মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। জীবনের কোনো এক সময়ে জেনে বা না জেনে গুনাহ হয়ে যেতে পারে। তবে ইসলামে গুনাহ করার পর হতাশ হয়ে পড়ার পরিবর্তে আল্লাহর কাছে ফিরে আসার পথ খোলা রাখা হয়েছে। সেই পথ হলো তওবা।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।” —সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫৩।
এই আয়াত মুসলমানকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়ার শিক্ষা দেয়। তবে এর অর্থ গুনাহকে হালকা করে দেখা নয়; বরং ভুলের পর আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।
তওবা কী?
তওবা হলো গুনাহ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে সেই গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার দৃঢ় সংকল্প করা।
সাধারণভাবে আন্তরিক তওবার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
- গুনাহের কাজটি ছেড়ে দেওয়া।
- নিজের ভুলের জন্য আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া।
- ভবিষ্যতে সেই গুনাহে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা।
- কারও অধিকার নষ্ট করলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা যথাসম্ভব সংশোধন করা।
অর্থাৎ শুধু মুখে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলাই যথেষ্ট নয়; গুনাহ থেকে ফিরে আসার আন্তরিক চেষ্টা তওবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন
কোরআনে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।” —সূরা আল-বাকারা, ২:২২২।
এখানে তওবার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে। মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু ভুলের পর নিজেকে সংশোধন করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
গুনাহ যত বড়ই হোক, হতাশ হওয়া যাবে না
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়ার শিক্ষা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সূরা আয-যুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের নিরাশ হতে নিষেধ করেছেন।
তবে তওবার অর্থ এমন নয় যে, ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ করতে থাকব এবং পরে ক্ষমা চেয়ে নেব। বরং তওবার সঙ্গে থাকতে হবে অনুতাপ ও সংশোধনের চেষ্টা।
বারবার ভুল হলে?
কোনো ব্যক্তি তওবা করার পর আবার একই গুনাহে জড়িয়ে পড়লে তার জন্যও আল্লাহর কাছে ফিরে আসার দরজা বন্ধ হয়ে যায় না। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে এমন বান্দার কথা এসেছে, যে গুনাহ করার পর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় এবং আল্লাহ তার ক্ষমা প্রার্থনাকে গ্রহণ করেন।
এ থেকে বোঝা যায়, একজন মানুষকে গুনাহের কারণে হতাশ হয়ে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যাওয়া উচিত নয়। বরং প্রতিবার ভুল হলে আন্তরিকভাবে ফিরে আসতে হবে এবং নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।
মানুষের হক থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ
কোনো গুনাহ যদি অন্য মানুষের অধিকার বা সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়। অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে নেওয়া হলে তা ফেরত দেওয়া, কারও ক্ষতি করলে যথাসম্ভব তা সংশোধন করা এসবও গুরুত্বপূর্ণ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের অধিকার ও জুলুমের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। সহিহ মুসলিমের হাদিসে ‘মুফলিস’ বা নিঃস্ব ব্যক্তির উদাহরণ দিতে এমন ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যে নামাজ, রোজা ও সদকা নিয়ে আসবে, কিন্তু মানুষের ওপর জুলুম বা অধিকার নষ্ট করার কারণে তার নেক আমল অন্যদের দিয়ে দিতে হবে।
তওবার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই
তওবা করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়ের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। গুনাহ বুঝতে পারলে যত দ্রুত সম্ভব আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই উত্তম। কোরআনে মুমিনদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, “হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।” —সূরা আন-নূর, ২৪:৩১।
তাই অতীতের ভুল নিয়ে হতাশ হয়ে না থেকে সংশোধনের পথ বেছে নেওয়াই ইসলামের শিক্ষা।
তওবা শুধু মুখের কথা নয়
আন্তরিক তওবার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো জীবনে পরিবর্তন আনার চেষ্টা। যে কাজ মানুষকে গুনাহের দিকে নিয়ে যায়, তা থেকে দূরে থাকা, ভালো পরিবেশ বেছে নেওয়া, নামাজ-জিকিরে মনোযোগী হওয়া এবং নিজের ভুলগুলো নিয়ে সচেতন থাকা এসব তওবার পরবর্তী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
ইসলামে মানুষের জন্য আশার জায়গাটি এখানেই ভুল হয়ে গেলে ফিরে আসার দরজা আছে। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে আন্তরিক তওবা, সংশোধনের চেষ্টা এবং ভালো কাজে ফিরে আসাই একজন মুমিনের পথ।









