এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত নুসরাত জাহান রাফী হত্যা মামলায় হাইকোর্টে খালাস পাওয়ার পর গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কামরুন নাহার মনি।
দীর্ঘ প্রায় সাত বছর কারাবাসের পর মুক্তির সময় তার সঙ্গে বেরিয়ে এসেছে কারাগারে জন্ম নেওয়া কন্যাসন্তান মোবাশ্বিরা খানম রাথী।
কারাগার থেকে বের হওয়ার পর মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন মনি। দীর্ঘ কারাজীবনের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, কারাগারে থাকা অবস্থায় মেয়েকে নিজের মতো করে বড় করেছেন।
মনি বলেন, ‘মেয়েকে মোজা দিয়ে পুতুল বানিয়ে খেলতে দিতাম। বালিশকে স্কুলব্যাগ বানিয়ে পড়ালেখা করাতাম। একজন মা হিসেবে আমার ও মেয়ের কষ্ট কেউ বুঝবে না। বাবা কখনো মায়ের মতো সন্তানকে যত্ন করে রাখতে পারে না। আমি তাকে নিয়ে আগামী জীবন থাকতে চাই।’
যারা তাকে অন্যায়ভাবে নির্যাতন করে ফাঁসির আসামি করেছেন, তাদের বিচারও দাবি করেন মনি।
২০১৯ সালের ১৫ এপ্রিল গ্রেপ্তার হওয়ার সময় পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন মনি। ওই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। মেয়ের নাম রাখা হয় মোবাস্বেরা খানম রাথী। তবে মনি তাকে আদর করে ‘রোজা’ নামে ডাকেন।
মেয়ের জন্মের মাত্র এক মাস পরই নুসরাত হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া ফাঁসির রায় শুনতে হয় মনিকে। মায়ের কোলে থাকা নবজাতকও সেদিন সেই রায়ের সাক্ষী হয়।
দীর্ঘ সময় কাশিমপুরের কনডেম সেলে থাকার সময় মেয়ে মায়ের সঙ্গেই বড় হয়েছে। এর মধ্যে মনির স্বামী রাশেদুল আলম খানের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়। ফলে পরিবার ও স্বজনদের কাছ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মায়ের সঙ্গেই বেড়ে উঠেছে রাথী।

মনির মা নুর নাহার বলেন, মেয়ের মামলার খরচ চালাতে গিয়ে পরিবারের প্রায় সব সম্পদ শেষ হয়ে গেছে। ঋণ করে মামলা চালাতে হয়েছে। অর্থাভাবে নিয়মিত নাতনিকে দেখতে যেতে পারেননি তিনি।
তিনি বলেন, ‘বাইরের পরিবেশটা কি নাতনি এখনো জানে না। ওখানে মা আছে। আরেকজন আসামিকে ছোট মা ডাকে। তারাই আদর-যত্ন করে। কিন্তু পোলাপানের মন কি আর মানে! জেলেও কষ্ট করছে, বাইরে এলেও কষ্ট করবে।’
এদিকে মেয়েকে নিয়ে দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদের কষ্টের কথা ফেসবুকে তুলে ধরেছেন মনির সাবেক স্বামী রাশেদুল আলম খান।
তিনি লিখেছেন, বাবা হয়েও মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরার সুযোগ পাননি। কারাগারে দেখা করতে গেলে নিরাপত্তার কারণে দূর থেকেই মেয়েকে দেখতে হতো। কখনো জানালার ফাঁক দিয়ে মেয়ের পায়ের আঙুল ছুঁয়ে আদর করার চেষ্টা করতেন।
রাশেদুল লিখেছেন, কাশিমপুরে যাওয়ার পর মা ও মেয়ের মাঝখানে খাঁচার মতো একটি দূরত্ব থাকত। মেয়েটি তাকে ঠিকমতো দেখতে পারত না। ফলে একপর্যায়ে মেয়ের কাছে তিনি অপরিচিত হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তিনি আরও লেখেন, ২১ সেপ্টেম্বর রাথীর সাত বছর পূর্ণ হবে। মেয়েকে ছাড়া তিনি ১৪টি ঈদ ও সাতটি জন্মদিন পার করেছেন। দীর্ঘদিন পর মেয়ের সামনে দাঁড়াতে পারবেন কি না, মেয়ে তাকে চিনবে কি না, তা নিয়েও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন তিনি।
২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে নুসরাত জাহান রাফীর গায়ে আগুন দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলার ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে আসামিরা হাইকোর্টে আপিল ও জেল আপিল করেন।
দীর্ঘ শুনানি শেষে সোমবার হাইকোর্টের বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে তৎকালীন মাদরাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। খালাস পেয়েছেন ১০ আসামি। তাদের মধ্যে কামরুন নাহার মনি একজন।









