এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
ফ্রান্স আর স্পেনের সেমিফাইনালে দুটি সংখ্যা মাথায় রাখতে হবে। প্রথমটি ২১, লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড। ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে সেখান থেকে এক ধাপ পেছনে, ২০ গোল নিয়ে। দ্বিতীয়টি ১৪৬, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর আন্তর্জাতিক গোলের রেকর্ড, সেটি আপাতত অক্ষত। তবে এমবাপ্পের বয়স মাত্র ২৭, আর গোল ৬৪।
তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলছেন এই ফরাসি অধিনায়ক। ২০১৮ সালে ১৯ বছর বয়সে শিরোপা জিতেছিলেন। ২০২২ সালে গোল্ডেন বুট আর ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও শিরোপা হাতছাড়া হয়েছিল। এবার টানা তৃতীয়বারের মতো সেমিফাইনালে ফ্রান্স।
মেসি আর রোনালদোর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার যেখানে প্রায় শেষ, এমবাপ্পের সামনে পড়ে আছে আরও অন্তত দুটি বিশ্বকাপ আর অনেক আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
পরিসংখ্যানে এমবাপ্পে
মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল জেতার পর হিসাবটা এখন এমন।
জাতীয় দলের হয়ে ম্যাচ: ১০৪ জাতীয় দলের হয়ে গোল: ৬৪, ফ্রান্সের ইতিহাসে সর্বোচ্চ, অলিভিয়ে জিরুর ৫৭ ছাড়িয়ে অ্যাসিস্ট: ৩৭, ফ্রান্সের হয়ে গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে ১০০ ছোঁয়া একমাত্র খেলোয়াড় তিনিই বিশ্বকাপ গোল: ২০, সর্বকালের তালিকায় দুইয়ে, শীর্ষে মেসি ২১ গোল নিয়ে এবারের বিশ্বকাপে গোল: ৮, মেসির সমান, তবে অ্যাসিস্টে এগিয়ে থাকায় (৩-১) গোল্ডেন বুট রেসে সামনে বিশ্বকাপ নকআউটে গোল: ১২, সর্বকালের রেকর্ড।
২২ জুন ইরাকের বিপক্ষে খেলেছেন জাতীয় দলের হয়ে ১০০তম ম্যাচ, সেদিন দুই গোলও করেছিলেন। ফ্রান্সের ইতিহাসে মাত্র দশজন খেলোয়াড় এই মাইলফলক ছুঁয়েছেন। এমবাপ্পে তখন বলেছিলেন, দেশের হয়ে খেলার চেয়ে বড় কিছু নেই, আর বিশ্বকাপের মঞ্চে একশ ম্যাচ ছোঁয়াটা তাঁর কাছে বিশেষ কিছু।
মেসির রেকর্ড এক গোল দূরে
মেসির ২১ গোল করতে লেগেছে ছয়টি বিশ্বকাপ, এমবাপ্পের ২০ গোল এসেছে মাত্র তিনটিতে। স্পেনের বিপক্ষে সেমিফাইনালে বা সম্ভাব্য ফাইনালে একটি গোল করলেই তিনি একা দাঁড়াবেন সর্বকালের সেরা গোলদাতার আসনে। এবার না হলেও তাড়া নেই, ২০৩০ বিশ্বকাপে তাঁর বয়স হবে মাত্র ৩১।
নকআউটে এখনই সবার ওপরে
গ্রুপ পর্বে চার গোলের পর সুইডেনের বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২-এ জোড়া গোল করে এমবাপ্পে নকআউট পর্বের সর্বকালের সেরা গোলদাতা হয়ে যান, ব্রাজিলের লিওনিদাস আর রোনালদোর আট গোলের রেকর্ড ছাড়িয়ে। এরপর প্যারাগুয়ে ও মরক্কোর বিপক্ষে আরও দুই গোল, মোট ১২।
তুলনার জন্য, মেসি ছয় বিশ্বকাপ মিলিয়ে নকআউটে করেছেন পাঁচ গোল, আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো তাঁর ছয় নকআউট ম্যাচে গোল পেয়েছেন মাত্র একটি, এবারই ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে।
রোনালদোর রেকর্ডটাও কি অসম্ভব
আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের মালিক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, ১৪৬। স্পেনের কাছে হেরে পর্তুগাল এবার শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিয়েছে, আর রোনালদো নিজেই জানিয়েছেন এটাই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। অর্থাৎ সংখ্যাটা আর খুব একটা বাড়বে না।
এমবাপ্পের এখন ৬৪ গোল, বয়স ২৭। পার্থক্য ৮২ গোলের, শুনতে বিশাল। কিন্তু হিসাবটা এমন, রোনালদো ৬৪ গোলে পৌঁছেছিলেন ২৯ বছর বয়সের দিকে। এমবাপ্পে সেখানে পৌঁছেছেন দুই বছর আগে। বছরে আট-দশটি গোল ধরে এগোলে ত্রিশের ঘরের শেষ দিকে গিয়ে তিনি একশ ছাড়িয়ে যাবেন। এরপরের পথটা নির্ভর করবে ফিটনেস আর ফ্রান্সের হয়ে কত দিন খেলেন, তার ওপর। অসম্ভব নয়, তবে সহজও নয়।
রোনালদোর পোস্টারে ঢাকা ঘরের দেয়াল
মজার ব্যাপার, এমবাপ্পের ছোটবেলার নায়ক ছিলেন এই রোনালদোই। বন্ডির বাড়িতে তাঁর শোবার ঘরের দেয়াল ভরা ছিল রোনালদোর পোস্টারে, ১৪ বছর বয়সের সেই ছবিটা এখন ফুটবলপ্রেমীদের কাছে পরিচিত। দশ বছর বয়সে বাবা-মা তাঁকে টিকিট এনে দিয়েছিলেন মার্শেইয়ে রিয়াল মাদ্রিদের চ্যাম্পিয়নস লিগ ম্যাচ দেখার। ওয়ার্ম-আপের একটা মুহূর্তও যাতে মিস না হয়, সেজন্য দুই ঘণ্টা আগে গিয়ে মাঠে বসে ছিলেন তিনি। সেদিন রোনালদো দুই গোল করেছিলেন।
২০১৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে এমবাপ্পে রোনালদোকে বলেছিলেন ফুটবলের ইতিহাসের ‘সেরা অ্যাথলেট’। ২০২৪ সালে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর রোনালদো নিজেই তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। এমবাপ্পের ভাষায়, রোনালদো এখন তাঁর বন্ধু।
পরিবার আর ব্যক্তিগত জীবন
এমবাপ্পের বেড়ে ওঠা প্যারিসের বন্ডি শহরতলিতে, অভিবাসী পরিবারে। বাবা উইলফ্রিড এমবাপ্পে ক্যামেরুনীয় বংশোদ্ভূত, সাবেক ফুটবল কোচ, ছেলের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের সব সিদ্ধান্ত তিনিই সামলেছেন। মা ফায়জা লামারি আলজেরীয় বংশোদ্ভূত, সাবেক হ্যান্ডবল খেলোয়াড়, এখন ছেলের এজেন্ট। পিএসজি ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে যাওয়ার আলোচনায় তিনিই ছিলেন সামনে।

ছোট ভাই ইথান এমবাপ্পের বয়স ১৯, তিনি মিডফিল্ডার। কিলিয়ানের মতোই বন্ডি থেকে শুরু, এরপর পিএসজি। ২০২৪ সালে কিলিয়ান যে গ্রীষ্মে পিএসজি ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে গেলেন, ইথানও সেই একই গ্রীষ্মে ক্লাব ছেড়ে যোগ দেন লিলে। এখন লিগ ওয়ানে খেলছেন সেখানেই।

দত্তক ভাই জিরেস কেম্বো একোকোর বয়স ৩৮, ২০১৯ সালে খেলা ছেড়েছেন, এখন ফুটবল এজেন্ট। জন্ম কিনশাসায়, ছয় বছর বয়সে ফ্রান্সে আসার পর তাঁকে দত্তক নেয় এমবাপ্পে পরিবার। ফ্রান্সের রেন, আমিরাতের আল আইন ও আল নাসর, তুরস্কের বুরসাস্পোরে খেলেছেন তিনি। তাঁর বাবা কেম্বো উবা কেম্বো ১৯৭৪ বিশ্বকাপে জায়ারের হয়ে খেলেছিলেন। অর্থাৎ এই পরিবারের সঙ্গে বিশ্বকাপের সম্পর্ক কিলিয়ানের জন্মেরও অনেক আগের।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বরাবরই আড়ালে থাকতে পছন্দ করেন। বিয়ে করেননি, সন্তানও নেই। বিভিন্ন সময় মডেল ও অভিনেত্রীদের সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জন উঠলেও তিনি কখনো কিছু নিশ্চিত করেননি।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী চলতি বছরের মার্চ থেকে তিনি সম্পর্কে আছেন স্প্যানিশ অভিনেত্রী ও মডেল এস্তার এক্সপোসিতোর সঙ্গে। এছাড়া আগে প্লেবয় ম্যাগাজিনের সেন্টারফোল্ড ইনেস রাউ, বেলজিয়ান মডেল রোজ বার্ট্রাম, ২০১৭ সালের ‘মিস ফ্রান্স’ অ্যালিসিয়া আয়লিস, ফরাসি অভিনেত্রী এমা স্মেট এবং মোনাকোর রাজকুমারী স্টেফানির মেয়ে ক্যামিল গটলিবের সাথেও তাঁর নাম জড়িয়ে গুঞ্জন উঠেছিল।
খেলার বাইরে তিনি ফরাসি, ইংরেজি আর স্প্যানিশ, এই তিন ভাষায় সাবলীল। ২০২১ সালে ছোটদের জন্য একটি বই লিখেছেন, নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও আছে।
স্পেনের সামনে বড় পরীক্ষা
মঙ্গলবার আরলিংটনে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ স্পেন, যারা বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছে। দুই দলই এখনো অপরাজিত। ২০২৪ ইউরোর সেমিফাইনালে স্পেন ফ্রান্সকে হারিয়েছিল, ফলে এমবাপ্পে বনাম লামিন ইয়ামাল লড়াইটা আলাদা আগ্রহ তৈরি করেছে। জিতলে ফ্রান্স উঠবে টানা তৃতীয় ফাইনালে। ফাইনাল ১৯ জুলাই, নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে।
১০৪টি ম্যাচ, ৬৪টি গোল, ২০টি বিশ্বকাপ গোল, নকআউটে সর্বকালের সেরা। আর এটা মাত্র তাঁর তৃতীয় বিশ্বকাপ। মঙ্গলবার রাতে একটা গোল করলেই মেসিকে ছাড়িয়ে যাবেন। এরপর কোথায় গিয়ে থামবেন, সেটা এখন আর কেউ বলতে পারছে না।









