আমাদের প্রিয় শিশুসাহিত্যিক লেখক আমীরুল ভাই মানে আমীরুল ইসলাম আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পরপারে।
তাঁর বিদায়ে অনেকের মতো আমারও হৃদয় বিদীর্ণ হয়েছে। সেই কবে থেকে তাঁর সাথে পরিচয়, ছিল হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। অবশ্য আমীরুল ভাই মানুষের সাথে সম্পর্কটা খুব ভালো বুঝতেন এবং উপলব্ধি করতেন। আর তাই যখনই দেখা হতো উচ্চকণ্ঠে বলতেন ‘কীরে কেমন আছস? বউ বাচ্চা ভালো আছে? চা-টা খাবি? আর্জেন্টিনার খবর কী? চেয়ার টাইনা ব।’
এইতো আমীরুল ভাই। ভারী কণ্ঠ আর হাসিময় এক মুখ। সামনে লোকজন থাকলে একগাল হাসি দিয়ে বলতেন, ‘ও কিন্তু আর্জেন্টিনার সাপোর্টার। আর্জেন্টিনার সব খবর ওর কাছে আছে।’ সারাজীবনই আমীরুল ভাই এভাবেই আমার সাথে কথা বলেছেন।
আশির দশকের শেষলগ্ন থেকে সেই সাপ্তাহিক মনোরমা পত্রিকা, দৈনিক বাংলা, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে এরপর চ্যানেল আই-এ তাঁর অফিস পর্যন্ত। আমার সাথে দেখা হলে ফুটবল নিয়ে দু-চার লাইন কথা না বললে তাঁর ভালো লাগতো না। নব্বই দশকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নিচতলাতে বসে বহুবার ফুটবল নিয়ে কথা চালাচালি হতো, ঝগড়া হতো। আমীরুল ভাই ছড়াকার, গল্পকার, অনুবাদক, দাবাড়ু, গীতিকার, ফুটবল অনুরাগী, ভ্রমণপ্রিয়, আবার খাদ্যরসিকও। সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখতেও ভালোবাসতেন। তবে শিশুদের জন্য তাঁর স্বপ্ন, চিন্তা-চেতনা ছিল অন্যরকম। শিশুদের স্বপ্নের জগৎকে রঙিণ করতে দুহাত খুলে লিখেছেন। তাঁর লেখা বই এর সংখ্যা অনেক। কাল রাতে দেখি আমার ড্রইং রুমের সেলফে আমীরুল ভাই-এর লেখা ‘মজার পড়া ১০০ ছড়া’ বইটি উঁকি দিচ্ছে। অবশ্য বছর দুয়েক আগে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন ‘রাজিনের উড়ন্ত সাইকেল’ বইটি।
আশির দশকের মধ্যভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর রাজধানীর যে দুজন ছড়াকারের সাথে প্রথম পরিচয় হয় তাঁর একজন লুৎফর রহমান রিটন অন্যজন আমীরুল ইসলাম। সে সময়ই এ দুজন ভীষণ পরিচিত ও জনপ্রিয়ও। পত্রপত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন সবখানেই দেখি তাঁদের মুখর পদচারণা। তবে আড্ডা এবং কথায় আমীরুল ভাই সবসময়ই অনেক এগিয়ে। কথা বলার ধরনটাই আলাদা। আবার পোশাকে আশাকেও একটু ব্যতিক্রম। খানিকটা পুরনো ঢাকার স্টাইলে কথার ঢং, শ্রুতিমধুরও বটে। আর বিচিত্র সব বিষয়ে অনর্গল কথা বলেন। ফুটবলের আলাপে সবার থেকে এগিয়ে। ডিয়েগো ম্যারাডোনার খেলার নানান বৈচিত্র্যময় ভঙ্গীর চমৎকার দৃশ্যায়ন তার মুখে। কলাম্বিয়ার স্ট্রাইকার কার্লোস ভালদারেমার ড্রিবলিং মুখস্ত। জার্মানির ক্লিন্সম্যানকে বিনয়ের সাথে স্মরণ করেন। আর আর্জেন্টিনার জর্জ ভালদোনা ফুটবলের দার্শনিক বলে অনেককে চিনিয়ে দেন। সে সময় দৈনিক খবর গ্রুপের সাপ্তাহিক মনোরমা নামের একটি পত্রিকাতে কাজ করার সুবাদে আমীরুল ভাই ও রিটন ভাই-এর সাথে বেশি হৃদ্যতা তৈরি হয়। সেই হৃদ্যতা কখনই নষ্ট হয়নি, বরং বেড়েছে।
তাঁরই অনুপ্রেরণায় সে সময় শিশুদের জন্য টুকটাক লেখালেখি শুরু করি। ছড়া, গল্পও লিখেছি। ৯৪ বা ৯৫ সালে আমীরুল ভাই শিশুদের জন্য আমার লেখা প্রথম গল্প ‘পিকলু মামার চিঠি’ ছেপে দেন দৈনিক বাংলার কিশোর পাতাতে।
আজীবন হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত এই মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ফেইলর রোগের সাথে লড়াই করছিলেন। শেষমেশ ডায়লিসিস বেছে নিতে হয়েছিল। সপ্তাহের সুনির্দিষ্ট দিন ধরে যেতে হতো রাজধানীর শ্যামলীস্থ স্পেশালাইজড হাসপাতালে। চার থেকে পাঁচ ঘন্টা সময় ধরে ডায়ালিসিস নিতে হতো। ডায়ালিসিস নেওয়া খুবই কষ্টের এক জীবন। তবুও বেঁচে থাকার জন্য একজন কিডনি রুগীকে এমন চিকিৎসার সাথে আপোষ করতে হয় মৃত্যু অব্দি। আমীরুল ভাইও জানতেন ডায়ালিসিস কী, আর কতদিন এই চিকিৎসায় জীবন সচল থাকে। আর তাই ধীরে ধীরে জীবনের শেষ প্রান্তে চলে আসেন। কিছু দিন ধরে আমীরুল ভাই চোখে দেখতেন না। হুইল চেয়ারে করে ছুটে আসতেন চ্যানেল আই-এর কর্মস্থলে।
একদিন গায়ে হাতে রেখে কথা বলতেই আমীরুল ভাই বলে উঠলেন, ‘কীরে বিশ্বকাপ ফুটবল কেমন দেখলি। আমিতো দেখতে পারলাম না। দেখছস মেসি কেমন খেলে।’ আসলে আমীরুল ভাই-এর এমন অসুস্থতা দেখে মন কথা বলতে চাইতো না। এত প্রাণবন্ত একটা মানুষ। অথচ অসুস্থতার কারণে ধীরে ধীরে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিলেন। আমার আপন বড় ভাই প্রফেসর মো. আলমগীর রহমানও দীর্ঘদিন ডায়ালিসিস করার পর ২০২২ সালের ২৯ জুন মারা যান। উনিও রাজধানীর স্পেশালাইজড হাসপাতালে ডায়ালিসিস করাতেন। এমন অনেকদিন গেছে আমার বড় ভাই এবং আমীরুল ভাই পাশাপাশি রুমে ডায়ালিসিস করতেন। আমার বড় ভাই-এর সাথে প্রায়ই দীর্ঘক্ষণ আলাপ করতেন। অনেক বিষয়ে কথা বলতেন।
বড় ভাই-এর মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর আমীরুল ভাই থমকে গিয়েছিলেন। সেদিন বলেছিলেন,‘ একদিন আমাকেও চলে যেতে হবে।’

নব্বই দশক জুড়ে আমীরুল ভাই-এর সাথে আমার অনেক অনেক স্মৃতি। একবার রিটন ভাই-এর বাসার আমাদের দুপুরের খাবারের আয়োজন করা হয়। আমীরুল ভাই, ছড়াকার আসলাম সানী, ওয়েস্টার্ণ লেখক বন্ধু দেলোয়ার হোসেন, গল্পকার মাহবুব রেজাসহ আমরা সবাই দুপুরে খাওয়া দাওয়া করি। রিটন ভাই-এর মেয়ে নদী তখন একেবারেই ছোট। আমীরুল ভাই বলেন, সন্ধ্যায় সবাই মিলে মধুমিতা হলে গিয়ে সিনেমা দেখব। যে কথা সেই কাজ। টিকাটুলিতে গিয়ে আমরা সিনেমা দেখতে ঢুকি। জাতীয় সঙ্গীতের সময় যখন পর্দায় পতাকা উড়ছে তখন আমীরুল ভাই দেখেন সামনে দুজন সিটে বসে আছেন। সঙ্গে সঙ্গে আামীরুল ভাই বলা শুরু করলেন, ‘ঐ মিয়া উইঠ্যা দাঁড়ান। জাতীয় পতাকাকে সম্মান দেখান।’ আমীরুল ভাই-এর ভারী কণ্ঠস্বর শুনে দুই দর্শক থতমত খেয়ে গেলেন। আামীরুল ভাই হুটহাট এভাবে আচমকা কথা বলতে খুব ভালোবাসতেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন মাষ্টার্সে পড়ি তখন মুহসীন হলে আমি ৬০৭ নাম্বার রুমে থাকি। এই রুমে তখন জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের অবাধ যাতায়াত। মাগুরার ছোট ভাই, বড় ভাই সবার প্রিয় এ রুম। কোথাও থাকার জায়গা না থাকলে এ রুমে সবার আশ্রয় মেলে। মাঝে মাঝে আমি নিজেই রুমে শোবার জায়গা পাইনা। এই রুমে মাঝে মাঝে আসতেন আমীরুল ভাই। ‘হ মিয়া থাকতে আইলাম। একটা লুঙি দাও।’-আমীরুল ভাই সুন্দর করে বলতেন।
এর আগে ৯০ সালে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে আমীরুল ভাই বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (হা-অ) প্যানেল থেকে সাহিত্য সম্পাদক পদে প্রার্থী হন। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্যানেল থেকে এই পদে প্রার্থী হন নিয়ামত ইলাহী। ডাকসুতে ছাত্রদল ফুল প্যানেলে জয়ী হয়। আমান- খোকন পরিষদ বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। আমানুল্লাহ আমান ৭৩৮৯ ভোট পান। ছাত্রদল প্যানেলের প্রার্থীদের প্রাপ্ত গড় ভোট ছিল ৬ হাজারের ওপর। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রলীগ (হা-অ) প্যানেল-এর শাহ আলম পান ৩৬১৯ ভোট। ছাত্রলীগের গড় ভোট ছিল এরকমই। ব্যক্তিগত পরিচিতি ও জনপ্রিয়তার কারণে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে কেবল সাহিত্য সম্পাদক পদে আমীরুল ইসলাম এবং ক্রীড়া সম্পাদক পদে ইমতিয়াজ সুলতান জনি ৫ হাজারেরও বেশি করে ভোট পেয়েছিলেন।
আমীরুল ভাই চলে গেছেন। কিন্তু রেখে গেছেন অনেক অনেক স্মৃতি। অফুরন্ত আড্ডাপ্রিয় আমীরুল ভাই জীবনে লেখালেখি আর আড্ডার বাইরে কিছুই ভাবতেন বলে মনে হয়নি। তিনি হাস্যরসেও ছিলেন তুলনাহীন। প্রাণপ্রাচুর্য বলতে যা বোঝায় তিনি তাই ছিলেন। ঘর সংসার করেননি। কিন্তু পরিচিতজনের সংসারের খবর রেখেছেন। সহমর্মী হয়েছেন। মানুষকে ভালোবেসেছেন। এটাই আমীরুল ভাই। তবে ছাড়াকার আমীরুল ভাই-ই আমার বেশি প্রিয়। তাঁর শিশুপ্রেম, দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ প্রেম সবতো ছড়াতেই লেখা আছে। তাঁর ছড়া পড়লেই লেখক আমীরুলকে বড় বেশি চেনা যায়।
তিনি লিখেছেন,
‘ছড়ায় ছড়ায় রঙের সুর
ছড়া মানেই সমুদ্দর।
নীলকমলের তেপান্তর
সেই খানে কি ছড়ার ঘর?
কোথায় আছে ছন্দ মিল?
ছড়া মানেই রং মিছিল।’
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









