চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় গড়ানো টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি বাংলাদেশ। গত ১০ ফেব্রুয়ারি সেই সিদ্ধান্তের দায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও ক্রিকেটারদের দিয়েছিলেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী আমিনুল হক বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত কোনো সম্মিলিত আলোচনা বা পরামর্শের ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি। বরং তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এককভাবে সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেন। এবার সেই দায় স্বীকার করেছেন আসিফ নজরুলও।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. এ. কে. এম. ওয়ালি উল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফয়সাল দস্তগীর। মঙ্গলবার তিন সদস্যের কমিটি তিন মাস ধরে চলা তাদের তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে ওঠে আসে আসিফ নজরুলের একক সিদ্ধান্তের কথা। এরপর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে দায় স্বীকার করেন তিনি।
দীর্ঘ স্ট্যাটাসের শুরুতে তিনি লিখেন, ‘ভারতে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি তখনকার ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে মূলত আমারই ছিল। আমি নিজেই এ কথা একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছি। তাই এতদিন পর ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিষয়টি তদন্ত করে তা প্রকাশের কি এমন কারণ ঘটলো বুঝলাম না।’
‘ঘটনার সূত্রপাত উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের চাপের মুখে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে অপমানজনকভাবে বাদ দেওয়া থেকে। এর পরপরই আমরা নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা এবং বাংলাদেশের প্রতি অবমাননার প্রতিবাদে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার বিষয়ে অনীহা জানাই।’
‘আমাদের আশঙ্কা যে অমূলক ছিল না, আইসিসির প্রথম রিপোর্টেই তার স্বীকৃতি ছিল। সেখানে ভারতে নিরাপত্তা-আশঙ্কার তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল-বিশ্বকাপের দলে মুস্তাফিজ থাকলে, বাংলাদেশের সমর্থকরা মুক্তভাবে ঘোরাফেরা করলে এবং বাংলাদেশে নির্বাচন এগিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে। বিবিসি বাংলা ওই রিপোর্টের হুবহু বাংলা অনুবাদও প্রকাশ করেছিল।’
‘এই পরিস্থিতিতে আমরা ভারতে খেলতে যাব কেন? আমরা শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো ভেন্যুতে বিশ্বকাপ খেলার জন্য বহু চেষ্টা করেছি। কোনো কোনো দেশ থেকে সমর্থনও পেয়েছিলাম। কিন্তু সম্ভবত আইসিসির নেতৃত্বে ভারতীয়দের আধিপত্যে থাকার কারণে শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদেরকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।’
‘আমাদের সিদ্ধান্তের পেছনে তিনটি বিষয় ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার, দেশের মর্যাদা, আমাদের ক্রিকেটার-সাংবাদিক-সমর্থকদের নিরাপত্তা এবং আগামী নির্বাচনের আগে দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা। সে সময় বলা হয়েছিল, বিশ্বকাপ না খেললে বিদেশি দলগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের খেলা বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের নানা উদ্যোগে সেই আশঙ্কাও শেষ পর্যন্ত দূর হয়েছিল।
আমি মনে করি, আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। একটি ছোট দেশ বলে কেউ আমাদের ইচ্ছেমতো অপমান করবে, আর আমরা সবসময় তা মুখ বুঝে মেনে নিবো এমন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। আমি সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সাথে বন্ধুত্বে বিশ্বাসী । মাথা নত করে সব মেনে নেয়াতে না।’
এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রীয় মাঠ উন্নয়নে বিসিবির দুই কোটি টাকা অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি জানান, বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রিকেটাররা নিয়েছেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘দেশের ক্রিকেট, ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের মর্যাদার প্রশ্নে খেলোয়াড় ও বোর্ড আত্মত্যাগ করেছে এবং এটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’









