বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কলেরা, টাইফয়েড ও হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) টিকার সাশ্রয়ী উদ্ভাবনে অসামান্য অবদান রাখার জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনকারী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. ফেরদৌসী কাদরী এবার পেলেন ভিয়েতনামের ভিনফিউচার স্পেশাল প্রাইজ। এই পুরস্কারটি বিশেষভাবে উন্নয়নশীল দেশের উদ্ভাবক ক্যাটাগরিতে তাকে দেওয়া হয়, তার গবেষণার মাধ্যমে লাখো মানুষের প্রাণ রক্ষা সম্ভব হয়েছে।
গতকাল ৬ ডিসেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যায় ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে হো গুওম অপেরা হাউসে অনুষ্ঠিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী ফাম মিন চিন, ভিন গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ভিনফিউচার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ফাম নাট ভুওং, এবং ভিন গ্রুপের অন্যান্য কর্মকর্তারা। এবারের ভিনফিউচার পুরস্কারের বিষয়বস্তু ছিল “রিজিলিয়েন্ট রিবাউন্ড” বা অদম্য ঘুরে দাঁড়ানো, যা ড. কাদরীর গবেষণার প্রতিফলন।
পুরস্কার গ্রহণের সময় ড. ফেরদৌসী কাদরী তার বক্তৃতায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, উন্নয়নশীল দেশের উদ্ভাবন বিভাগে ভিনফিউচার পুরস্কার পাওয়ায় আমি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছি। দীর্ঘ চার দশক ধরে আমি কলেরা, টাইফয়েড ও এইচপিভি সংক্রান্ত গবেষণায় মনোযোগী ছিলাম, এবং সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগণের জন্য সুলভমূল্যে এসব টিকার উদ্ভাবনে কাজ করেছি। বিশেষভাবে শিশু ও নারীদের জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকরী হয়েছে।
ড. ফেরদৌসী কাদরী আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-তে জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত। তিনি বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছেন সাশ্রয়ী কলেরা টিকা উদ্ভাবন এবং সেটি সহজলভ্য করে লাখো মানুষের জীবন বাঁচানোর মাধ্যমে। তার এই অবদানের জন্য তাকে এ বছর ভিনফিউচার স্পেশাল প্রাইজ প্রদান করা হয়। তিনি ব্যয়বহুল ‘ডকোরাল’ টিকার পরিবর্তে ‘শানকল’ নামে একটি সাশ্রয়ী টিকা উদ্ভাবন করেন, যা পরবর্তীতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
ড. ফেরদৌসী কাদরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও আণবিক জীববিদ্যা বিভাগ থেকে ১৯৭৫ সালে বিএসসি এবং ১৯৭৭ সালে এমএস ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি যুক্তরাজ্যে জৈব রসায়ন ও চিকিৎসা গবেষণায় উচ্চতর পড়াশোনা করেন। ১৯৮০ সালে লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভের পর তিনি আইসিডিডিআরবিতে যোগ দেন। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মিউকোসাল ইমিউনলজি ও ভ্যাকসিনোলজির গবেষণা করেছেন।
অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০০৮ সালে বাংলাদেশ বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির গোল্ড মেডেল, ২০১৩ সালে বিশ্ব বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির সিএনরাও পুরস্কার, ২০২০ সালে ‘লরিয়েল-ইউনেস্কো উইমেন ইন সায়েন্স অ্যাওয়ার্ড’, এবং ২০২১ সালে র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার লাভ করেছেন। সর্বশেষ, ২০২৩ সালে তিনি বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে **স্বাধীনতা পুরস্কার** লাভ করেন।
ড. ফেরদৌসী কাদরীর কাজ বিশ্বের দরিদ্র জনগণের জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে এবং তার গবেষণার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের নামকে বিশ্বমঞ্চে উচ্চাকাঙ্ক্ষী করে তুলেছেন।









