একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। নাম ‘মিটআপ’। অনলাইনে যোগাযোগ, এরপর নির্দিষ্ট স্থানে সরাসরি জমায়েত। বাইরে থেকে দেখলে এটি হতে পারে পরিচিতদের সাধারণ কোনো আড্ডা। কিন্তু রাজধানীর তেজগাঁও কলেজ জামে মসজিদে ২৩ জনের জমায়েতের পর সেই ‘মিটআপ’ গ্রুপ নিয়েই শুরু হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধান।
পুলিশের দাবি, গ্রুপটির আড়ালে শুধু সামাজিক যোগাযোগ ছিল না। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিভাইস পরীক্ষা করে উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচার এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে সিটিটিসি। তবে কোন সংগঠনের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ ছিল, সেটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
তাহলে ‘মিটআপ’ কি নতুন কোনো উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক তৈরির প্ল্যাটফর্ম? নাকি আগে থেকেই সক্রিয় কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা নতুন নামে যোগাযোগের কাঠামো তৈরি করেছিলেন? তেজগাঁওয়ের ঘটনার তদন্তে এখন এই প্রশ্নগুলোই সামনে।
শুক্রবার বিকেলে ফার্মগেটের তেজগাঁও কলেজ জামে মসজিদের দ্বিতীয় তলায় অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। সেখান থেকে ২৩ জনকে আটক করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য ছিল, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহজনক জমায়েতের খবর পেয়ে অভিযান চালানো হয়েছে। আটকদের তেজগাঁও থানায় নেওয়ার পর তাদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই শুরু হয়। পরে তাদের সিটিটিসি কার্যালয়ে নেওয়া হয়।
তেজগাঁও থানায় নেওয়ার সময় শিহাব উদ্দিন নামে একজন সাংবাদিকদের বলেন, একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমেই তারা মসজিদে একত্রিত হয়েছিলেন। পুলিশের অনুসন্ধানে পরে ওই গ্রুপটির নাম ‘মিটআপ’ বলে সামনে আসে।
ঘটনার পরপরই ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তাদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। আটক ব্যক্তিরা কোন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।
সিটিটিসি প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শামসুল হক বলেন, “আমরা যাচাই-বাছাই করছি। যাচাই-বাছাই শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।”
প্রথমদিকে আটক ২৩ জনের সবার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। যাচাই শেষে ১১ জনকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। বাকি ১২ জনকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে সিটিটিসি। তাদের প্রত্যেকের সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হলেও আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে সামনে এসেছে আটকদের মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিভাইস।
মামলার নথি অনুযায়ী, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বক্তব্যে পুলিশ সন্তুষ্ট হতে পারেনি। পরে জব্দ করা ডিভাইস পরীক্ষা করে হোয়াটসঅ্যাপের একটি গ্রুপের সন্ধান পাওয়া যায়। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই গ্রুপের মাধ্যমে উগ্রবাদী মতাদর্শ নিয়ে কথাবার্তা ও যোগাযোগ করা হতো।
সিটিটিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার ১২ জনের বিরুদ্ধে নাশকতার পরিকল্পনা এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, ‘মিটআপ’ গ্রুপের সদস্যদের কথোপকথনে ধর্মীয় উগ্রবাদ ছড়ানোর বিষয় ছিল এবং উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে তদন্তের এই পর্যায়ে একটি বিষয় পরিষ্কার নয় এই যোগাযোগের শেষ প্রান্ত কোথায়?
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রুপটির অ্যাডমিন ছিলেন শিহাব উদ্দিন। গ্রেপ্তার ১২ জনের মধ্যে তার সঙ্গে সাব্বির আহমেদের নামও সামনে এসেছে নেতৃত্বের পর্যায়ে।
শিহাবের বিরুদ্ধে আগের একটি মামলার তথ্যও তদন্তে এসেছে। প্রকাশিত আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে নরসিংদীর পলাশ থানায় আগের মামলা রয়েছে। সাব্বির আহমেদের বিরুদ্ধেও তেজগাঁও থানায় পুরোনো মামলা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পুরোনো মামলা থাকার বিষয়টি অবশ্য বর্তমান উগ্রবাদ-সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ নয়; বর্তমান মামলায় তাদের বিরুদ্ধে কী প্রমাণ পাওয়া যায়, সেটিই তদন্তে নির্ধারণের বিষয়।
বর্তমান মামলায় তাদের বিরুদ্ধে মূল প্রশ্ন হলো ‘মিটআপ’ গ্রুপের মাধ্যমে তারা কী ধরনের যোগাযোগ করছিলেন এবং সেই যোগাযোগের সঙ্গে কোনো উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের বাস্তব সম্পর্ক ছিল কি না।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে দেখা গেছে, উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা অনলাইন যোগাযোগ ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ, মতাদর্শ প্রচার এবং নতুন সদস্যদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেছে। এবার তেজগাঁওয়ের ঘটনায়ও অনলাইন যোগাযোগের পর একটি বাস্তব জমায়েতের তথ্য সামনে এসেছে।
কিন্তু ‘মিটআপ’কে কোনো নতুন জঙ্গি সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার মতো তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
এমনকি পুলিশের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত বলা হয়নি যে গ্রুপটির সদস্যরা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য। বরং রিমান্ড আবেদনে উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। কোন সংগঠন, কী ধরনের যোগাযোগ এবং সেই যোগাযোগের মাত্রা কতটুকু এসবই এখন তদন্তের বিষয়।
তদন্তকারীদের সামনে আরেকটি প্রশ্ন: এই গ্রুপের সদস্যরা কি নিজেরাই একটি নতুন যোগাযোগ কাঠামো তৈরি করেছিলেন, নাকি আগে থেকেই সক্রিয় কোনো নেটওয়ার্কের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল?
রিমান্ড আবেদনে উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা থাকলেও প্রকাশ্যে কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের নাম নিশ্চিত করা হয়নি। তাই এ মুহূর্তে আনসার আল ইসলাম, নব্য জেএমবি, হিযবুত তাহরীর বা অন্য কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে ‘মিটআপ’-এর সরাসরি যোগসূত্র আছে; এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তদন্তে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে গ্রুপের সদস্য তালিকা, তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ, পূর্ববর্তী যোগাযোগের ইতিহাস এবং জব্দ করা ডিভাইসের তথ্য।
একজন সদস্যকে ঘিরে তদন্ত যতটা এগোয়, তার সঙ্গে যোগাযোগ থাকা অন্যদের ভূমিকা ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২৩ জনের মধ্যে ১১ জনকে যাচাই শেষে ছেড়ে দেওয়া এবং ১২ জনকে রিমান্ডে নেওয়ার ঘটনাও দেখাচ্ছে যে পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে সবার ভূমিকা একইভাবে পাওয়া যায়নি।
শিহাবের বক্তব্য অনুযায়ী, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমেই তারা সেখানে একত্রিত হয়েছিলেন। কিন্তু কেন একটি অনলাইন গ্রুপের সদস্যরা নির্দিষ্ট করে তেজগাঁও কলেজের মসজিদে একত্রিত হলেন এটাই এখন তদন্তের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।
পুলিশ বলছে, তাদের ডিভাইসে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের আলামত পাওয়া গেছে। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, তারা উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচার এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের সঙ্গে জড়িত। আদালতও তদন্তের স্বার্থে তিন দিনের রিমান্ড দিয়েছেন।
তবে অভিযোগ আর প্রমাণ এক বিষয় নয়। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষার পরই জানা যেতে পারে তাদের কথোপকথন কতটা সংগঠিত ছিল, তারা কোনো কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করছিলেন কি না এবং ‘মিটআপ’ গ্রুপের বাইরে তাদের যোগাযোগের পরিধি কতদূর।









