একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চায়। এজন্য তিনি একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র জৈব প্রযুক্তিকে সামনে নিয়ে এসেছেন। জৈব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি, মৎস্য-প্রাণিসম্পদ, স্বাস্থ্য-চিকিৎসা, আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর শিল্পায়ন, টেকসই পরিবেশ উন্নয়ন এবং আধুনিক জৈব ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তুলতে চান।
২০১০ সালে জাতীয় জৈব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী। বর্তমানে জাতীয় জীব ও প্রযুক্তি নীতি ২০২০ প্রণয়ন করেছেন। যার মাধ্যমে জীব ও প্রযুক্তি বিষয়ে সব ক্ষমতা বৃদ্ধি-খাদ্য নিরাপত্তা, টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনাসহ ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জীব ও প্রযুক্তি নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি কর্ম কৌশল চিহ্নিত করেছেন।
উন্নয়নের জন্য কর্মপন্থাগুলো স্বল্পমেয়াদি (২০২১ সাল), মধ্যমেয়াদি (২০২৪ সাল) এবং দীর্ঘমেয়াদি (২০৩০ সাল) সন্নিবেশ করা হয়েছে। যার সঠিক বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই এই প্রতিষ্ঠান সরাসরি তদারকি করেন।
বাংলাদেশে শতকরা ৬৬ ভাগ মানুষের জীবনযাত্রা কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এদেশের কৃষি জমির অপ্রতুলতা, হেক্টরপ্রতি ফলন কম, তদুপরি জনসংখ্যার জীবন যাত্রার মান বৃদ্ধির জন্য খাদ্য ও বস্ত্রের চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে জৈবপ্রযুক্তি বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। জৈবপ্রযুক্তি হচ্ছে একটি নতুন পদ্ধতি ও কলাকৌশল, যা জীব বা এর অংশ ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট বস্তুর উৎপাদন, উন্নয়ন বা রূপান্তর সাধন করা।
এটি বিশেষায়িত বিজ্ঞান, যার প্রয়োগে কৃষকের জন্য উপকারি পুষ্টিমান সমৃদ্ধ, রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধী বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ শস্যে সংযোজন করা সম্ভব।
আধুনিক জৈবপ্রযুক্তির সাথে অন্যান্য পদ্ধতির সঠিক সমন্বয় সাধন করে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যের নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি হ্রাস, কৃষি পণ্যের মূল্য সংযোজন, বহুমুখীকরণ এবং উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্ভব হবে। জীবীয় ও অজীবীয় ঝুঁকি প্রতিরোধী, উচ্চ ফলনশীল এবং উন্নত মানসম্পন্ন, উৎপাদক ও ভোক্তা সাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য ফসলের নতুন জাত উদ্ভাবনে জৈবপ্রযুক্তির অপার সম্ভাবনা রয়েছে।
আগামী দিনগুলোয় কৃষিকে বহুমুখীকরণের মাধ্যমে অধিক পরিমাণে খাদ্য বিশেষ করে- খাদ্য-শস্য, শাকসবজি, ফল, মাংস, মাছ এবং দুধ উৎপাদন করতে হবে।
ভোক্তাসাধারণের নিরাপদ খাদ্য, খাদ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে হলে জমি, পানি এবং শ্রমের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণের জন্য জৈবপ্রযুক্তি গবেষণার মাধ্যমে শস্য, বনসম্পদ, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য এবং অন্যান্য জলজ প্রজাতির আশাতীত উন্নয়ন সম্ভব।
বায়োটেকনোলজি বা জৈব প্রযুক্তি কৃষিতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। ক্রমহ্রাসমান জমি থেকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে বায়োটেকনোলজির বিকল্প নেই। ফসলের ফলন বৃদ্ধি, কাঙ্ক্ষিত জাত উদ্ভাবন, পোকামাকড় রোগবালাই প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন, লবনাক্ততা সহ্য ক্ষমতার জাত, বন্যা-খরা-শৈত্য প্রবাহ সহ্য ক্ষমতা জাত উদ্ভাবন, বড় আকৃতির ফলফুল, সবজি, মাছ, পশু-পাখি উৎপাদন, অল্প সময়ে লাখ লাখ চারা উৎপাদন, চাহিদামতো জাত উদ্ভাবনসহ কৃষির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বায়োটেকনোলজির ভূমিকা অপরিসীম।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, বায়োটেক ফসলই একমাত্র বিশ্বকে ক্ষুধামুক্ত করতে পারে। তাছাড়া জৈব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে যেসব ফসল, ফল, ফুল, সবজির বীজ থেকে চারা উৎপাদন করা যায় না সেইসব গাছের চারা উৎপাদন করা যায়। বছরের যেকোন সময় চারা উৎপাদন করাসহ মৌসুমের করা যায় না সেইসব গাছের চারা উৎপাদন করা যায়। মৌসুমের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। বিলুপ্ত প্রায় উদ্ভিদের জাত সংরক্ষণসহ উদ্ভিদ প্রজননের জন্য হ্যাপ্লয়েড উদ্ভিদ উৎপাদন করা যায়। জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে পশুপাখির টিকা আবিষ্কারসহ অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ তৈরি করা যায়। নাইট্রোজেন সংবন্ধন ব্যাকটেরিয়া তৈরি করা যায়। যা বাতাস থেকে নাইট্রোজেন গ্রহণ করে মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বাড়িয়ে মাটিকে উর্বর করে।
কৃষি বাংলাদেশের জনগণের জীবিকা এবং জীবন মানোন্নয়নের মূল ভিত্তি। দেশের অর্থনীতি প্রধানত কৃষির প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের উপর নির্ভরশীল। জিডিপিতে কৃষির অবদান শতকরা ২০.৬ ভাগ। সরকার খাদ্য নিরাপত্তা এবং দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচনকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে আগামী বছরগুলোয় দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে সীমিত এবং সংকুচিত জমি থেকে কয়েকগুণ বেশি খাদ্য উৎপাদন করতে হবে।
বাংলাদেশের কৃষি প্রায় নানা রকম দুর্যোগ যেমন-বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হয়, যা খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে। কৃষি গবেষণার মাধ্যমে আধুনিক ফলনশীল জাত ও বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। কিন্তু বর্তমানে ব্যবহৃত প্রযুক্তিসমূহ ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত নয়।
জীব প্রযুক্তি একটি শক্তিশালী মাধ্যম যা কৃষিতে প্রয়োগ করে উচ্চ মানসম্পন্ন ও অধিক পরিমাণ শস্যের উৎপাদন সম্ভব। আধুনিক জীব প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রচলিত উদ্ভিদ প্রজনন কর্মসূচির দক্ষতা বৃদ্ধি করে সুনির্দিষ্ট ব্যবহারের লক্ষ্যে জাত উদ্ভাবন বা পরিবর্তন করা, পচনশীল কৃষি পণ্যের সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি এবং জমির উর্বরতা ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা করা যেতে পারে।
ইতোমধ্যে বায়োটেক ফসলের অনেক জাত উদ্ভাবন ও চাষ করা হচ্ছে, যা পোকামাকড় ও রোগবালাই প্রতিরোধী। এই প্রযুক্তি জীবীয় এবং অজীবীয় প্রতিকূলতা সহনশীল জাত উদ্ভাবনসহ পুষ্টিমান উন্নয়ন, সজীবতা সংরক্ষণ, জৈব জ্বালানি উৎপাদন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ব্যবহার করা যাবে।
ইতোমধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান মহোদয় ১২ জানুয়ারি ২০২৩ তারিখে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজিতে ‘সেন্টার ফর নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিং অ্যান্ড অ্যানালাইটিকস’ গবেষণাগার উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনকালে তিনি তিনটি প্রাণীর (গরু, ভেড়া ও হাঁসের) জিনোম সিকোয়েন্সিং কার্যক্রমের সূচনা করেন।
তারই ধারাবাহিকতায় ১০ আগস্ট ২০২৩ তিনি ঘোষণা করেন, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব বায়োটেকনোলজি’র গবেষকগণ দেশি জাতের গরু (মুন্সীগঞ্জ ক্যাটেল/ মীরকাদিম গরু), ভেড়া ও হাঁসের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স সম্পন্ন করেছে। এছাড়া তিনি উল্লেখ করেন, উক্ত প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা সফলভাবে দেশি জাতের গরু, ভেড়া ও হাঁসের জিনোম এসেম্বলি এবং বিশ্লেষণ সম্পন্ন করেছেন।
সিকোয়েন্সিং থেকে বিশ্লেষণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি এনআবি’র নিজস্ব যন্ত্রপাতি এবং বিজ্ঞানীদের দ্বারাই সম্পন্ন হয়েছে, যা বাংলাদেশে জিনোম সিকোয়েন্সিং গবেষণার জন্য মাইল ফলক এবং ইন্সটিটিউটে কর্মরত বিজ্ঞানীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই অর্জন বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই ধরনের উন্নত জিনোম বিশ্লেষণ প্রযুক্তি দেশের প্রাণিসম্পদ শিল্পে গবাদিপশুর আরও সুনির্দিষ্ট উপায়ে প্রজনন, মাংস ও দুধের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পুষ্টিমানের উন্নয়নসহ দেশি গরুর জাত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশের জৈব প্রযুক্তি বিষয়ক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জীববিজ্ঞানীরা এই পর্যন্ত অনেক অণুজীবের উদ্ভিদ ও প্রাণীর জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন করেছেন। ভবিষ্যতে উক্ত জৈব প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের মাধ্যমে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণীজ উৎপাদনে বৈচিত্র্যময়তা আনয়নে ও বৃদ্ধিতে ভূমিকা পালন করবে। সর্বোপরি বলা যায়, বর্তমান সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষি ক্ষেত্রকে উচ্চতার উন্নত শিখরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিরলস ভূমিকা পালন করেছেন।
এজন্য তিনি বাংলাদেশে ‘ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব বায়োটেকনোলজি’ প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং বায়োটেকনোলজি নীতিমালা ২০২০ প্রণয়ন করে জৈব প্রযুক্তিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের খাদ্য সমস্যার সমাধান এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাকে অতিক্রম করতে পেরেছেন। যাহা জৈব প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের সাফল্য হিসেবেই দেখা যেতে পারে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









