গোছানো স্বপ্নের সংসার, স্বামী, একমাত্র সন্তান আর উচ্চশিক্ষার আলো—সব মিলিয়ে সুখের রেখাই ছিল মর্জিনা খাতুনের কপালে। কিন্তু কাল হয়ে দাঁড়াল স্বামীর পরকীয়া। পরকীয়া আসক্ত স্বামীর ঘরে ঠাঁই মিলল না। বাধ্য হয়ে একমাত্র কন্যাসন্তানকে কোলে নিয়ে শূন্যহাতে আশ্রয় নিতে হলো পৈতৃক ভিটায়। কিন্তু আজ সেই মর্জিনা খাতুনই ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা গেদুরা ইউনিয়নের অবহেলিত খেরবাড়ী গ্রামের হাজারো মানুষের কাছে আশার প্রদীপ ও পরিবর্তনের অদম্য দূত।
উপজেলার গেদুরা ইউনিয়নের খেরবাড়ী গ্রামের কৃষক পরিবারের নাসিরউদ্দীনের ছয় মেয়ের মধ্যে মর্জিনা সবার ছোট। শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামে। বাড়ির পাশের পাঁচঘড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বনগাঁ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি এবং পরবর্তীতে রাণীশংকৈল ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন।
২০০৮ সালে রংপুরের মমিনপুর গ্রামের আবু সাঈদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর পড়াশোনা কিছুদিন থমকে গেলেও উচ্চশিক্ষা অর্জনের অদম্য ইচ্ছায় পরে ভর্তি হন রংপুর কারমাইকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পর একটি বীমা কোম্পানিতে কর্মজীবনও শুরু করেছিলেন তিনি। এর মধ্যেই তার মোটর মেকানিক্স স্বামী আবু সাঈদ জড়িয়ে পড়েন পরকীয়ার অন্ধকারে। শত চেষ্টা করেও স্বামীকে ফেরাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তিল তিল করে গড়া সংসার ছেড়ে শিশু কন্যাকে নিয়ে ফিরে আসতে হয় বাবার ভিটায়।
বাবার বাড়িতে বাবা নাসির উদ্দিন ও মা হাসিনা কেউ বেঁচে ছিলেন না। বাবার ভিটেমাটি ছাড়া অবশিষ্ট ছিল না আর কোনো সম্পদ। নিজের এবং একমাত্র কন্যাসন্তানের ভরণপোষণ আর লেখাপড়ার খরচ জোগাতে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েন তিনি। কিন্তু কারমাইকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করা মর্জিনা হার মানার পাত্রী নন। কোনো কিনারা না পেয়ে অবশেষে বর্গা জমি নিয়ে নিজেই নেমে পড়েন কৃষিকাজে। পাশাপাশি হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল পালন করে শুরু করেন এক কঠিন জীবনসংগ্রাম। তার সেই একমাত্র কন্যাসন্তান এখন স্থানীয় বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
বাবার বাড়িতে ফিরে আসার পর শুরু হয় নতুন আরেক যুদ্ধ। সমাজের তথাকথিত নিচু মানসিকতার মানুষ আর প্রতিবেশীদের নানা লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা সইতে হয় তাকে। আধুনিকতার ছোঁয়া না লাগা, নাজুক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জেলা শহর থেকে প্রায় ৫২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই খেরবাড়ী গ্রামে কুসংস্কার যেন শিকড় গেড়ে বসেছিল। বাল্যবিবাহ, যৌতুক প্রথা, বহুবিবাহ আর মাদকের ছোবলে এখানকার প্রজন্মের সোনালী স্বপ্নগুলো অকালেই ঝরে পড়ছিল।
এমন অন্ধকার সময়ে মর্জিনার জীবনে আশার আলো নিয়ে আসেন ‘মানবকল্যাণ পরিষদ’ (এমকেপি) ও ‘নেটজ বাংলাদেশ’-এর মাঠকর্মী মনিরুজ্জামান। তাদের সহযোগিতায় মর্জিনা খাতুনের হাত ধরেই খেরবাড়ী গ্রামে গড়ে ওঠে ২৫ সদস্যের ‘নাগরিক সমাজ সংগঠন’ (সিএসও) নামের একটি সামাজিক সংগঠন।
সংগঠনের সদস্য শম্পা আক্তার বলেন, “নবম শ্রেণীতে ওঠার আগেই আমার বিয়ে হয়েছিল। অল্প বয়সে বিয়ের ফলে একজন নারীর শরীরে কী পরিমাণ ধকল যায় তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।” শম্পার মতো এই গ্রামের খাইরুন, সাবিনা, রেখা ও লিজার মতো বহু কিশোরী শিকার হয়েছিল বাল্যবর্বরতার।
খেরবাড়ী গ্রামের কৃষক সোহেল রানা জানান, গত দুই বছর ধরে মর্জিনার বাড়ির উঠানে গ্রামের নারীদের নিয়ে তিনি সমাজ সচেতনতামূলক মিটিং করছেন। তিনি জানান, খেরবাড়ীসহ আশপাশ এলাকায় বাল্যবিবাহের হার বেশি। উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের মোবাইল ফোনের ব্যবহারের ফলে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বাবা-মা তাদের ছেলেমেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। তবে মর্জিনা খাতুনের নেতৃত্বে এলাকার সচেতন নারীদের ভূমিকার কারণে বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা কমতে শুরু করেছে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের সদস্যরা আজ এলাকার মানুষের কাছে পরিবর্তনের দূত। স্থানীয় গেদুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তরিকুল ইসলাম বলেন, “মর্জিনার হাত ধরেই আজ এই গ্রামটি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শুরু করেছে। মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার পথ অনুসরণ করেই তিনি এই এলাকায় এক যুগান্তকারী সামাজিক বিপ্লব ঘটাচ্ছেন।”
মর্জিনা খাতুন বলেন, “মানবকল্যাণ পরিষদ (এমকেপি) ও নেটজ বাংলাদেশ ‘আমার পাশে দাঁড়িয়েছে বলেই আজ খেরবাড়ী গ্রামে নারীর ক্ষমতায়ন, মানবাধিকার রক্ষা, বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন এবং সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আমরা জোরালো ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছি।”
আইনিভাবে সংসার না ভাঙলেও স্বামী আবু সাঈদের অপেক্ষায় আজও বুক বেঁধে আছেন মর্জিনা। কিন্তু ফেলে আসা সুদিনের সেই মানুষটি কি পারবেন মর্জিনার দীর্ঘশ্বাসে ঘেরা জীবনে পুরোনো দিনগুলো ফিরিয়ে দিতে? এই প্রশ্নটিই আজ ভাসছে খেরবাড়ী গ্রামের বাতাসে।









