এই তো সেদিন….. অফিসের করিডোরে দরাজ গলায় ডাকছিলেন আমীরুল ইসলাম। বলছেন, ‘তুমি মিয়া একটা চিজ! তোমার মনের তল কত? তারপর পাশের জনকে দেখিয়ে (যিনি তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য এসেছেন) সেই তাকে বলছেন, ও হলো কেকা। দেখতে ছোট্টখাট্টো পিচ্চি! কিন্তু লেখে ভালো!’
বলেই আবার হাঁক দিলেন, লিখছো তো? লেখাটা ছেড়ো না মেয়ে! চালিয়ে যাও! পরে আরেক লাইন যুক্ত করে বললেন, ওহ ভালো সাংবাদিকও।
এই হলো শিশু সাহিত্যের নিমগ্ন ও বোহেমিয়ান আমীরুল ইসলাম। চ্যানেল আই’র অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান। তাঁর জন্ম ১৯৬৪ সালের ৭ এপ্রিল। বৈশাখের কালবৈশাখীর দূরন্ত এক ঋতুতে। তাই হয়ত তাঁর চলনে-বলনে ঝড়ের দুরন্তপনার বেগ। অসীম প্রাণশক্তির সাথে হইহই রইরই আড্ডা, হাসি আর ভোজন প্রিয়তায় তাঁর দিনমান কাটাত। চারপাশে বেশ আসর জমিয়ে।
বাংলা আধুনিক শিশু সাহিত্যের নতুন ধারায় তাঁর নাম ডাক খুব জানি। তবে ওই যে বাংলায় খুব প্রচলিত একটা প্রবাদ আছে না- ‘দূরের বাদ্যি মিষ্টি লাগে’ মানে ঘরের এত কাছে একজন সাহিত্যের নিমগ্নজন আছেন! তাকে রোজ দিন দেখি তার প্রাণময় আড্ডা হাসির মোড়কে একজন অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধানকে হররোজের বহতায়।
দারুণ রসবোধ ও ভোজনরসিক। ক্যান্টিনে আমরা যখন চকে বাঁধা খাবার খেয়ে দৌড়ে নিচে নামছি, তখন তিনি তাঁর নিজের হাতে রান্না খাবার নিয়ে আসর জমিয়ে মজলিসে ৫-৭ জনকে নিয়ে খেতে বসবেন সেই আয়োজন করছেন! কোন কোন দিন ঢাকাইয়া ঢংয়ে বলে বসতেন, ‘বইসা পড়ো! হাঁসের মাংস দিয়ে মেরে দাও’। আহ্ ভাইয়া মিস করলাম কেবলই খেলাম ভাইয়া! নিউজ আছে আরেক দিন খাবো! ঠিক আছে আরেক দিন! ততক্ষণে তাঁর নিজ হাতের রান্নার বাটি মেলে ধরেছেন কেউ কেউ। তাতেই কি সে কি সুবাস! মৌ মৌ করছে পুরো ক্যান্টিন।’
আমাদের ঘরের মানুষ প্রিয় আমীরুল ইসলাম এমনই তাঁর চলন-বলন। আজ তাঁর ইহলোক ছেড়ে যাওয়া, দিনের হিসেবে তৃতীয় দিন। অথচ মনে হলো এই তো সেদিন অফিসের করিডোরে হইহই করে একরাশ প্রাণ উচ্ছ্বাস নিয়ে দরাজ গলায় হেঁকে ডেকে নামছেন! তিনি অফিসে প্রবেশ করছেন বা বেরিয়ে যাচ্ছেন চারপাশ সরব হবে না এটা ঘটতে পারেই না। কেন কি আমীরুল ইসলাম মানেই অফুরন্ত তাঁর প্রাণ! গলার দরাজ উত্তাপই তাঁর সহজেই কাউকে আপন করা কাছে টানার সম্মোহনীর অপার শক্তির আধাঁর।
চ্যানেল আই একই অফিসে আজ দুই দশক। তবে আমি বেশ নিভৃতচারী কাজের আগে পরে না কাজের সাথেই আমার অফিসের সাথে সম্পর্ক চলে! বিধায় খুব কমই এদিক সেদিক ঢু দেওয়া হয়। কিন্তু অদ্ভুত হলো: শিশু সাহিত্যের নিমগ্নতায় ঢুবে থাকা এক লেখক আমীরুল ইসলাম আছেন প্রাণময়তা ছড়িয়ে। তাঁর রুমের সামনে দিয়ে আসা-যাওয়ার পথে উচ্চস্বরের আড্ডা হাসি আর জীবনমুখী নানান গল্পের আবগ ছড়াচ্ছেন! তাঁর সঙ্গী নামি-দামি সব সাহিত্যের সাধক বোদ্ধারা। পেশায় সাংবাদিক কিন্তু লেখালেখির জন্য সময় পেলেই নিজেও কলম তুলি। তাই খ্যাতিমান সব লেখক-সাহিত্যিকদের তাঁর কক্ষে নিত্য আনাগোনায় মুখরিত দেখে নিজেরও খুব আকাঙ্খা হতো খানিক বসি, শুনি- তাদের সাহ্যিতের গতি প্রকৃতির বিশ্লেষণ আর চিন্তার ধরণ-ধারণ জানি।
তাই অনুষ্ঠান বিভাগের আমীরুল ভাই রাজ্যের খ্যাতিমান সাহিত্যের বোদ্ধাদের নিয়ে আসর জমিয়ে জীবনবোধ আর সাহিত্যের নিমগ্নতায় আড্ডা দেওয়া খুব টানতো! আর একেকজন ওজনদার সাহিত্যের সাধক বোদ্ধারা হাহা হাসি-আড্ডায় গল্পে মেতে সাহিত্যের বৈশ্বিক ও দেশী ভিন্নদেশী ডেসেকশন করছেন খুব লোভ হতো আমার! তাদের এমন নির্মল আড্ডার প্রাণবন্ত উৎসবমুখরতা আমার কাছে রুপক অর্থে যেন তা হয়ে উঠে- ‘লাঠি লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্কর বাড়ির ছেলেরা। আর আমি যেন সেই ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে ভেতরের রাস উৎসব দেখছির ন্যায়’!
তাঁর রুম থেকে চ্যানেল আই নিউজ রুম মাত্র গজ কতক ব্যবধান। তাও নিউজ রুমে আসতে-যেতে হয় আমীরুল ইসলামের হাসি প্রাণময় আড্ডার আঁওয়াজ পাশ কাটিয়েই। তাদের রোজের জীবন বহতায় সাহিত্যের নানান পথ পথিক ও নানান স্মৃতিচারণ, রসাক্ত গল্পের সাথে কথায় কথায় আমীরুল ইসলামের কবিতার ছন্দে কথার ডেলিভারিতে উপচে পড়তো আবেগ। সেই আবেগ উচ্ছ্বাস আমাকেও খুব তাড়িত করেছে।
তথাপিও নিউজের তাড়া টাইমলাইনের তাগিদে দৌড়ে চলেছি নিউজ রুমের ‘সংবাদের টাইমিং স্টেশনের ডেটলাইনের ছন্দে মেলাতে!’ আমীরুল ইসলামের অফিস কক্ষ তখন সেই গুণি, বোদ্ধা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সৃজনশীর সাধককেরা রকরকম আমোদে হেসেছেন— তা দেখেছি।
তবে প্রিয় সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই কালজয়ী কবিতা ‘কেউ কথা রাখেনি’র আরেক ছত্র—‘আমার দিকে তারা ফিরেও চাননি’—তা বলতে পারছি না। কেন কি, তাঁর কক্ষের সামনে দিয়ে আসা যাওয়ার পথে দেখা হলেই তিনি ডেকেছেন। কুশল বিনিময় করে সাথের গুণিজনের সাথেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।
এভাবেই একদিন তিনি তৎকালীণ জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণি শিক্ষক কবি মুহাম্মদ সামাদকে নিয়ে তাঁর অফিস কক্ষে যাচ্ছেন। স্যার ডাকলেন আমীরুল ইসলামও কী অসাধারণ ভাবে তাঁর স্বভাবজাত কন্ঠে হইহই করে বললেন–‘ওতো খুব ভালো লেখে।’
সে-বছরই আমার আরেকটি গ্রন্থ ‘ভাষা আন্দোলনের সাত দশক: জানা অজানা’ বেরিয়েছে। আমীরুল ইসলাম নিজেই সেই বইটির প্রসঙ্গ তুললেন। বললেন বইটি খুব ভালো হয়েছে। পরে বললেন, বইটি স্যারকে দেখতে পারে। আরও বললেন বইটি কাছে আছে কি? ১-২ কপি থাকতে পারে আমার ডেস্কে থাকতে পারে। বলতেই তাড়া দিলেন- যাও। তিনি আমার রুমে বসবেন নিয়ে আসো! পরে মুহাম্মদ সামাদকে বই দিচ্ছি আমীরুল ইসলাম নিজেই মোবাইল চেয়ে নিলেন-দাও একটা ছবি তুলে দেই। বলে নিজের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের ছবি তুলে দিলেন।
শিশু সাহিত্যের এক একনিষ্ঠ সাধক আমীরুল ইসলামের অফিস কক্ষে জাতীয় কবিতা পরিষদের পুনরায় নির্বাচিত তৎকালীণ সভাপতি মুহাম্মদ সামাদকে বই দেওয়া ছবিটি আজো স্মৃতির টাইমলাইনে জমা হয়ে আছে।
আমীরুল ইসলামের কক্ষে হরহামেশাই চলে দেশ বিদেশের খ্যাতিমানদের আড্ডা জীবন আর বহতা জীবনের আলোচনা।অ্যাসাইনমেন্টে যাওয়া আসার পথে দেখি আর সুনীলের সেই কবিতার দুই ছত্র মনে মনে আওড়াতে থাকি! এভাবেই ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন, আহমাদ মাযহার, ঋতিক ঘটকদের মত কবি-গুণিজনেরা চ্যানেল আইতে একসাথে আড্ডা দিচ্ছেন তাদের প্রানবন্ততা ছুঁয়ে গেছে আমাকেও।
চ্যানেল আইয়ের নিউজ রুমের ওপারে মাত্র কয়েক গজ দূরেই আমীরুল ইসলামের অফিস কক্ষে সৃজনশীল সাহিত্যের নান্দনিক এক আবহ। নিউজরুমের গণ্ডি ছাড়িয়ে ওই সাহিত্যের বোদ্ধা মানিক জোড়দের আড্ডা আমাকে চম্বুকের মতো টানতো।
সেই তুমুল আড্ডাবাজ প্রাণ ছড়ানো আমীরুল ইসলামের শিশুতোষ গ্রন্থ:
১০০ নীতিগল্প, ১০০ ঈশপের গল্প, বৃষ্টি নিয়ে বিশটি গল্প, মায়ের জন্য রুপকথা, গল্প থাকে আকাশ জুড়ে। এছাড়াও তিনি স্বদেশ স্বাধীনতা নিয়ে তাঁর শিশুতোষ লেখনি রয়েছে৷ যা ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা প্রজন্ম বহতায় ছড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর লেখা -একাত্তরের মিছিল, মুক্তিযুদ্ধের ১০০ ছড়া, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের গল্পসহ অসংখ্য লেখা।
নিউজরুমে যাওয়া আসার পথে একজন প্রাণ খোলা আমীরুল ইসলামের সৃজনী আড্ডায় কান পেতেছি! আনন্দের সাথে আড্ডার আবহ যে একজন লেখকের রোজের জীবনী শক্তি যা সাহিত্যের সাধনার পথে এগিয়ে রাখে। লেখনির উপাত্তের যোগান দেয়। এভাবে জীবন বহতায় পরস্পরের ভাব আড্ডায় বিনিময় হয় লেখকের অনুভবে সৃষ্টির প্রেরণা।
একজন আমীরুল ইসলাম সেই প্রাণ উচ্ছ্বাসে লেখকের অনুভবে স্পন্দের ছোঁয়া দিয়ে গেছেন তাঁর লেখনিই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে। ওপারে ভালো থাকুন। আপনার আত্মা শান্তিতে থাকুক।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









