মানুষের শরীর যেমন অসুস্থ হতে পারে, তেমনি মনের ভেতরেও কিছু নেতিবাচক প্রবণতা জন্ম নিতে পারে। ইসলামী পরিভাষায় হিংসা, অহংকার, বিদ্বেষ, অতিরিক্ত দুনিয়ামুখিতা, রিয়া ও গুনাহের প্রতি আসক্তি এসবকে অন্তরের ব্যাধি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোরআন-হাদিসে এসব থেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
১. নিজের ভুল স্বীকার করুন
অন্তরের সংশোধনের প্রথম ধাপ হলো নিজের দুর্বলতা চিনতে শেখা। অন্যের ভুল খোঁজার আগে নিজের আচরণ ও নিয়ত নিয়ে ভাবা জরুরি।
কোরআনে বলা হয়েছে—
“বরং মানুষ নিজের সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত।”
—সূরা আল-কিয়ামাহ, ৭৫:১৪
২. নিয়মিত আল্লাহকে স্মরণ করুন
অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখার অন্যতম উপায় হলো জিকির। আল্লাহ বলেন—
“জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।”
—সূরা আর-রাদ, ১৩:২৮
কাজের ফাঁকে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ কিংবা ইস্তিগফার পড়ার অভ্যাস করা যেতে পারে।
৩. হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে নিজেকে দূরে রাখুন
অন্যের সাফল্যে কষ্ট পাওয়া বা তার নিয়ামত নষ্ট হয়ে যাক—এমন আকাঙ্ক্ষা অন্তরকে আরও ভারী করে। বরং অন্যের জন্য কল্যাণের দোয়া করা এবং নিজের জন্য আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া উচিত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা পরস্পরের প্রতি হিংসা করো না।”
—সহিহ বুখারি, ৬০৬৫; সহিহ মুসলিম, ২৫৫৯
৪. অহংকার ত্যাগ করুন
অর্থ, সৌন্দর্য, জ্ঞান কিংবা পদমর্যাদা—কোনোটিই মানুষকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হওয়ার অধিকার দেয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) অহংকার সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
তিনি বলেছেন, “যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”
—সহিহ মুসলিম, ৯১
তাই নিজের অর্জনের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা এবং অন্যকে ছোট না করাই উত্তম।
৫. কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলুন
কোরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়; এর শিক্ষা নিয়ে চিন্তা ও জীবনযাপনে প্রয়োগ করাও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত কোরআন পড়া এবং অর্থ বোঝার চেষ্টা মানুষের চিন্তা ও আচরণকে সংশোধনের সুযোগ তৈরি করে।
আল্লাহ বলেন—
“নিশ্চয়ই এই কোরআন এমন পথের দিকে পরিচালিত করে, যা সর্বাধিক সঠিক।”
—সূরা আল-ইসরা, ১৭:৯
৬. বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার করুন
ভুল হয়ে গেলে নিজেকে শেষ মনে না করে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা উচিত। আন্তরিক তওবার মাধ্যমে মানুষ নিজের ভুল থেকে ফিরে আসার সুযোগ পায়।
সহজ একটি জিকির—
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ
উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহ
অর্থ: “আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।”
তবে তওবা শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ভুল কাজ ছেড়ে দেওয়া এবং সংশোধনের চেষ্টা করাও জরুরি।
৭. ভালো মানুষের সঙ্গ বেছে নিন
মানুষের চরিত্র ও চিন্তায় তার আশপাশের মানুষের প্রভাব পড়ে। তাই সৎ, নেককার ও ইতিবাচক মানুষের সঙ্গে থাকা এবং খারাপ পরিবেশ থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা উচিত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ভালো ও খারাপ সঙ্গীর উদাহরণ দিয়েছেন মিশকের সুগন্ধিবিক্রেতা ও কামারের হাপরের সঙ্গে।
—সহিহ বুখারি, ৫৫৩৪; সহিহ মুসলিম, ২৬২৮
অন্তরের ব্যাধি এক দিনে দূর হয় না। নিজের ভুল চেনা, আল্লাহকে স্মরণ করা, হিংসা-অহংকার থেকে দূরে থাকা, তওবা করা এবং ভালো পরিবেশে থাকার মাধ্যমে ধীরে ধীরে আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া যায়।
অন্তর সুন্দর হলে তার প্রভাব পড়ে মানুষের কথা, আচরণ ও জীবনযাপনে। তাই বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি অন্তরের পরিচর্যাও জরুরি।









