প্রতিটা মানুষের জীবন আসলে এক একেকটা বই, কারোটা লেখা হয় কারোটা হয় না। আমার মায়ের মুখে প্রায়ই যে কথাটা শুনতাম,‘এমন জীবন করিবে গঠন, মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।’ সত্যিই মাত্র চার দিন গত হয়েছে, ১১ সেপ্টেম্বর বরেণ্য শিশুসাহিত্যিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আমীরুল ইসলাম মৃত্যুকে বরণ করেন। দেশের মানুষ যে তাঁকে এতটা ভালোবাসতো তা হয়তো তিনি নিজেও জানতেন না।
আহারে জীবন -আহারে মৃত্যু! তবে এই মৃত্যু তো মৃত্যু নয়। ঐ যে মূল্যবান সেই কথাটি, ‘কৃত্তী মানের মৃত্যু নেই।’ তেমনি এই প্রথিতযশা অমর হয়ে থাকবেন এদেশের মানুষের হৃদয়ে। মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী। ইংরেজ কবি তাঁর ‘ডেফোডিল’ কবিতায় মানুষের সংক্ষিপ্ত জীবনের বর্ণনা করেছেন অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে। মাত্র বাষট্টি বছর বয়সে তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য জ্ঞানের যে ভাণ্ডার রেখে গেছেন তা অতুলনীয়।
আমীরুল ইসলাম ছড়া, কবিতা, নাটক, গল্প- উপন্যাস প্রায় ২০০ এর বেশি বই রচনা করেছেন। শিশুদের আনন্দ,মনস্তত্ব ও কল্পনার জগতকে তিনি সহজ ও প্রাণবন্ত করে বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছেন। ‘কিশোর’ কবিতায় কবি যেভাবে প্রকাশ করেছেন, “আমরা নূতন আমরা কূড়ি নিখিল বন নন্দনে/ ওষ্ঠে রাঙ্গা হাসির রেখা জীবন জাগে স্পন্দনে/ লক্ষ আশা অন্তে ঘুমিয়ে আছে মন্তরে/ ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।”
কবির এই কালজয়ী পংক্তিগুলো অত্যন্ত জটিল মনে হবে বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের জন্য। আবহমান কাল থেকে আজ পর্যন্ত ভাষা ও সংস্কৃতি প্রবহমান কালের যাত্রায় পরিবর্তনশীল। তাই তো আমীরুল ইসলামরা ‘কিশোর’ কবিতার মতো জটিল কবিতা আত্মস্ত করেই বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের মেধা বিকাশে সহজ রচনাগুলো সামনে তুলে ধরেছেন। সময়ের প্রেক্ষাপটে অভিভাবকেরা শিশুদের নিয়ে উদ্বিগ্ন এই ভেবে যে, সমাজ নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু উদ্বিগ্ন হওয়ার আগে ভাবতে হবে, মানুষে মানুষে যোগাযোগ বিস্তৃত ছিল না। প্রচারের এত বেশি মাধ্যমও ছিল না। পৃথিবী জুড়ে জনসংখ্যাও এত ছিল না৷ এই হিসেবে সমাজ পুরোটা নষ্ট হয়ে যায়নি।
সব যুগেই পৃথিবীতে ভালো-মন্দ মানুষ একসাথে বসবাস করেছে। এই যে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মূল্যবান কথাটি, “আলোকিত মানুষ চাই”। জীবন্ত কিংবদন্তি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সৃষ্টির উল্লাসে কতই না আলো ছড়িয়ে চলেছেন। শিশু সাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিলেন। এই উপমহাদেশের অন্যতম স্যাটেলাইট টেলিভিশন ‘চ্যানেল আই’ এর অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
আমীরুল ইসলাম ৭ এপ্রিল ১৯৬৪ সালে পুরান ঢাকার লালবাগে জন্ম গ্রহণ করেন। পরিবার অর্থাৎ ভাতৃত্ব বন্ধন ছিল অটুট। পুরান ঢাকার খাবার ও পোশাকের ঐতিহ্য আজও প্রচলন রয়েছে ডাকাবাসীর মাঝে। তাদেরই একজন আমীরুল ইসলাম। সম্পর্কের বন্ধন বলতে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে গেছে এবং দেশের মানুষের মন নেড়ে উঠে। মনের মধ্যে বড় ব্যথা অনুভূত হয়েছে। আমরা বাংলাদেশীরা মানুষকে যে কত ভালোবাসি কতই না আপন ভাবতে পারি।
এর একটি বাস্তব উদাহরণ, আমার মা তখন বড়জোর পনেরো বছর বয়স হবে, এক কিশোরী, আমার বাবার চাকুরি সুবাদে ভারতের জলপাইগুড়িতে অবস্থান। তখন এক প্রতিবেশী পূর্ব (তখন পূর্ব বাংলা নাম ছিল) বাংলার ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্ভুক্ত টাঙ্গাইলের বাসিন্দা ছিলেন উনারা। নিজ এলাকার মানুষ পেয়ে উভয় পরিবারের সম্পর্ক হয়ে উঠেছিল নিবিড়। আমার মা একটা পাখি দেখলেও ভাবতেন নিজের গ্রামের পাখি, তাই যত্ন করে দানা-পানি দিতেন। আমীরুল ইসলাম আমাদের কাঁদিয়ে, শোকে ভাসিয়ে চলে গেলেন পরপারে। মহান আল্লাহ পাক আমীরুল ইসলামকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।









