ভারতের চার বড় বেসরকারি ব্যাংক আইসিআইসিআই, এইচডিএফসি, অ্যাক্সিস ও কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাংক ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (এফওয়াই২৬) সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৩ হাজার কর্মী কমিয়েছে। অথচ একই সময়ে ব্যাংকগুলো দেশজুড়ে নতুন শাখা চালু করেছে।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি কর্মী কমিয়েছে আইসিআইসিআই ব্যাংক। ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ ব্যাংকটির স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ১৭৭ জন। এক বছর পর তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ২৯ জনে। অর্থাৎ স্থায়ী কর্মী কমেছে ৫ হাজার ১৪৮ জন। স্থায়ী কর্মীর বাইরের কর্মীদের ধরলে ব্যাংকটির মোট জনবল কমেছে ৬ হাজার ৬৩৩ জন।
এফওয়াই২৬ শেষে এইচডিএফসি ব্যাংকের কর্মীসংখ্যা ৩ হাজার ৩৪৩ জন কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ১৭৮ জনে। অ্যাক্সিস ব্যাংকের কর্মীসংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ১০০ কমে হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৩০০ জন। অন্যদিকে কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাংকের কর্মী কমেছে ১ হাজার ২৬৯ জন, ফলে মোট কর্মীসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৫৪ জনে।
তবে ব্যাংকগুলোর কর্মীসংখ্যা কমাকে সরাসরি গণহারে ছাঁটাই হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। কারণ কর্মীসংখ্যা কমার পেছনে কর্মী চলে যাওয়া, নতুন নিয়োগ কমানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম বাড়ানোর মতো বিভিন্ন কারণ রয়েছে।
শাখা বাড়লেও কর্মী কমছে কেন?
বর্তমানে ব্যাংকের শাখাগুলো এক দশক আগের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করে না। মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ইউপিআই, এটিএম এবং স্বয়ংক্রিয় সেবার কারণে নিয়মিত অনেক লেনদেন এখন শাখায় না গিয়েই করা সম্ভব।
অ্যাকাউন্ট খোলা, নথি যাচাই, ঋণ প্রক্রিয়াকরণ, অর্থ পরিশোধ ও গ্রাহকসেবার বেশ কিছু কাজও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে করা হচ্ছে।
ফলে শাখাগুলো ধীরে ধীরে গ্রাহক সংগ্রহ এবং বিভিন্ন আর্থিক পণ্য বিক্রির কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। এসব কাজে আগের তুলনায় কম কর্মী প্রয়োজন হলেও গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপক, বিক্রয়কর্মী, সম্পদ ব্যবস্থাপনা পরামর্শক ও বিশেষায়িত কর্মীদের চাহিদা থাকছে।
টিমলিজ সার্ভিসেস-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এ বালাসুব্রামানিয়ানের মতে, বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখন কর্মীসংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে উৎপাদনশীলতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপন কমানো এবং কর্মীদের বিক্রয়, পরামর্শ ও গ্রাহকমুখী কাজে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
১৩ হাজার কর্মী কি চাকরি হারিয়েছেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বার্ষিক কর্মীসংখ্যা কমেছে মানেই ১৩ হাজার কর্মীকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, এমন নয়।
ব্যাংকিং খাতে কর্মী পরিবর্তনের হার তুলনামূলক বেশি। প্রতি বছর অনেক কর্মী স্বাভাবিকভাবেই চাকরি ছাড়েন। ব্যাংকগুলো যদি সেই শূন্য পদে আগের তুলনায় কম নিয়োগ দেয়, তাহলে কোনো বড় ধরনের ছাঁটাই ছাড়াই মোট কর্মীসংখ্যা কমে যেতে পারে।
ইকিউপ-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জয়ন্থ নীলকান্তার মতে, ধীরগতির অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো মূলত সতর্কতার সঙ্গে নিয়োগ করছে। প্রযুক্তি এসে ব্যাপকভাবে মানুষের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে, বিষয়টি এমন নয়।
কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাংকের পরিসংখ্যানেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ব্যাংকটি এফওয়াই২৬-এ ২৮ হাজার ৮৪৬ জনকে নিয়োগ দিয়েছে। এরপরও মোট কর্মীসংখ্যা ১ হাজার ২৬৯ জন কমেছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রক্রিয়া সহজীকরণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অভ্যন্তরীণভাবে কর্মী স্থানান্তরকে জনবল পুনর্বিন্যাসের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এআই কি ব্যাংকের চাকরি কমাচ্ছে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অটোমেশন ব্যাংকিং খাতের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। তবে এফওয়াই২৬-এ কর্মীসংখ্যা কমার পুরো দায় এআই-এর ওপর দেওয়া ঠিক হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জয়ন্থ নীলকান্তার মতে, ব্যাংকের কর্মীসংখ্যা কমার ক্ষেত্রে এআই-এর ভূমিকা নিয়ে অতিরঞ্জিত আলোচনা হচ্ছে। প্রযুক্তির কারণে পরিবর্তনটি ধীরে ধীরে ঘটছে এবং এর প্রভাব প্রথমে পড়ছে পুনরাবৃত্তিমূলক ব্যাক-অফিসের কাজগুলোতে।
বালাসুব্রামানিয়ানও মনে করেন, এআই ও অটোমেশন গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলো একমাত্র কারণ নয়। নিয়োগের গতি কমানো, স্বাভাবিকভাবে কর্মী কমে যাওয়া, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগও বড় ভূমিকা রাখছে।
ব্যাংকের ভেতরে বদলাচ্ছে কাজের ধরন
আগে ব্যাংকের বড় একটি কর্মীবাহিনী নথি যাচাই, তথ্য পরীক্ষা, লেনদেন প্রক্রিয়াকরণ, হিসাব মেলানো এবং নিয়মিত গ্রাহকসেবা দেওয়ার মতো কাজে যুক্ত থাকত। এসব কাজের বড় অংশ এখন ডিজিটাল করা সম্ভব হচ্ছে।
ম্যানপাওয়ারগ্রুপ-এর বিজনেস লিডার শৈলেশ খানার মতে, আধুনিক ব্যাংক শাখাগুলো ক্রমেই বিক্রয় ও গ্রাহক সম্পর্ককেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। সম্পদ ব্যবস্থাপনা, ঋণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক, ক্রস-সেলিং এবং নতুন গ্রাহক সংগ্রহে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই পরিবর্তন এইচডিএফসি ব্যাংকের কর্মীসংখ্যাতেও দেখা যাচ্ছে। ব্যাংকটির মোট কর্মী কমলেও কমার বড় অংশ ছিল নন-সুপারভাইজরি পর্যায়ে। বিপরীতে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মী বেড়েছে। অর্থাৎ সব স্তরে সমানভাবে কর্মী কমানো হয়নি।
ডিজিটাল ব্যাংকিং বাড়লেও শাখা খুলছে কেন?
ছোট শহর ও মফস্বল এলাকায় নতুন গ্রাহক সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যাংক শাখা এখনও গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ, আমানত, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার গ্রাহকদের সেবার ক্ষেত্রেও শাখার ভূমিকা রয়েছে।
আইসিআইসিআই ব্যাংকের শাখা ২০২৫ সালের মার্চে ৬ হাজার ৯৮৩টি থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের মার্চে হয়েছে ৭ হাজার ৫১১টি। একই সময়ে এইচডিএফসি ব্যাংক ২৩৪টি নতুন শাখা খুলে মোট শাখার সংখ্যা ৯ হাজার ৬৮৯টিতে উন্নীত করেছে।
তবে নতুন শাখা চালু করলেই সেখানে আগের মতো বড় অপারেশন টিম নিয়োগ করতে হচ্ছে না। প্রযুক্তি ও কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা অনেক কাজ পেছন থেকে পরিচালনা করছে।
অর্থাৎ একটি শাখা এখন বৃহত্তর ডিজিটাল ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার সামনের অংশ হিসেবে কাজ করছে। ফলে শাখা বাড়লেও কর্মীসংখ্যা একই হারে বাড়ছে না।
শৈলেশ খানার মতে, ব্যাংকের কর্মী কাঠামোর পরিবর্তনের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই কাঠামোগত পরিবর্তনের ফল। বাকি অংশ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। আগামী দিনে ব্যাংকগুলোর মোট কর্মীসংখ্যা স্থির থাকতে পারে বা সামান্য কমতে পারে। তবে নির্দিষ্ট দক্ষতার কর্মীদের নিয়োগ অব্যাহত থাকবে।
ব্যাংকগুলো ইতোমধ্যে ডিজিটাল অনবোর্ডিং, কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়াকরণ, ওয়ার্কফ্লো অটোমেশন ও স্বয়ংক্রিয় সেবায় বড় বিনিয়োগ করেছে। এসব বিনিয়োগ থেকে উৎপাদনশীলতা বাড়তে থাকায় আগের কর্মী কাঠামোয় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।
অ্যাক্সিস ব্যাংক জানিয়েছে, গত কয়েক বছরে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুফল হিসেবে উৎপাদনশীলতা বাড়তে শুরু করেছে। ব্যাংকটির পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৯ থেকে ১০ শতাংশ প্রযুক্তিতে ব্যয় হচ্ছে। একই সময়ে এফওয়াই২৬-এ তাদের কর্মীসংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ১০০ কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়লে গ্রাহকমুখী পদে নিয়োগ আবারও বাড়তে পারে। তবে নতুন শাখা খোলার সঙ্গে বিপুল সংখ্যক অপারেশনাল কর্মী নিয়োগের পুরোনো মডেলে ব্যাংকগুলো আর ফিরবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।









