংক্রমণ ধরা পড়েছে।এ পর্যন্ত ৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে ড. টেড্রস বলেছেন, মাংকিপক্স ভাইরাসটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এবং একারণে তিনি এটিকে আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
তিনি বলেন, এই ঘোষণার ফলে এখন ভাইরাসটি প্রতিরোধে টিকা তৈরির কাজ দ্রুত হবে বলে তারা মনে করছেন। এবং একই সাথে এর ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে নানা ধরনের পদক্ষেপও নেওয়া হবে বলে তিনি আশা করছেন।
আগাম সতর্কবার্তা দিল বিএসএমএমইউ উপাচার্য
দেশে এই রোগ যেন না ছড়াতে পারে এ জন্য আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ।
এক সংবাদ সম্মেলনে বিএসএমএমইউ উপাচার্য বলেন, সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ এবং বিদেশ থেকে আসা লোকজনের পরীক্ষা করানো দরকার। কাউকে সন্দেহভাজন মনে হলে আইসোলেট করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন আক্রান্ত বা সন্দেহজনক প্রাণীর সংস্পর্শে না যাওয়া, প্রাণীর কামড়, আঁচড়, লালা বা প্রস্রাব থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকা। আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে সব ক্ষত শুকানো পর্যন্ত আইসোলেশন বা কোয়ারেন্টিনে রাখা। এ ছাড়া উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের টিকা দেওয়ার বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি।
সংক্রমণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। আবার শ্বাস-প্রশ্বাসের ফোঁটা বা ড্রপলেট দ্বারা কিংবা স্বল্প দূরত্বে দীর্ঘক্ষণ সান্নিধ্যে থাকার সময় সংক্রমিত হতে পারে। মাংকি পক্সে আক্রান্ত অন্য ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ শারীরিক যোগাযোগের মাধ্যমেও কেউ আক্রান্ত হতে পারে; একাধিক সঙ্গীর সঙ্গে মেলামেশাকে প্রধান ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা হয়।
১৯৫৮ সালে ল্যাবরেটরিতে প্রথম বানরের দেহে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়। ১৯৭০ সালে এই ভাইরাসকে মাঙ্কি পক্স নামকরণ করা হয়।








