গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক। গ্রিনল্যান্ড দখল বা প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ডেনমার্কের কয়েক মাসের কূটনৈতিক বিরোধের পর এ সমঝোতা হলো।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
ট্রাম্প বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রয়োজনের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ‘স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’ পাবে। তবে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন ট্রাম্পের উল্লেখ করা নির্দিষ্ট বিষয়গুলো নিশ্চিত করেননি।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, এই চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোনো খরচ হবে না। এর মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রয়োজনীয় সবকিছু করার’ সুযোগ পাবে।
তিনি আরও বলেন, চুক্তিতে এমন একটি বিধান থাকবে, যার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া কোনো প্রতিপক্ষ দেশ গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে বা ‘সংবেদনশীল বিনিয়োগ’ করতে পারবে না।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে চুক্তিটি স্বাক্ষর করা হবে। তিনি বলেন, এটি আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে দুই দেশের নিরাপত্তা জোরদার করবে। একই সঙ্গে ডেনমার্ক রাজ্যের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারও স্বীকৃতি দেবে।
তবে চুক্তিটি কার্যকর করতে ডেনমার্কের আইনপ্রণেতাদের অনুমোদন প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
গ্রিনল্যান্ড সরকারের চেয়ারম্যান ইয়েন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন বলেছেন, চুক্তিটি গ্রিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও জোরদার করবে। তার ভাষ্য, এতে গ্রিনল্যান্ডের স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় তাদের অবস্থানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন ট্রাম্প। তিনি এর আগে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটি কিনে নেওয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
গ্রিনল্যান্ডের সম্ভাব্য শত্রু দেশ রাশিয়া ও চীনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে দাবি করে ট্রাম্প সেখানে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন। তার এসব বক্তব্য ডেনমার্কসহ ন্যাটোর অন্যান্য সদস্যদেশের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চুক্তিটিকে ‘ঐতিহাসিক’ এবং ‘যুক্তরাষ্ট্র ও মার্কিন জনগণের জন্য বড় বিজয়’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, চুক্তির মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ স্থায়ীভাবে ও পুরোপুরি সমাধান হবে।
তবে এখনো চুক্তির পূর্ণাঙ্গ লিখিত পাঠ প্রকাশ করা হয়নি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চুক্তিতে এমন বিধান রয়েছে যে ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ড স্বাধীন দেশ হলেও চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হবে না। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড বা ডেনমার্কের অনুমোদন ছাড়াই সেখানে অতিরিক্ত সামরিক স্থাপনা নির্মাণের একতরফা ক্ষমতা পাবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সেখানে ‘স্থায়ী প্রবেশ, সামরিক ঘাঁটি স্থাপন ও আকাশপথ ব্যবহারের অধিকার’ থাকবে।
চুক্তিতে ন্যাটোর বাইরের দেশগুলোর গ্রিনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ নিষিদ্ধ করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে এমন বিনিয়োগ থেকে প্রতিপক্ষ দেশগুলোকে বিরত রাখার বিধানও রয়েছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
তিনি বিশেষভাবে রাশিয়া ও চীনের কথা উল্লেখ করে বলেন, চুক্তির আওতায় এসব দেশ গ্রিনল্যান্ডে সেনা মোতায়েন বা সংবেদনশীল খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে না।
তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ না হওয়ায় ১৯৫১ সালে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া চুক্তির সঙ্গে নতুন সমঝোতার পার্থক্য কতটা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ওই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে প্রয়োজন অনুযায়ী বিপুলসংখ্যক সেনা পাঠাতে পারে।
বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পিটুফিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের শতাধিক সামরিক সদস্য স্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন।
এদিকে গ্রিনল্যান্ডে ‘গোল্ডেন ডোম’ নামে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন ট্রাম্প। রাশিয়া ও চীনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সুরক্ষিত রাখতে এ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন। এ উদ্যোগে ইউরোপীয় মিত্ররাও সহযোগিতা করতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
গ্রিনল্যান্ডে বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজের মজুত রয়েছে। এসব খনিজের অনেকগুলোই মোবাইল ফোন, বৈদ্যুতিক গাড়িসহ আধুনিক প্রযুক্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ।









