আদালতের নির্দেশ ও বহিষ্কার সংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘন করে বাংলাদেশে পাঠানো এক বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিম নারীকে ২ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের গৌহাটি হাইকোর্ট। মুমতাজ বেগমকে বাংলাদেশ থেকে খুঁজে বের করে ভারতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতেও আদালত ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা ও বিচারপতি সুস্মিতা ফুকান খাউন্দের বেঞ্চ এ নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশ অমান্য করে কাউকে বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনায় কোনো রাজ্য সরকারের ওপর ক্ষতিপূরণের দায় চাপানোর নজির এটিই প্রথম বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম স্ক্রল।
গত ৩০ মে নাগাঁও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার পর মুমতাজকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে তার পরিবারের সদস্যরা গৌহাটি হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস আবেদন করেন।
মুমতাজের নাগরিকত্ব নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত ১৯৯৭ সালে। ওই বছর আসামের ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় তাকে ‘ডি’ বা সন্দেহভাজন ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে সীমান্ত পুলিশ তাকে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে পাঠায়।
২০১৭ সালে নাগাঁওয়ের ট্রাইব্যুনাল তাকে ভারতীয় নাগরিক নন বলে রায় দেয়। ট্রাইব্যুনালের দাবি ছিল, মুমতাজ তার বাবার মেয়ে—এটি তিনি প্রমাণ করতে পারেননি। ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে গেলে ২০১৯ সালে আদালত দেখতে পায়, নাগরিকত্বের পক্ষে জমা দেওয়া নথি ট্রাইব্যুনাল যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি। এরপর মামলাটি পুনর্বিবেচনার জন্য ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।
কিন্তু ৩০ মে মুমতাজ আবার ট্রাইব্যুনালে হাজির হলে তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়। তার আইনজীবীদের অভিযোগ, আদেশের কোনো কপি তাকে দেওয়া হয়নি। ফলে এর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও তিনি পাননি।
শুনানিতে পরিবারের সদস্যরা জানান, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার প্রায় আধা ঘণ্টা পর জুরিয়া থানার পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ দাবি অস্বীকার করেন। নাগাঁওয়ের পুলিশ সুপার জানান, দুপুর ২টার দিকে ট্রাইব্যুনাল চত্বরের কাছ থেকে সীমান্ত পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
আদালত বলেন, মুমতাজকে বিদেশি ঘোষণা করার বিষয়টি মৌখিকভাবে জানানো হলেও তিনি ওই সময় ট্রাইব্যুনাল চত্বরে থাকতেন না। হাইকোর্টের মতে, ট্রাইব্যুনালের বিচারক ইচ্ছাকৃতভাবে আদেশ জারি করতে দেরি করেছিলেন, যাতে তাকে গ্রেপ্তার করে মাতিয়া ডিটেনশন সেন্টারে নেওয়া এবং পরে ভারত থেকে বের করে দেওয়া যায়। আদালত এতে ‘আইনের অপব্যবহারের উদ্দেশ্য’ দেখতে পেয়েছে।
হাইকোর্ট আরও বলেন, সরকারি সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে মুমতাজকে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে। পরিবারের কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকে না জানিয়েই তাকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়।
আদালতের মতে, কোনো ব্যক্তিকে বিদেশি ঘোষণা করার পর আইনি প্রতিকারের সব সুযোগ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বহিষ্কার করা যায় না। মুমতাজের ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি, যা ১৯৫০ সালের বহিষ্কার সংক্রান্ত আইনের লঙ্ঘন। সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে আদালত বলেন, আইনের কর্তৃত্ব ছাড়া কোনো ব্যক্তির জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যায় না; এ সুরক্ষা বিদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
এ ঘটনায় মুমতাজকে অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২ লাখ রুপি দিতে আসাম সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল কাউকে বিদেশি ঘোষণা করলে গ্রেপ্তারের আগে তাকে রায়ের বিষয়টি জানাতে পুলিশ সুপারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলার বাইরে নেওয়ার আগে পরিবারের কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকেও জানাতে হবে।
আসামে ‘ঘোষিত বিদেশিদের’ বিরুদ্ধে গত বছরের মে মাসে অভিযান শুরু করে বিজেপি সরকার। ওই অভিযানে বিভিন্ন এলাকা থেকে এমন ব্যক্তিদের আটক করে বাংলাদেশে পাঠানোর অভিযোগ ওঠে। দীর্ঘদিন আসামে বসবাস করেও নথিপত্রে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে না পারা ব্যক্তিদের সাধারণত ‘ঘোষিত বিদেশি’ বলা হয়।









