বিশ্বে তাপমাত্রার রেকর্ড সংরক্ষণ শুরুর পর সবচেয়ে উষ্ণ মাস হিসেবে আগস্টকে চিহ্নিত করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস। একই সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে পশ্চিম ইউরোপ পার করেছে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্ম।
বৃহস্পতিবার (৯ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত কোপার্নিকাসের প্রতিবেদনের পর জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে না পারলে বিশ্ব এমন এক জলবায়ু পরিস্থিতির দিকে আরও এগিয়ে যাবে, যার নজির মানব ইতিহাসে আগে দেখা যায়নি।
কোপার্নিকাসের নিয়মিত তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের তথ্য ১৯৪০ সাল থেকে পাওয়া যায়। তবে বরফের স্তর, গাছের বলয় ও প্রবালের কঙ্কালের মতো প্রাকৃতিক নিদর্শন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা আরও দীর্ঘ সময়ের জলবায়ু ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করতে পারেন।
ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের কর্মকর্তা সামান্থা বার্গেস বলেন, ‘যুক্তিসঙ্গতভাবে বলা যায়, অন্তত গত এক লাখ বছরে মানুষ আজকের মতো এত উষ্ণ তাপমাত্রা দেখেনি।’
কোপার্নিকাসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে বিশ্বের গড় বায়ুর তাপমাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর মধ্য দিয়ে ২০২৩ সালের জুলাইয়ের আগের রেকর্ডকে শূন্য দশমিক ০১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে আগস্ট। তবে ব্যবধান খুব কম হওয়ায় সংস্থাটি আগস্ট ও ২০২৩ সালের জুলাইকে যৌথভাবে সবচেয়ে উষ্ণ মাস হিসেবে বিবেচনা করেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর মতো মানব কর্মকাণ্ডের কারণে শিল্পায়ন-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এর ফলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও তীব্র ও ঘন ঘন হচ্ছে।
এর মধ্যেই ২০২৫ সালে বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রাখা গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ নতুন রেকর্ডে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিয়েল বলেন, প্রমাণ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি মানবজাতির আসক্তির ক্রমবর্ধমান মাশুলই বিশ্বকে দিতে হচ্ছে।
আগস্টে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও যৌথভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর ফলে টানা তিন মাস ধরে বিশ্বের মহাসাগরগুলোতে রেকর্ড উষ্ণতা বজায় থাকল।
গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে আটকে পড়া অতিরিক্ত তাপের ৯০ শতাংশের বেশি সমুদ্র শোষণ করেছে। এতে স্থলভাগে উষ্ণতা বৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমলেও সামুদ্রিক প্রাণী, প্রবালপ্রাচীর ও উপকূলীয় এলাকার ওপর এর গুরুতর প্রভাব পড়ছে।
আটলান্টিক মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে সমুদ্রের তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড করেছে। একই প্রবণতা দেখা গেছে ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরেও। সেখানে এল নিনোর প্রভাব দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে।
এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলেও পড়ে এবং পেরুতে বন্যা, আফ্রিকায় খরা ও অস্ট্রেলিয়ায় দাবানলের মতো চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, আগামী কয়েক মাসে তাপমাত্রার আরও রেকর্ড হতে পারে। এল নিনো বছরের শেষ দিকে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছাতে পারে। এর প্রভাবে ২০২৬ বা ২০২৭ সাল রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হয়ে উঠতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তারা।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ুবিজ্ঞানী ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতিটি এল নিনো আগেরটির চেয়ে বেশি উষ্ণ হচ্ছে। কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানো বন্ধ না করা পর্যন্ত এ ধরনের রেকর্ড ভাঙা মাস আসতেই থাকবে।
কোপার্নিকাস জানিয়েছে, আগস্টের মধ্য দিয়ে পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্মও শেষ হয়েছে। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত এই গ্রীষ্ম ২০০৩ সালের দীর্ঘদিনের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
এ সময়ে একের পর এক তীব্র তাপপ্রবাহে ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায় স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে। কোথাও নদী শুকিয়ে গেছে, আবার কোথাও দাবানলের ঝুঁকি বেড়েছে। ইউরোপীয় পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম ইউরোমোমোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইউরোপে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ৩২ হাজার ছাড়িয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, জুনে আঘাত হানা তীব্র তাপপ্রবাহটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ছাড়া ঘটার সম্ভাবনা ছিল ‘প্রায় অসম্ভব’।
শুধু ইউরোপ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলেও এবার নজিরবিহীন তাপমাত্রা দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জানিয়েছে, ১৩২ বছরের রেকর্ডে এবার যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্ম গেছে।
কোপার্নিকাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে এএফপি জানিয়েছে, বিশ্বের প্রায় ৯০ কোটি মানুষ এমন এক জুলাই পার করেছেন, যা তাদের নিজ নিজ অঞ্চলের রেকর্ডে সবচেয়ে উষ্ণ জুলাই ছিল।
সামান্থা বার্গেস বলেন, ‘আমরা একটি ব্যতিক্রমী গ্রীষ্ম পার করেছি।’ শুধু ইউরোপে নয়, বিশ্বের অন্যান্য অংশেও প্রায় এক শতাব্দী ধরে টিকে থাকা রেকর্ড ভেঙে গেছে।
তার মতে, বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো না গেলে জলবায়ু পরিস্থিতি আরও চরম হয়ে উঠতে থাকবে।









