বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ও চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান আমীরুল ইসলামের মৃত্যুতে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে শোকের ছায়া। তাঁর স্মরণে অগ্রজ, অনুজ অনেকেই দীর্ঘ লেখা পোস্ট করছেন সমাজমাধ্যমে। সময়ের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামালও আমীরুল ইসলামকে নিয়ে দীর্ঘ একটি লেখা পোস্ট করেছেন ফেসবুকে। তাঁর লেখাটি হুবুহু চ্যানেল আই অনলাইনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-
আমীরুল ভাই চলে গেলেন মাত্র ৬২ বছর বয়সে। চলে যাওয়ার জন্য এটা নিশ্চয়ই খুব বেশি বয়স নয়। বিশেষ করে তাঁর মতো মানুষের জন্য, যিনি জীবনকে কেবল যাপনই করতেন না, রীতিমতো উদযাপন করতেন। অন্তত তাঁর যে জীবন আমাদের সামনে উন্মোচিত ছিল, যেভাবে আমরা আমীরুল ভাইকে চিনতাম সেটি ছিল উদযাপনের জীবন, উচ্ছাসভরা জীবন, প্রাণবন্ত জীবন, জগতের রূপ-রস-স্বাদ-সৌরভ আকণ্ঠ পান করবার জীবন। অবশ্য আমরা তো আর সবকিছু জানতাম না; উন্মোচিত জীবনের আড়ালেও কিছু অবগুণ্ঠিত জীবন রয়ে যায়, সে জীবনের কিছুই আমাদের জানা হয়ে ওঠে না।
শামসুর রাহমানের একটা কবিতা আছে ‘একজন কবি: তার মৃত্যু’ শিরোনামে। একজন কবি মৃত্যুবরণ করেছেন, লোকজন দেখতে আসছে, একজন নৈর্ব্যক্তিক স্টাফ রিপোর্টার তার বলপয়েন্ট কলমে দ্রুত নিপুণ টুকে নিচ্ছে কবি জীবনের ভগ্নাংশ-জন্মতারিখ, কী কী গ্রন্থের প্রণেতা, কাকে কাকে রেখে গেলেন, ইত্যাদি। এই কবিতায় একটি পঙক্তি এ-রকম–‘উন্মোচিত জীবনের আড়ালে জীবন খুব অন্ধকারাচ্ছন্ন থেকে যায়।’ আমরাও হয়তো আমীরুল ভাইয়ের উন্মোচিত জীবনের আড়ালে রয়ে যাওয়া কোনো করুণ গল্প জানতাম না!
যেমন, তিনি যে ঘাতক ব্যাধিতে আক্রান্ত, সে-কথা অনেকদিন পর্যন্ত আমরা জানতাম না। কেউ কেউ নিশ্চয়ই জানতেন, আমি জানতাম না।
বছর-চারেক আগে, সদ্য কোভিড মহামারির দুঃসহকাল পেরিয়ে আমরা বাইরে বেরোতে শুরু করেছি, তখন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে দেখা হলো তাঁর সঙ্গে। তিনি যেখানেই থাকতেন সেখানেই তো আনন্দময় এক পরিবেশ তৈরি হতো, তুমুল আড্ডা আর গল্পের স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যেতেন, সেদিনও তেমনই হলো। সভা শেষে খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। সুস্বাদু এবং স্বাস্থ্যকর আয়োজন, তবু তিনি বিশেষ কিছু খেলেন না।
পাশেই বসেছিলাম, বললাম, আপনি তো কিছুই খেলেন না আমীরুল ভাই!
তিনি বললেন, আমার যে অনেক কিছু খাওয়া নিষেধ।
ভাবলাম, এ আর এমন কী! বয়স বাড়লে এমনিই অনেক কিছু খাওয়া নিষেধ হয়ে যায়। আমারও ওরকম অনেক নিষেধাজ্ঞা আছে। তবু কৌতূহল হলো, জানতে চাইলাম, কী হয়েছে আপনার?
বললেন, আমার ক্রিয়েটিনাইন অনেক বেশি।
আমার বুক কেঁপে উঠলো। বললাম : সিকেডি? (Chronic Kidney Disease – CKD ).
হ্যাঁ।
ক্রিয়েটিনাইন কত?
দশের বেশি।
আমার বুক শুকিয়ে গেল। তার মানে সিকেডির শেষ স্টেজ। কিডনি প্রায় অকেজো।
জানতে চাইলাম, ডায়ালাইসিস শুরু হয়েছে?
না হয়নি। মানে ডাক্তার শুরু করতে বলেছেন, আমি আরেকটু সময় নিচ্ছি। শেষবারের মতো একবার আমেরিকায় যাব, ফিরে এসে হাসপাতালে ভর্তি হবো।
আমি তখনই জানতাম, আমীরুল ভাইয়ের সময় ফুরিয়ে এসেছে। কারণ, আমার অগ্রজও মৃত্যুবরণ করেছেন একই রোগে। এবং তখন পুরো ব্যাপারটা দেখাশোনা করেছি আমিই। ডায়ালাইসিস যে আসলে কৃত্রিমভাবে কিছুদিন বা কয়েক বছর বেঁচে থাকা, মোটেও রোগমুক্তি না, তাও তখনই জেনেছিলাম। সিকেডি আসলে অনারাগ্য অসুখ, এর কোনো চিকিৎসা নেই, কোনো নিরাময় নেই। একবার হলো তো বাকি জীবন ক্রুশের মতো বয়ে বেড়াও।
আহা, এরকম একজন প্রাণবন্ত মানুষের এমন একটা রোগ হলো যার কোনো নিরাময় নেই!
কোনোদিন যা করিনি, সেদিন তাই করলাম, বিদায় নেওয়ার সময় তাঁকে জড়িয়ে ধরলাম। ভাইয়ার কথা মনে পড়ছিল, সেকথা বললামও। ভাইয়া ছিলেন সে সময়ের বিখ্যাত সিনে-সাংবাদিক। আশির দশকের মাঝামাঝি শুরু করে প্রায় কুড়ি বছর দাপটের সঙ্গে সাংবাদিকতা করে এই রোগের কারণে তাঁর ক্যারিয়ার এবং জীবন নিভুনিভু হয়ে আসে। আমীরুল ভাইয়ের সমসাময়িক, বয়সে বছর তিনেকের বড়, চেনা-পরিচয় ছিল তাঁদের, জানতেন ভাইয়ার রোগভোগ এবং মৃত্যুর কথাও। ওসব বলতে হলো না। তিনিই বুঝে নিলেন।
ডায়ালাইসিস শুরু হওয়ার পর থেকে এই শেষ কয়েকটি বছর আমীরুল ভাই খুব ভুগেছেন। এমনকি তাঁকে অন্ধত্বও বরণ করতে হয়েছে, যদিও আমি ঠিক জানি না যে, সিকেডির সঙ্গে অন্ধত্বের সম্পর্ক আছে কি না। কিন্তু ভেবে দেখুন, একজন সার্বক্ষণিক লেখক যিনি অধিকাংশ সময় কাটান লিখে এবং পড়ে, তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গেলে আর কী বাকি থাকে! মন খারাপ হয়ে যায় এসব ভাবলে। জীবনকে যিনি এত ভালোবাসেন, জগতের আনন্দযজ্ঞে সাড়ম্বর অংগ্রহণে যাঁর এতটুকু ক্লান্তি নেই, তাঁর কেন এমন হবে?
যখন শুনি, কেউ অনিরাময়যোগ্য চিকিৎসাতীত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান অপারগতা প্রকাশ করছে, তখন বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রাসহ সবকিছুই অর্থহীন মনে হয়। যতই তুমি মহাকাশ জয় করো না কেন, যতই পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার শেখো না কেন, যতই আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স দিয়ে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করো না কেন, যতদিন তুমি মানুষের সব ধরনের রোগবালাইয়ের নিরাময় না করতে পারছ, ততদিন তুমি ব্যর্থ হে মহান বিজ্ঞান!
আমীরুল ভাইয়ের লেখকজীবন শুরু হয়েছিল বেশ অল্প বয়সে। ঊনিশ বছর বয়সে প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম বই, সেটির জন্য পেয়েছিলেন মর্যাদাপূর্ণ শিশু একাডেমি পুরস্কার, তার আগেই পত্রপত্রিকায় লিখে নিজেকে তৈরি করে নিয়েছিলেন, তারপর বিরামহীন লিখে চলা। বাষট্টি বছর বয়সে চলে যাওয়ার আগে তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য রেখে গেলেন বিবিধ রকমের তিন শতাধিক বই! বিস্ময়কর! শিশুদের জন্য লেখা বইয়ে ফাঁকিঝুকি দেওয়া যায় না। তাহলে এতকিছু তিনি লিখলেন কীভাবে? এই ধরনের লেখকদেরই হয়তো Prolific Writer বলা হয়।
এই বিস্ময়কর সৃষ্টিসম্ভারের কথা ভেবে তলস্তয়ের কথা মনে পড়ল। ম্যাক্সিম গোর্কির একটা স্মৃতিগদ্যের বই আছে তলস্তয়কে নিয়ে, Reminiscences of Leo Nikolaevich Tolstoy শিরোনামে। সেখানেই এই প্রসঙ্গটি আছে। হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসন প্রচুর রূপকথা লিখেছেন, বিশ্বব্যাপী সেগুলো অনূদিত এবং জনপ্রিয় হয়েছে। রুশ ভাষায় অনূদিত হওয়ার পর তলস্তয়ও পড়েছিলেন। কিন্তু প্রথমবার তিনি নাকি কিছু বুঝতে পারেননি! বছর দশেক পর দ্বিতীয় পাঠের পর তিনি উপলব্ধি করেন, এন্ডারসন খুব নিঃসঙ্গ ছিলেন এবং সম্ভবত ভবঘুরেও ছিলেন, ঘর-সংসার বলতে তাঁর কিছু ছিল না। সেজন্যই তিনি শিশুদের সঙ্গে মিশতে চাইতেন, কথা বলতে চাইতেন।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ লেখকদের একজন লিও তলস্তয়। তাঁর ব্যাখ্যাটা লক্ষ করুন প্রিয় পাঠক। তিনি নাকি প্রথম পাঠে এন্ডারসনের লেখা বুঝতেই পারেননি! অবাক লাগে না কথাটা শুনে? রূপকথা বুঝতে না পারার কী হলো? এসব তো নিছকই উদ্ভট গল্প, শিশুদের আনন্দ দেওয়ার জন্য আর কল্পনাকে উসকে দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়। তলস্তয় কি তা বুঝতেন না? নিশ্চয়ই বুঝতেন। তাঁর দেশেও তো রূপকথা কিছু কম ছিল না। ‘রুশদেশের উপকথা’ নামের সেই অপূর্ব বইটির গল্পগুলোর কথা নিশ্চয়ই আমরা ভুলে যাইনি। তাহলে তলস্তয় কী খুঁজেছিলেন লেখাগুলোর মধ্যে? আমার ধারণা, লেখাগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থ আর এগুলো লিখবার কারণ।
ছোটোদের জন্য লেখা সব রচনারই দুটো উদ্দেশ্য থাকে। একটি শিশুদের আনন্দের জন্য, অপরটি বড়োদের ছোটোবেলায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। যাহোক, তলস্তয় দ্বিতীয় পাঠে বুঝেছিলেন, এন্ডারসন নিঃসঙ্গ ছিলেন বলেই শিশুদের কাছে যেতেন। এই পর্যবেক্ষণটা গুরুত্বপূর্ণ। নিঃসঙ্গ মানুষ তো সমবয়সী-সমমনা একজন যোগ্য সঙ্গী চায়, এন্ডারসন কেন শিশুদের কাছে যেতেন? ধারণা করি, যেতেন সরলতার সন্ধানে, বিস্ময়বোধের সন্ধানে, নির্মল আনন্দের সন্ধানে।
আমীরুল ভাই সেই বিস্ময়, সরলতা আর আনন্দ কোথায় খুঁজে পেয়েছিলেন আমরা জানি না। কিন্তু নিশ্চয়ই পেয়েছিলেন, নইলে শিশুদের জন্য এত লেখা লিখলেন কীভাবে? আর কীভাবেই বা যন্ত্রণাভরা পৃথিবীতে আনন্দময় জীবন উদযাপন করে গেলেন?









