প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি সমঝোতার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যম বিবিসি এই তথ্য নিশ্চিত করে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় আরাঘচি বলেন, জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয় শর্তগুলো উল্লেখ রয়েছে।
তিনি বলেন, এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের। কাতারের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে ইরানের এই প্রস্তাব পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
ইরানের প্রস্তাবের বিষয়ে বিবিসিকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা চলছে। এসব আলোচনায় পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টিও রয়েছে।
এর আগে চলতি সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি দেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা শুরু করে। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল, উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্রদের ওপর হামলা চালায়। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় ইরান।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে ব্যাপক ওঠানামা শুরু হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সংঘাত শেষ করার জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপও বেড়েছে। বিশেষ করে নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেস নির্বাচন সামনে থাকায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরাঘচি বলেন, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়ে সাত দিনের মধ্যে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
তবে যুক্তরাষ্ট্রকে ঠিক কী পদক্ষেপ নিতে হবে, তা তিনি বিস্তারিত জানাননি। তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের করণীয় বিষয়গুলো নতুন নয়; জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকেই সেগুলো উল্লেখ করা হয়েছে।
আরাঘচি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই সমঝোতায় পৌঁছাতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে চায়, তাহলে প্রয়োজনীয় সবকিছু প্রস্তুত রয়েছে।

১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ১৪ দফা সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং হরমুজ প্রণালি অন্তত আংশিকভাবে আবার খুলে দেওয়া।
সমঝোতায় ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এমন প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্রদের সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ করার বিষয়ও ছিল।
এতে ইরানের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং মার্কিন নৌ অবরোধ বন্ধ করার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
চুক্তিতে ইরানকে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের জন্য যথাসাধ্য ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনার কথাও ছিল।
তবে চুক্তি স্বাক্ষরের অল্প সময় পরই উভয় পক্ষ আবার হামলা শুরু করলে সমঝোতাটি কার্যত ভেস্তে যায়।
ইরান এমন কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যেগুলো অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করেছে বলে তেহরানের দাবি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রণালিতে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। দেশটির উপকূলের কাছে ইরানের তেলবাহী জাহাজেও হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধও অব্যাহত রয়েছে। এতে ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ করতে সফল হয়েছে।
পণ্যবাজারবিষয়ক তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ১০ দিনের গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৮টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে। কোনো কোনো দিনে এই সংখ্যা নেমে ৯টিতে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুথিরা সম্প্রতি সৌদি আরব থেকে লোহিত সাগর হয়ে তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত করতে হামলা আরও বাড়িয়েছে।
চলতি মাসে হুথিরা দ্রুত অভিযান চালিয়ে লোহিত সাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু এলাকা দখল করেছে। এর মধ্যে মোখা বন্দরও রয়েছে। বন্দরটি বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে অবস্থিত। বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের জন্য এটিও গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ।
সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোতে হুথিদের হামলার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছেন।
চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে, তবে সেটি নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের পর হতে পারে।
তিনি বলেন, প্রশ্ন হলো—ইরানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি হবে কি না, যার মাধ্যমে দেশটি আবার উন্নতি করতে পারবে এবং আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারবে; নাকি যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ধ্বংস করে দেবে।
ট্রাম্প আরও বলেন, ইরান যাতে আবার মানুষ ও বিভিন্ন দেশের ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি বলেন, ইরান কোনো ধরনের চাপ, হুমকি বা ভয় দেখানো মেনে নেবে না।
তিনি বলেন, ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এখন হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার ফল কী হয়, সেটিই দেখার বিষয়।









