নাচ, দৌড় ও বক্সিংয়ে রোবটের প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার দুই দিনের মধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে জোরালো বার্তা দিয়েছে চীন। দেশটির পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) মুখপত্র পিএলএ ডেইলি গবেষকদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দ্রুত গবেষণাগার থেকে সামরিক প্রশিক্ষণক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী রোবট তৈরিতে।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা শতাধিক চীনা সামরিক ক্রয় বিজ্ঞপ্তি, গবেষণাপত্র, পেটেন্ট, সরকারি নথি, সামরিক প্রকাশনা এবং প্রতিরক্ষা কোম্পানির তথ্যেও দেশটির সামরিক বাহিনীর হিউম্যানয়েড রোবট নিয়ে গবেষণার অগ্রগতির চিত্র পাওয়া গেছে।
এসব নথিতে দেখা যায়, চীনের সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো যুদ্ধক্ষেত্রের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে হিউম্যানয়েড রোবটের সক্ষমতা পরীক্ষা করছে। একই সঙ্গে রোবট সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ এবং সেনাদের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব যন্ত্র কীভাবে কাজ করতে পারে, তা নিয়েও গবেষণা চলছে।
২০২৫ ও ২০২৬ সালে এই গবেষণায় গতি বেড়েছে। রোবটের চারপাশের পরিবেশ শনাক্ত করা, বিভিন্ন বস্তু ধরা ও সরানো এবং প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য তৈরির সক্ষমতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিওএফএ গ্লোবাল রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহের প্রায় ৯৫ শতাংশই করেছে চীনা নির্মাতারা। ফলে দ্রুত বাড়তে থাকা দেশটির বেসরকারি রোবট শিল্প থেকে সামরিক বাহিনী প্রযুক্তিগত সুবিধা পাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
শহুরে যুদ্ধে রোবট ব্যবহারের মডেল
চীনের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ডিফেন্স টেকনোলজির (এনইউডিটি) শিয়ানের একটি পরীক্ষাকেন্দ্রের গবেষকেরা ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে শহুরে যুদ্ধের একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
সেখানে ছয়টি কমব্যাট রোবটকে দুটি আক্রমণকারী দলে ভাগ করার মডেল দেখানো হয়। এসব রোবটের মধ্যে হিউম্যানয়েড রোবট, রোবট কুকুর ও চালকবিহীন যান থাকতে পারে। সেনাদের সঙ্গে সমন্বয় করে রোবটগুলো শত্রু নিয়ন্ত্রিত ভবনে ঢুকে তলা ও কক্ষ ধরে অভিযান পরিচালনা করবে বলে মডেলটিতে দেখানো হয়।
গবেষণায় এমন প্রযুক্তি বিবেচনা করা হয়েছিল, যা গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে। তবে রোবট কী ধরনের অস্ত্র বহন করবে, কখন গুলি চালানোর অনুমতি পাবে কিংবা বেসামরিক মানুষের মুখোমুখি হলে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, তা এতে বলা হয়নি।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের বিকল্প
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের অধ্যাপক ডেনিস হং বলেন, মানুষকে যেখানে পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে রোবট পাঠানোই এ প্রযুক্তি তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
তার মতে, কোনো রোবট ধ্বংস হয়ে গেলে যদি একটি মানুষের জীবন বাঁচানো যায়, তাহলে সেই রোবটকে যুদ্ধক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ব্যয়যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে হিউম্যানয়েড রোবটের বর্তমান সক্ষমতায় বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নিয়ন্ত্রিত প্রদর্শনীর বাইরে এগুলো এখনও বেশি শক্তি ব্যবহার করে এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য নয়। কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যারন জনসনের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রের অনিশ্চিত ও দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি রোবটের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
সব কাজে হিউম্যানয়েড রোবট নয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, নজরদারি বা রসদ পরিবহনের মতো কাজে চার পা, চাকা বা ট্র্যাকযুক্ত রোবট তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী এবং সহজে বড় পরিসরে মোতায়েন করা সম্ভব।
তবে ভবনের ভেতর, টানেল কিংবা জাহাজের সংকীর্ণ জায়গায় হিউম্যানয়েড রোবটের সুবিধা থাকতে পারে। তাইওয়ানের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি রিসার্চের গবেষক জুও-মিন চৌ বলেন, দুই হাত ও দুই পায়ের কারণে এসব রোবট তাত্ত্বিকভাবে একই সঙ্গে চলাচল, ওঠানামা এবং বিভিন্ন বস্তু ধরার কাজ করতে পারে।
সহায়ক ভূমিকা থেকে সরাসরি যুদ্ধে
চীনের সামরিক বিশ্লেষণেও হিউম্যানয়েড রোবটের সম্ভাব্য ভূমিকা ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে পিএলএ ডেইলিতে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়, ভবিষ্যতে এসব রোবটের ভূমিকা যুদ্ধের সহায়ক হিসেবে কাজ করার পর্যায় থেকে প্রধান যোদ্ধার পর্যায়েও যেতে পারে।
নিবন্ধটিতে কোনো জীবিত লক্ষ্যবস্তু মানুষ শনাক্ত ও যাচাই করার পর রোবটকে গুলি চালানোর অনুমতি দেওয়ার বিষয়টিও আলোচিত হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে চীনের ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ভিডিও প্রকাশ করে। সেখানে হিউম্যানয়েড ও চার পায়ের রোবটসহ বিভিন্ন সামরিক রোবটকে ভবিষ্যতের একটি কাল্পনিক সংঘাতে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরাস্ত করতে দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রও করছে সামরিক পরীক্ষা
হিউম্যানয়েড রোবটের সামরিক ব্যবহার নিয়ে শুধু চীন নয়, যুক্তরাষ্ট্রও কাজ করছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী সামরিক কাজে ব্যবহারের উপযোগী হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির জন্য একটি প্রতিযোগিতা শুরু করে।
ভবিষ্যতে এসব রোবট সেনাদের সঙ্গে কাজ করতে পারবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে। সম্ভাব্য কাজের মধ্যে নজরদারি, নিরাপত্তা, বাধা অপসারণ, বিপজ্জনক রাসায়নিক বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থ নিয়ে কাজ এবং শহুরে এলাকায় আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক অভিযান রয়েছে।
প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ১০টি দলকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরবর্তী চুক্তির জন্য সর্বোচ্চ ১২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত অর্থ বরাদ্দের সুযোগও রাখা হয়।
তবে দুই পা ও চার পায়ের রোবট তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পখাত চীনের তুলনায় এখনও পিছিয়ে রয়েছে। রয়টার্সের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ হিউম্যানয়েড ও চার পায়ের রোবট নির্মাতা চীনের ইউনিট্রির বাণিজ্যিক রোবট কুকুরের কিছু নকশা মার্কিন সামরিক বাহিনীর অর্থায়নে পরিচালিত উদ্ভাবনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল।
২০২৪ সাল থেকে বাড়ছে সামরিক আগ্রহ
হিউম্যানয়েড রোবটের সামরিক ব্যবহার নিয়ে চীনের আগ্রহ ২০২৪ সাল থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে শুরু করে। ওই বছর এনইউডিটি ও চীনের একাডেমি অব মিলিটারি সায়েন্সেসের আয়োজনে একটি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ফোরামে হিউম্যানয়েড সিস্টেমের সামরিক ব্যবহার নিয়ে আলাদা অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
সম্প্রতি চীনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমসে দৌড়, বক্সিং ও নাচে অংশ নেওয়া রোবটগুলো মূলত প্রযুক্তির সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। কিন্তু একই প্রযুক্তি নিয়ে চীনের সামরিক গবেষণা বলছে, ভবিষ্যতে এসব রোবটের ব্যবহার বিনোদনের গণ্ডি ছাড়িয়ে যুদ্ধক্ষেত্রেও যেতে পারে।
তবে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে হিউম্যানয়েড রোবটকে এখনও শক্তি ব্যবহার, নির্ভরযোগ্যতা, পরিবেশ বুঝতে পারা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বেশ কিছু প্রযুক্তিগত ও ব্যবহারিক বাধা পেরোতে হবে।









