বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে সাবেক প্রভাবশালী আমলা ও বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা (ক্যাবিনেট মন্ত্রীর পদমর্যাদায়) মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দীর্ঘ প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি গবেষণা, নীতি প্রণয়ন ও রাষ্ট্র সংস্কার কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
মেধাবী ছাত্র থেকে প্রশাসনে
মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ১৯৫০ সালে তৎকালীন নোয়াখালী জেলার বর্তমান লক্ষ্মীপুরের রামগতি থানাধীন শান্তির হাটের চরকাদিরা মোক্তারবাড়ীতে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মরহুম সুজাউদ্দিন আহমেদ ছিলেন লক্ষ্মীপুর সামাদ একাডেমির শিক্ষক। পরবর্তী সময়ে পরিবার লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার শমসেরবাদ গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
ছাত্রজীবনেই মেধার স্বাক্ষর রাখেন ইসমাইল জবিউল্লাহ। ১৯৬৫ সালে লক্ষ্মীপুর সামাদ একাডেমি থেকে এসএসসি পরীক্ষায় কুমিল্লা বোর্ডের মেধা তালিকায় ১২তম এবং ১৯৬৭ সালে লক্ষ্মীপুর কলেজ থেকে এইচএসসিতে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭০ সালে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (অনার্স) এবং ১৯৭৩ সালে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জাপানের এডিবি ইনস্টিটিউট থেকেও উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি।
ছাত্রজীবন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হলের প্রথম ব্যাচের আবাসিক ছাত্র হিসেবে ১৯৬৭ সালে হল ছাত্র সংসদের প্রতিনিধি নির্বাচিত হন ইসমাইল জবিউল্লাহ। বিতর্ক, পত্রিকা প্রকাশনা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও ছাত্রজীবন থেকেই সক্রিয় ছিলেন তিনি।
স্বাধীনতার পর লক্ষ্মীপুরে ‘কাকলি’ ও ‘ত্রিধারা’ নামে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলেন। অধ্যাপক ননী গোপাল ঘোষের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ত্রিধারা শিক্ষা নিকেতন’, যা লক্ষ্মীপুরের অন্যতম প্রাথমিক পর্যায়ের ভিন্নধর্মী কিন্ডারগার্টেন হিসেবে পরিচিতি পায়।
নাটক, আবৃত্তি, স্মরণিকা প্রকাশ, একুশে ফেব্রুয়ারি, বাংলা নববর্ষ এবং রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তী পালনের মতো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর ভূমিকা ছিল।
শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু
১৯৭৩ সালে চৌমুহনী কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন ইসমাইল জবিউল্লাহ। একই সময়ে চন্দ্রগঞ্জ কফিলউদ্দিন কলেজে খণ্ডকালীন অধ্যাপনা এবং পরে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত নোয়াখালী সরকারি কলেজে ইংরেজি প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রথম নিয়মিত সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৭৭ সালে সহকারী কমিশনার ও ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে চট্টগ্রামে প্রশাসনিক কর্মজীবনে যোগ দেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ম্যাজিস্ট্রেট ও সামরিক আইন আদালতের বিচারকের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
ইউএনও থেকে সচিব
১৯৮৬ সালে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ২০০২ সালে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ইসমাইল জবিউল্লাহ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব, নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তাপুষ্ট ‘প্রমোট’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নারী শিক্ষার উন্নয়নেও কাজ করেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ২০০৮ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন।
কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভিজ্ঞতা
ইসমাইল জবিউল্লাহ ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ব্রুনাই ও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে শ্রম কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দায়িত্বকালে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের সুযোগ সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব এশিয়ান পলিটিক্যাল পার্টিজের (আইক্যাপ) স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করছেন।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) সদস্য, ওয়ার্ল্ড মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির গভর্নর এবং জেদ্দায় ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিকল্প গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব ছিল তাঁর।
জাতিসংঘ, ওআইসি, কমনওয়েলথ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এ সময় ৩৫টিরও বেশি দেশ সফর করেছেন তিনি।
ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব
সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পরও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন ইসমাইল জবিউল্লাহ। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (আইডিকল) এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি লিমিটেডের (আইআইএফসি) চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক, আইসিডিডিআর,বির বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য এবং আগারগাঁওয়ের আইডিবি ভবনের মোতাওয়াল্লী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও তেজগাঁও উইমেনস কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করছেন। তিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি বিভাগ অ্যালামনাই সোসাইটির সভাপতি।
বিএনপির নীতি প্রণয়ন ও রাষ্ট্র সংস্কারে ভূমিকা
সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর ইসমাইল জবিউল্লাহ বিএনপির নীতি প্রণয়ন ও গবেষণামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন। ২০১৬ সাল থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি-২০২৬-এর প্রধান সমন্বয়ক এবং পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য। একই সঙ্গে বিএনপির গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট রিসার্চ সেন্টারের (বিএনআরসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও গবেষণা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাবেক আমলাদের সংগঠন পলিসি ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসার্চ সোসাইটির (পিএমআরএস) চেয়ারম্যানও তিনি।
বিএনপির ভিশন-২০৩০, তারেক রহমান ঘোষিত ২৭ দফা, রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
জুলাই সনদ প্রণয়নসহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কারবিষয়ক ঐকমত্য কমিশনেও বিএনপির অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন তিনি। প্রশাসনিক ও নির্বাচন কমিশন সংস্কারসংক্রান্ত দলীয় কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা
বর্তমানে ইসমাইল জবিউল্লাহ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর পদমর্যাদা ক্যাবিনেট মন্ত্রীর সমতুল্য।
রাজনৈতিক জীবনে তাঁর বিরুদ্ধে এক-এগারোর সময় রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে আরও কয়েকটি মামলা দায়েরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে হাইকোর্টের মাধ্যমে একটি মামলা থেকে তিনি অব্যাহতি পান।
লক্ষ্মীপুরের উন্নয়ন ও সমাজসেবায় ভূমিকা
শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির পাশাপাশি নিজ এলাকা লক্ষ্মীপুরের শিক্ষা, যোগাযোগ ও সামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রেখেছেন ইসমাইল জবিউল্লাহ। সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় আইন ও বিধির মধ্যে থেকে এলাকার উন্নয়নে কাজ করেছেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের দাবি।
যোগাযোগ ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে বৃহত্তর নোয়াখালী, বিশেষ করে লক্ষ্মীপুরের সড়ক ও সেতু উন্নয়নেও ভূমিকা রাখেন তিনি। বিভিন্ন শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, এতিমখানা, মসজিদ ও মাদ্রাসায় সহযোগিতার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, অর্থনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা, গবেষণা এবং রাজনৈতিক নীতি প্রণয়নের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন। বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে তাঁর অন্তর্ভুক্তি দলটির নীতি প্রণয়ন ও প্রশাসনিক বিষয়ক কর্মকাণ্ডে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে দলটির নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা।









