জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ার পাশাপাশি আবহাওয়ার ধরনও আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। এর প্রভাব পড়ছে ফ্লাইট চলাচলেও। ঘন ঘন তীব্র ঝড়, বজ্রপাত, ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও উচ্চমাত্রার টার্বুলেন্সের কারণে ভবিষ্যতে ফ্লাইট বিলম্ব ও বাতিলের ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত জুনের শেষ দিকে যুক্তরাজ্য ও উত্তর ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গরমের মধ্যে হঠাৎ করে শক্তিশালী বজ্রঝড় তৈরি হয়। ওই সময় ছুটির মৌসুম শুরু হওয়ায় লন্ডনের হিথ্রো ও গ্যাটউইক বিমানবন্দরে ছিল যাত্রীদের ব্যাপক চাপ।
ঝড়ের কারণে ফ্লাইট চলাচল নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় পড়েন এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলাররা। আকাশপথে ব্যাপক যানজট তৈরি হওয়ায় অনেক ফ্লাইট মাটিতেই অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়। শেষ পর্যন্ত দুই বিমানবন্দর থেকে আসা-যাওয়া প্রায় ৯০০ ফ্লাইট বিলম্বিত হয়। কোনো কোনো ফ্লাইট ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত দেরি করে। বাতিল হয় আরও কয়েক ডজন ফ্লাইট। ইউরোপের অন্যান্য বিমানবন্দর থেকেও লন্ডনগামী যাত্রীরা দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন।
ঘটনাটি নিছক দুর্ভাগ্যজনক সময়ের ফল হলেও ফ্লাইট খাতের অনেকেই মনে করছেন, জুনের এই পরিস্থিতিকে ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত।
ফ্লাইট চলাচলের ঝুঁকি বিশ্লেষক ও সাবেক পাইলট টিম অ্যাটকিনসনের মতে, যুক্তরাজ্য ও উত্তর ইউরোপের অত্যন্ত ব্যস্ত আকাশপথ এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
তার আশঙ্কা, ভবিষ্যতে লন্ডনের সব বিমানবন্দর একই সময়ে ঝড়ের কবলে পড়তে পারে। এমন হলে আকাশে এবং মাটিতে বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হতে পারে।
অ্যাটকিনসন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন খুব দ্রুত ঘটছে। আগে যে ধরনের আবহাওয়ায় একটি বিমানবন্দর সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়লেও পুরো ব্যবস্থা তা সামলে নিতে পারত, ভবিষ্যতে খুব কম পূর্বাভাসে লন্ডনের একাধিক বিমানবন্দর একই সময়ে কার্যক্রম চালাতে অক্ষম হয়ে পড়তে পারে।
লন্ডনের হিথ্রো, গ্যাটউইক, লুটন ও স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দর একসঙ্গে বন্ধ বা সীমিত হয়ে গেলে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আসা এবং ইউরোপের বিপুলসংখ্যক ফ্লাইটকে একই সময়ে বিকল্প বিমানবন্দর খুঁজতে হতে পারে। এতে জ্বালানি কমে আসা কোনো কোনো ফ্লাইটের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তবে সবাই এতটা উদ্বিগ্ন নন। এভিয়েশন অ্যাডভোকেসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক এয়ারলাইন নির্বাহী অ্যান্ড্রু চার্লটনের মতে, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি কল্পনা করা প্রয়োজন হলেও ফ্লাইট চলাচল খাত সংকট মোকাবিলায় যথেষ্ট সক্ষম। তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি গুরুতর হলেও এটি এখনো সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি নয়।
বজ্রঝড় তৈরি হয় বায়ুমণ্ডলের পরিচলন বা কনভেক্টিভ কার্যকলাপের কারণে। ভূমির কাছাকাছি আর্দ্র বাতাস দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওপরে উঠে গেলে তা প্রসারিত ও ঠান্ডা হয়। তখন বাতাসের জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে বড় মেঘ তৈরি করে।
পৃথিবীর তাপমাত্রা যত বাড়ে, বায়ুমণ্ডল তত বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে। ফলে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনাও বাড়ে। তবে এর ফলে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে বজ্রঝড়ের সংখ্যা নিশ্চিতভাবে বাড়বে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন গবেষণায় অবশ্য দেখা গেছে, উত্তর গোলার্ধের উচ্চ অক্ষাংশে ঝড় তৈরির অনুকূল পরিস্থিতি বাড়তে পারে এবং তৈরি হওয়া ঝড় আরও তীব্র হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তরের মতে, বজ্রঝড়ের মোট সংখ্যা হয়তো খুব বেশি বাড়বে না। তবে যেসব ঝড় হবে, সেগুলোর প্রভাব আরও বেশি হতে পারে।
ফ্লাইট সাধারণত বজ্রঝড় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। আধুনিক ফ্লাইট তীব্র আবহাওয়া মোকাবিলায় সক্ষম হলেও বজ্রঝড়ের কারণে প্রচণ্ড টার্বুলেন্স তৈরি হতে পারে। এতে ফ্লাইটের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সিটবেল্ট না বাঁধা যাত্রী ও ক্রু ছিটকে গিয়ে আহত হতে পারেন। শিলাবৃষ্টিও ফ্লাইটের উইন্ডশিল্ড ও ইঞ্জিনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ফ্লাইটের আবহাওয়া রাডার প্রায় ৩২০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সামনের আবহাওয়া সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে। পাইলটরা অনলাইনেও তাৎক্ষণিক আবহাওয়ার তথ্য পান। তবে ঝড় দ্রুত গতিতে সরে যাওয়ায় এসব ব্যবস্থা মূলত স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।
ফলে অনেক সময় উড্ডয়নের পর শেষ মুহূর্তে ফ্লাইটকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে হয়। এতে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হয়।
ঝড়ের কারণে ফ্লাইট বিলম্ব ও রুট পরিবর্তনের ঘটনা বাড়তে থাকলে ফ্লাইট সংস্থাগুলোকে নিয়মিতভাবেই বেশি জ্বালানি নিয়ে উড়তে হতে পারে। এর ফলে পরিচালন ব্যয় বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত খরচের একটি অংশ যাত্রীদের ভাড়ার ওপর পড়তে পারে।
তীব্র ঝড়ের সঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাত বাড়লে বিমানবন্দরে বন্যার আশঙ্কাও তৈরি হয়। ২০২৪ সালের এপ্রিলে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবল বৃষ্টির কারণে রানওয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়েছিল। প্রায় দুই দিন ধরে ব্যাহত হয় ফ্লাইট চলাচল। বাতিল হয় ১ হাজার ২০০টির বেশি ফ্লাইট, ভোগান্তিতে পড়েন কয়েক হাজার যাত্রী।
শুধু রানওয়ে বা ট্যাক্সিওয়ে পানিতে ডুবে গেলেই সমস্যা হয় না। বিমানবন্দরে যাওয়ার সড়ক, রেলপথ কিংবা পার্কিং এলাকা প্লাবিত হলেও যাত্রীরা ফ্লাইট ধরতে পারবেন না।
এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে বিমানবন্দরগুলোকে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। ২০১৩ সালের বড়দিনের সময় ভয়াবহ বন্যার পর গ্যাটউইক বিমানবন্দরও বন্যা মোকাবিলায় কোটি কোটি পাউন্ড ব্যয় করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বড় প্রভাব হলো ‘ক্লিয়ার-এয়ার টার্বুলেন্স’। মেঘ বা অন্য কোনো দৃশ্যমান সংকেত না থাকায় এ ধরনের টার্বুলেন্স আগে থেকে চোখে দেখা যায় না।
সাধারণত এতে সামান্য ঝাঁকুনি হলেও কখনো কখনো পরিস্থিতি গুরুতর হতে পারে। ২০২৩ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের অস্টিন থেকে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টগামী লুফথানসার একটি ফ্লাইটে তীব্র টার্বুলেন্সের ঘটনা ঘটে। ফ্লাইটের উচ্চতা হঠাৎ কমে গেলে যাত্রী ও ক্রুরা কেবিনের ভেতরে ছিটকে পড়েন। পরে ওয়াশিংটন ডিসিতে জরুরি অবতরণের পর সাতজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক পল উইলিয়ামসের মতে, বিশ্বজুড়ে ব্যস্ত ফ্লাইট রুটগুলোতে তীব্র টার্বুলেন্সের পরিমাণ ভবিষ্যতে দ্বিগুণ বা তিন গুণ হতে পারে। উত্তর আটলান্টিকে ১৯৭৯ সালের পর থেকে এ ধরনের ঘটনা ৫৫ শতাংশ বেড়েছে বলেও তিনি জানান।
তবে উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা ও লেজারভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এ ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
ফ্লাইট চলাচলের জন্য আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে হারিকেন স্যান্ডির প্রভাবে নিউইয়র্কের লা গার্ডিয়া বিমানবন্দরের দুটি রানওয়ে কয়েক দিন পানির নিচে ছিল। ঝড় থেমে যাওয়ার পরও বিমানবন্দরটি দ্রুত চালু করা সম্ভব হয়নি।
গবেষণা অনুযায়ী, শিল্পায়ন-পূর্ব সময়ে নিউইয়র্ক অঞ্চলে যে ধরনের বড় বন্যা ৫০০ বছরে একবার হওয়ার আশঙ্কা ছিল, এখন তা প্রায় ২৫ বছরে একবার দেখা যেতে পারে। শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এমন ঘটনা প্রতি পাঁচ বছরেও একবার ঘটতে পারে।
বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ সমুদ্র উপকূল থেকে ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করে। ফলে অনেক বিমানবন্দরই নিচু ও উপকূলীয় এলাকায় নির্মিত। গবেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে অন্তত ২৬৯টি বিমানবন্দর ইতোমধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
বন্যা ঠেকাতে বাঁধ নির্মাণ, রানওয়ে উঁচু করা কিংবা প্রয়োজনে বিমানবন্দর স্থানান্তরের মতো উদ্যোগ নিতে হতে পারে। এতে কয়েক হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত সরকার অথবা যাত্রীদের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফ্লাইট চলাচল খাতকে একই সঙ্গে নিজস্ব কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষ হওয়ার লক্ষ্য পূরণ করতে হচ্ছে। আবার আগামী দুই দশকে বিশ্বে ফ্লাইটের সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিমানবন্দর ও ফ্লাইট সংস্থাগুলোকে আরও বেশি অবকাঠামো, হোটেল, পার্কিং এবং যাত্রীসেবা প্রস্তুত রাখতে হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে ফ্লাইট বিলম্ব, বাতিল এবং রুট পরিবর্তনের মতো ঘটনা পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব হবে না। ফলে যাত্রীদেরও ফ্লাইট ভ্রমণের বাস্তবতার অংশ হিসেবে আরও বেশি সময়সূচি পরিবর্তন ও ভোগান্তির জন্য প্রস্তুত থাকতে হতে পারে।









