চামড়ার নিচে নরম, গোলাকার ও নড়াচড়া করা পিণ্ড অনেকের শরীরেই দেখা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এগুলোকে লাইপোমা বলা হয়। সাধারণত ক্ষতিকর না হলেও কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত বড় হওয়া বা শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
চামড়ার নিচে ছোট ছোট পিণ্ড বা দলা নিয়ে অনেকের মধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হয়। বিশেষ করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে একাধিক পিণ্ড দেখা দিলে এগুলো টিউমার বা ক্যান্সারের লক্ষণ কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করেন অনেকে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, চামড়ার নিচে তৈরি হওয়া নরম, গোলাকার ও সাধারণত ব্যথাহীন পিণ্ডকে লাইপোমা বলা হয়। আঙুল দিয়ে চাপ দিলে এগুলো সাধারণত সহজেই নড়াচড়া করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইপোমা মূলত চর্বি কোষ দিয়ে তৈরি এক ধরনের বিনাইন বা নির্দোষ টিউমার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয় এবং কোনো চিকিৎসারও প্রয়োজন হয় না।
লাইপোমা কেন হয়?
লাইপোমা তৈরির নির্দিষ্ট কারণ সব ক্ষেত্রে জানা যায় না। তবে জেনেটিক বা বংশগত কারণ এর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। পরিবারের কারও লাইপোমা থাকলে অন্য সদস্যদের মধ্যে এটি হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
শরীরের কোনো অংশে সরাসরি আঘাত লাগার পরও সেখানে লাইপোমা তৈরি হতে পারে। আঘাতের কারণে চর্বি কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং পরবর্তী প্রদাহের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
সাধারণত ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের মধ্যে লাইপোমা বেশি দেখা যায়। তবে শিশু ও কিশোরদেরও এটি হতে পারে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত ওজন, মদ্যপান, লিভারের কিছু রোগ এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে লাইপোমার সম্পর্ক থাকতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

কীভাবে লাইপোমা চেনা যায়?
লাইপোমা মূলত পরিপক্ব চর্বি কোষের সমষ্টি, যা সাধারণত একটি পাতলা তন্তুময় আবরণে ঘেরা থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি চামড়ার ঠিক নিচে তৈরি হয়। তবে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ বা মাংসপেশির গভীরেও লাইপোমা দেখা দিতে পারে।
এর আকার খুব ছোট থেকে কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণত ঘাড়, কাঁধ, পিঠ, বাহু, পেট ও উরুতে লাইপোমা বেশি দেখা যায়।
পিণ্ডটিতে আঙুল দিয়ে চাপ দিলে সেটি চামড়ার নিচে পিছলে বা নড়ে যেতে পারে। বেশিরভাগ লাইপোমা এক থেকে দুই ইঞ্চি ব্যাসের হলেও কিছু ক্ষেত্রে এটি ছয় ইঞ্চি বা তারও বেশি বড় হতে পারে। বড় আকারের লাইপোমাকে ‘জায়ান্ট লাইপোমা’ বলা হয়।
প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে লাইপোমায় ব্যথা থাকে না। তবে কোনো নার্ভ বা স্নায়ুর ওপর চাপ পড়লে কিংবা পিণ্ডটির ভেতরে রক্তনালীর পরিমাণ বেশি থাকলে ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
লাইপোমা কি ক্যান্সারে পরিণত হয়?
লাইপোমা নিয়ে মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো এটি থেকে ক্যান্সার হতে পারে কি না। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ লাইপোমা ক্যান্সারে রূপ নেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল।
তবে লাইপোমার মতো দেখতে ‘লিপোসারকোমা’ নামে এক ধরনের ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যান্সারযুক্ত টিউমার রয়েছে। ফলে শরীরে নতুন কোনো পিণ্ড দেখা দিলে সেটিকে নিজে থেকে লাইপোমা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বিশেষ করে কোনো পিণ্ড খুব দ্রুত বড় হতে থাকলে, অস্বাভাবিকভাবে শক্ত হয়ে গেলে কিংবা চামড়ার নিচে সহজে নড়াচড়া না করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ব্যথা বা অস্বস্তি তৈরি হলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শারীরিক পরীক্ষা করেই চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে লাইপোমা শনাক্ত করতে পারেন। প্রয়োজন হলে বায়োপসি বা অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে পিণ্ডটি লাইপোমা নাকি অন্য কোনো ধরনের টিউমার, তা নিশ্চিত করা হয়।
কখন অপারেশন প্রয়োজন?
শরীরে একাধিক লাইপোমা থাকা অস্বাভাবিক নয়। কোনো কোনো ব্যক্তির শরীরে শত শত লাইপোমাও থাকতে পারে। তবে এগুলো সাধারণত কোনো উপসর্গ তৈরি না করলে চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।
পিণ্ডটি দ্রুত বড় হতে থাকলে, ব্যথা বা অস্বস্তি তৈরি করলে, শরীরের স্বাভাবিক নড়াচড়ায় বাধা দিলে কিংবা দৃশ্যমান হওয়ার কারণে সৌন্দর্যগত সমস্যা তৈরি করলে এটি অপসারণের কথা বিবেচনা করা হয়।
এ ছাড়া বসা বা শোয়ার সময় শরীরের কোনো অংশে চাপ পড়ে এমন জায়গায় লাইপোমা হলে সেটিও অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে।
লাইপোমা অপসারণের সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো সার্জিক্যাল এক্সিশন। ছোট একটি কাটা বা ছিদ্রের মাধ্যমে পিণ্ডটি বের করে দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে লিপোসাকশন বা স্টেরয়েড ইনজেকশনের মাধ্যমে এর আকার কমানোর চেষ্টা করা হতে পারে।
বিকল্প চিকিৎসা কতটা কার্যকর?
লাইপোমা অপসারণের ক্ষেত্রে সার্জারিকেই সবচেয়ে প্রচলিত ও কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বিকল্প চিকিৎসা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের দাবি থাকলেও এগুলোর কার্যকারিতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
বিশেষ করে বড় আকারের লাইপোমা পুরোপুরি অপসারণের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
লাইপোমা প্রতিরোধ করা যায় কি?
লাইপোমা সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করার নির্দিষ্ট কোনো উপায় নেই। তবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সামগ্রিকভাবে শরীরের জন্য উপকারী।
বিশেষজ্ঞরা অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, মদ্যপান থেকে বিরত থাকা এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের পরামর্শ দেন।
তবে শরীরে নতুন কোনো পিণ্ড দেখা দিলে শুধু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন বা ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পিণ্ডটি দ্রুত বড় হলে, শক্ত হয়ে গেলে, নড়াচড়া না করলে বা ব্যথা শুরু হলে দ্রুত পরীক্ষা করানো উচিত।









