ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) সাবেক প্রধান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন ও তার স্ত্রী শামসুন নাহারের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে। এরই মধ্যে ব্যাংক, বীমা, ভূমি অফিসসহ ৭০টির বেশি সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কোটি টাকা মূল্যের জমির তথ্য, যার একটি অংশ আয়কর নথিতে দেখানো হয়েছে মাত্র দুই লাখ টাকা। তবে এত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পরও এখনো শেষ হয়নি অনুসন্ধান।
প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই অনুসন্ধান আটকে আছে কোথায়?
অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার প্রায় এক বছর আট মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদকের সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমানকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ সময়েও অনুসন্ধান শেষ না হওয়ায় এর অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি সংগ্রহের জন্য ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর ব্যাংক, বীমা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সিটি করপোরেশন, ভূমি অফিস, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)সহ ৭০টির বেশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠান অনুসন্ধান কর্মকর্তা।
ওই চিঠিতে বেলায়েত হোসেন ও তার স্ত্রী শামসুন নাহারের নামে থাকা সম্পদ, আয়-ব্যয় ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়। একই সঙ্গে তাদের তিন সন্তান নাভিল হোসেন তামীম, ফারিহা হোসেন মুমু ও তাজফিকুর হোসেন তানজিফের নামে কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে কি না, সে তথ্যও চাওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে রেকর্ডপত্র পাঠাতে বলা হয়েছিল।
অভিযোগের আংশিক বিবরণে বলা হয়েছে, রাজধানীর ধানমণ্ডি এলাকায় বেলায়েত হোসেনের নামে পাশাপাশি দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। আয়কর নথিতে এগুলোর মূল্য ৯৪ লাখ ১৮ হাজার ৬০ টাকা দেখানো হলেও অভিযোগ অনুযায়ী, বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা।
এ ছাড়া খিলগাঁওয়ের উলন মৌজায় ৪১২ দশমিক ৫ অযুতাংশ জমির মূল্য আয়কর নথিতে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই জমির বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা। একই এলাকায় ২ দশমিক ৮ কাঠা জমির মূল্য নথিতে ৬ লাখ ৭২ হাজার টাকা দেখানো হলেও এর বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আফতাবনগরে বেলায়েত হোসেনের নামে ৫ কাঠা ও ১০ কাঠার দুটি প্লট রয়েছে। ঢাকার ডেমরা, আশুলিয়া ও গাজীপুরে নিকট আত্মীয়দের নামে বিপুল পরিমাণ জমি কেনা, বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা ও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ এবং গাড়ির মালিকানার তথ্যও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিপুল সম্পদের মালিক হলেও বেলায়েত হোসেন আয়কর নথিতে তার মোট সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৯১ লাখ ৪৩ হাজার ৮০৪ টাকা দেখিয়েছেন।
বেলায়েত হোসেনের স্ত্রী শামসুন নাহার নিজেকে গৃহিণী হিসেবে উল্লেখ করলেও তার নামে জমি, ব্যাংক হিসাব, এফডিআর, সঞ্চয়পত্র ও গাড়ি থাকার তথ্য অভিযোগে রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তার দৃশ্যমান নিজস্ব আয় না থাকলেও নিজের, সন্তান ও নিকট আত্মীয়দের নামে প্রায় ৫ কোটি টাকার এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র রয়েছে। রামপুরায় তার নামে প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের জমি থাকার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া তার নামে একটি গাড়ি নিবন্ধিত থাকার তথ্যও অভিযোগে রয়েছে। পরে গাড়িটির নিবন্ধন অন্য একজনের নামে করা হলেও সেটি শামসুন নাহার ও তার পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আয়কর নথিতে শামসুন নাহারের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫৯ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বেলায়েত হোসেন ও শামসুন নাহারের বিরুদ্ধে অর্থ বিদেশে পাচারের মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট লেনদেন, মামলা বা তদন্তের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দেড় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও অনুসন্ধান শেষ না হওয়ার কারণ এবং বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা জানতে চাইলে দুদকের সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, ‘অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর বেশি কিছু বলতে পারব না।’
অভিযোগের বিষয়ে বেলায়েত হোসেনের ব্যক্তিগত দুটি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি প্রতিবারই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। তার স্ত্রী শামসুন নাহারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি এবং ভবিষ্যতে এ বিষয়ে ফোন না করার অনুরোধ করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।









