এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
ফোনের ওপাশে ছেলের কণ্ঠ।
কণ্ঠস্বর পরিচিত। কথা বলার ধরন পরিচিত। এমনকি বিপদের সময় ছেলের যে ধরনের অসহায় স্বর হওয়ার কথা, সেটিও যেন হুবহু মিলে যাচ্ছে।
‘বাবা, আমাকে ধরে ফেলেছে।’
‘আমাকে ছাড়াতে টাকা লাগবে।’
‘কাউকে বলো না।’
চলতি বছর লক্ষ্মীপুরের এক বাবার কাছে যে কণ্ঠস্বর ছিল সন্তানের পরিচয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, সেই প্রমাণের বিশ্বাসই একদিন তার জন্য হয়ে উঠল প্রতারণার ফাঁদ।
প্রায় এক ঘণ্টা ফোনে কথা বলার পর তিনি বিশ্বাস করেন, তার ছেলে সত্যিই বিপদে পড়েছে। বাড়ি থেকে বের হয়ে কাছের বাজারে গিয়ে দুই দফায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৮০ হাজার টাকা পাঠান।
এরপর ছেলের আসল নম্বরে ফোন করে জানতে পারেন যে ছেলে তখন অফিসেই বসে আছেন। কোনো গ্রেপ্তার, মামলা কিংবা বিপদ কিছুই ঘটেনি। প্রতারিত হয়েছেন তিনি।
ঢাকার নুজহাত চৌধুরীর অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ।
ফোন করে তাকে জানানো হয়, তার মেয়েকে অপহরণ করা হয়েছে। মেয়েকে ছাড়াতে টাকা দিতে হবে।
ফোনের সবচেয়ে ভয়ংকর অংশ ছিল অন্য জায়গায়।
পেছনে একজন তরুণীর কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিল সে।
কণ্ঠটি নুজহাতের মেয়ের মতোই শোনাচ্ছিল।
প্রতারকরা ধরে নিয়েছিল, মায়ের আবেগ ও আতঙ্ক তাকে দ্রুত টাকা পাঠাতে বাধ্য করবে।
কিন্তু নুজহাত তাৎক্ষণিকভাবে টাকা না পাঠিয়ে মেয়ের ফোনের লাইভ লোকেশন পরীক্ষা করেন। সেখানে দেখা যায়, তার মেয়ে কর্মস্থলে অবস্থান করছেন।
এরপর তিনি মেয়েকে মেসেজ করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেয়ের উত্তর আসে।
মেয়ে নিরাপদ। অর্থাৎ অপহরণের পুরো ঘটনাটিই ছিল সাজানো।
কাছের বন্ধুর স্ত্রী মারা গেছেন? এমন খবরেও প্রতারণা করছে একটি চক্র। চলতি বছরের জুলাই মাসে তারেকের হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে একটি বার্তা আসে: ‘বন্ধু সেলিমের স্ত্রী মারা গেছেন।’
খবরটি শুনে স্বাভাবিকভাবেই শোক প্রকাশ করেন তারেক। এর কিছুক্ষণ পরই শুরু হয় প্রতারণার দ্বিতীয় ধাপ।
তারেকের কাছে ফোন যায়। ফোনের অপর প্রান্তে শোনা যায় সেলিমের কণ্ঠ। তিনি জানান, স্ত্রীকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করতে হবে। কিন্তু হাতে পর্যাপ্ত টাকা নেই। জরুরি ভিত্তিতে কিছু টাকা প্রয়োজন।
পরিচিত মানুষের কণ্ঠ। তার ওপর সদ্য স্ত্রী হারানোর শোক। ফলে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ করার সুযোগও কম।
প্রতারণার শিকার হতে হতেও হননি তারেক।
তার কাছে ফোনটি আসার পর তিনিও প্রথমে বিষয়টি সত্য বলেই ধরে নেন। কারণ ফোনের অপর প্রান্তের কণ্ঠটি তার পরিচিত সেলিমের কণ্ঠের সঙ্গে মিলে যাচ্ছিল। কথাবার্তার বিষয়বস্তুও এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে সন্দেহের কোনো কারণ না থাকে।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর তারেকের মনে সন্দেহ তৈরি হয়। তিনি বিষয়টি সরাসরি যাচাই করার সিদ্ধান্ত নেন।
অন্যান্য বন্ধুদের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেলিমের স্ত্রী মারা যাননি। তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন।
তখনই পরিষ্কার হয়ে যায়, পুরো ঘটনাটি ছিল একটি পরিকল্পিত প্রতারণা।
কিন্তু এখানেই প্রশ্ন: ফোনের ওপাশে যে কণ্ঠ শুনেছিলেন, সেটি কি সত্যিই নির্দিষ্ট ব্যক্তিটির ছেলে, মেয়ে কিংবা বন্ধুর ছিল? লক্ষ্মীপুরের সেই বাবা ছেলের কণ্ঠ শুনে বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু ঢাকার নুজহাত মেয়ের কণ্ঠ শুনেও বিশ্বাস করেননি, যেমনটা বিশ্বাস করেননি তারেক। তারা যাচাই করেছিলেন। তিন ঘটনার পার্থক্য এক জায়গায়: একজন কণ্ঠস্বরকে পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে নিয়েছিলেন। অন্য দুজন কণ্ঠস্বরের বাইরে গিয়ে পরিচয় যাচাই করেছিলেন। এআই-এর যুগে এটাই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
চ্যানেল আই অনলাইনের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে এমনই বেশ কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে। তাই এখন বলাই যায় কণ্ঠস্বর সত্যি শোনালেই যে মানুষটি সত্যি, সেই নিশ্চয়তা আর নেই।
বিদেশেও কণ্ঠস্বর-ভিত্তিক প্রতারণা
বাংলাদেশের ঘটনা যখন কণ্ঠস্বর-ভিত্তিক প্রতারণার নতুন ঝুঁকি দেখাচ্ছে, তখন বিদেশে এর আরও ভয়াবহ নজির পাওয়া যাচ্ছে।
২০২৬ সালের আগস্টে হংকংয়ে এক ব্যক্তি এআই-নির্ভর কণ্ঠস্বরে প্রতারণার শিকার হন। প্রতারকরা হোয়াটসঅ্যাপে তার বাবার কণ্ঠ নকল করে জরুরি টাকা চেয়ে বার্তা পাঠায়।
কণ্ঠস্বর ও কথা বলার ধরন বাবার সঙ্গে মিলে যাওয়ায় তিনি সন্দেহ করেননি।
একবার নয়, বারবার টাকা চাওয়া হয়।
শেষ পর্যন্ত তিনি মোট ১০ মিলিয়ন হংকং ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১ দশমিক ২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৫ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা হারান। হংকং পুলিশ পরে এ ধরনের এআই-ভিত্তিক ভয়েস প্রতারণা নিয়ে সতর্ক করে।
মার্কিন কম্পিউটার নিরাপত্তা সফটওয়্যার কোম্পানি ম্যাকাফি ২০২৩ সালে সাত হাজার মানুষের ওপর এক অনলাইন জরিপ পরিচালনা করে। এতে ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা নিশ্চিত নন যে আসল ও ক্লোন করা কণ্ঠ আলাদা করে শনাক্ত করতে পারবেন। এআই ভয়েস ক্লোনিং স্ক্যাম-এ ৭৭ শতাংশ অর্থ হারানোর কথা জানিয়েছেন উত্তরদাতারা।
কণ্ঠস্বর চুরি হচ্ছে কীভাবে?
এখানেই প্রযুক্তির ভয়াবহ খেলা।
একসময় কারও কণ্ঠ নকল করতে পেশাদার স্টুডিও, দীর্ঘ রেকর্ডিং এবং জটিল সফটওয়্যার প্রয়োজন হতো। এখন এআই-ভিত্তিক ভয়েস ক্লোনিং প্রযুক্তি অনেক বেশি সহজ।
২০২৬ সালের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, আধুনিক ভয়েস ক্লোনিং ও লেখা থেকে কণ্ঠে রূপান্তর (টেক্সট-টু-স্পিচ) প্রযুক্তি আগের তুলনায় আরও বাস্তবসম্মত এবং বিভিন্ন ভাষায় কণ্ঠস্বর তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে।
ফলে প্রতারকের কাছে এখন প্রয়োজন হতে পারে একটি কণ্ঠের নমুনা, ব্যক্তিগত তথ্য, একটি বিশ্বাসযোগ্য গল্প ও দ্রুত টাকা পাঠানোর চাপ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, কয়েক সেকেন্ডের অডিও থেকেও কণ্ঠস্বরের অনুরূপ কৃত্রিম কণ্ঠ তৈরি করা সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা ভিডিও, লাইভ, সাক্ষাৎকার, ভয়েস মেসেজ কিংবা অন্যান্য অডিও তাই সম্ভাব্য ‘ভয়েস ডেটা’ হয়ে উঠছে।
সাধারণ মানুষ কীভাবে বুঝবেন ফোনের অপর প্রান্তের কণ্ঠটি আসল, নাকি এআই দিয়ে তৈরি? জানতে চাইলে এই প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বলেন: কেউ যদি ছেলে বা মেয়ের কণ্ঠ ক্লোন করে অভিভাবকের কাছে ফোন দিয়ে জরুরি টাকা দাবি করে, তাহলে আতঙ্কিত না হয়ে ওই নম্বরে পুনরায় কল করে বিষয়টি যাচাই করতে হবে। প্রতারকের একই নম্বরে অন্য নম্বর থেকে কল করে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারলে খুব সহজেই বোঝা সম্ভব, আগের ফোনকলটি সত্যি ছিল কি না। তাই কণ্ঠ পরিচিত মনে হলেও শুধু ফোনে শোনা কথার ভিত্তিতে টাকা পাঠানো উচিত নয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত পুলিশ, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা, টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান এবং মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় হলে প্রতারণার পর অর্থ আটকে দেওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
সামনে রোবোটিক্সের নতুন আতঙ্ক
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সামনের দিনের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রযুক্তিগত অপরাধ দমন করা। আমরা আশঙ্কা করছি, আগামী দিনগুলোতে প্রযুক্তিগত অপরাধ ব্যাপকভাবে বাড়বে। অপরাধীরা রোবোটিক্স ব্যবহার করে অপরাধ করবে।’
তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ বা এআই ব্যবহার করে মানুষের কণ্ঠস্বর নকল, বিকৃত কিংবা পরিচিত ব্যক্তির কণ্ঠস্বরের আদলে কথা বলে প্রতারণা এখন আর সাধারণ অপরাধ নয়; এটি প্রযুক্তিনির্ভর সংঘবদ্ধ অপরাধের নতুন মাত্রা। ভয়েস ক্লোনিং প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ায় অপরাধীরা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করে অর্থ হাতিয়ে নিতে পারছে। এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় আইন থাকলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষ জনবলের অভাব। অপরাধীরা দ্রুত নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেই গতিতে সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।’
করণীয় কী জানাতে চাইলে এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘‘এখন প্রয়োজন ডিজিটাল ফরেনসিক, ভয়েস অ্যানালাইসিস, সাইবার ট্র্যাকিং, ডেটা অ্যানালিটিকস এবং প্রযুক্তিগত প্রমাণ সংগ্রহে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ। কারণ ভবিষ্যতে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ আরও বাড়বে। তাই অপরাধীদের মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রযুক্তিগতভাবে আরও দক্ষ ও সক্ষম করে তোলা জরুরি।’’
অপরাধের আড়ালে কারা?
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মাসুদ রাজ্জাক চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘‘সামগ্রিকভাবে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি বড় ধরনের ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘদিন ধরে একটি অপরাধচক্র যদি মানুষকে ভয় দেখিয়ে, প্রতারণা করে ও হয়রানি করতে পারে, তাহলে শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেই সমাধান হবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বে অবহেলা, কিংবা কোনো সদস্যের সঙ্গে অপরাধীদের যোগসাজশ বা প্রশ্রয়ের অভিযোগ থাকলে সেগুলোও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। তবে প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করা উচিত নয়।’’
‘‘একই সঙ্গে অপরাধীদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, অর্থের উৎস, যোগাযোগব্যবস্থা ও পেছনের মূল হোতাদের শনাক্ত করে পুরো চক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান চালাতে হবে। অপরাধী নয়, পুরো নেটওয়ার্ক ভাঙাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’’









