বিশ্বের মানচিত্রে আফ্রিকা মহাদেশকে বাস্তবের তুলনায় অনেক ছোট দেখানো হয়। চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসা মারকেটর প্রজেকশনের কারণে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার মতো নিরক্ষীয় অঞ্চলের দেশগুলো মানচিত্রে তুলনামূলক ছোট দেখায়।
বিপরীতে ইউরোপ, রাশিয়া ও উত্তর আমেরিকার আকার অতিরঞ্জিত হয়ে দেখা যায়।
এই দীর্ঘদিনের বিকৃতি দূর করতে এবার নতুন ধরনের বিশ্ব মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দিয়েছে জাতিসংঘ।
শুক্রবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ) ১৬৪-১ ভোটে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। এতে প্রচলিত মারকেটর প্রজেকশনের বিকল্প হিসেবে ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এই মানচিত্রে বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশের আয়তন বাস্তব অনুপাতের কাছাকাছি দেখানো হয়।
প্রস্তাবটির নেতৃত্ব দিয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার ছোট দেশ টোগো। আফ্রিকান গ্রুপের পক্ষ থেকে উত্থাপিত এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছে আফ্রিকান ইউনিয়ন। জাতিসংঘের আফ্রিকান গ্রুপে আফ্রিকান ইউনিয়নের ৫৪টি সদস্য দেশ রয়েছে এবং এটি সংস্থাটির সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক ভোট ও সংলাপ জোট।
মানচিত্রে আফ্রিকা এত ছোট কেন?
মারকেটর প্রজেকশন তৈরি করেছিলেন মানচিত্রবিদ ও ভূগোলবিদ জেরার্ডাস মারকেটর। ১৫৬৯ সালে প্রকাশিত তার বিশ্ব মানচিত্রে দিক ও কোণের নির্ভুলতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৬ শতকে সমুদ্রপথে ইউরোপীয় নাবিকদের জন্য এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা।
তবে এর বড় সমস্যা হলো, বিষুবরেখা থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, মানচিত্রে স্থলভাগের আকার তত বেশি ফুলে ওঠে।
ফলে মারকেটর মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে প্রায় আফ্রিকার সমান বড় দেখায়। বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়। একইভাবে ইউরোপ ও রাশিয়ার পাশাপাশি উত্তর আমেরিকাও মানচিত্রে বাস্তবের তুলনায় বড় দেখায়। অন্যদিকে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার আয়তন তুলনামূলক ছোট হয়ে যায়।
নতুন মানচিত্রে কী বদলাবে?
ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশনের লক্ষ্য হলো মহাদেশগুলোর প্রকৃত আয়তনের অনুপাত বজায় রাখা। এতে কোন দেশ বা মহাদেশ বাস্তবে কত বড়, তা তুলনা করা সহজ হবে। তবে এর বিনিময়ে মহাদেশগুলোর আকৃতি কিছুটা বাঁকানো বা বিকৃত দেখাবে। কারণ পৃথিবী গোলাকার হওয়ায় কোনো ধরনের মানচিত্রেই একই সঙ্গে আয়তন, আকৃতি, দূরত্ব ও দিক পুরোপুরি নির্ভুল রাখা সম্ভব নয়।

ইকুয়াল আর্থ মূলত আয়তনের নির্ভুলতাকে অগ্রাধিকার দেয়। বিপরীতে মারকেটর প্রজেকশন দিক ও কোণ ঠিক রাখাকে গুরুত্ব দিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা
প্রস্তাবের পক্ষে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ভোট দিলেও যুক্তরাষ্ট্র এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। সার্বিয়া, এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, লিথুয়ানিয়া, মলদোভা ও ইউক্রেন ভোটদানে বিরত ছিল। ভোটের আগে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসেভিচ প্রস্তাবটিকে চরমপন্থী আদর্শিক প্রকল্প হিসেবে আখ্যা দেন।
তিনি বলেন, বাস্তব সমস্যাগুলোতে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে জাতিসংঘ ১৬ শতকের মানচিত্র নিয়ে আলোচনা করছে।
তবে জাতিসংঘের প্রস্তাবটি বাধ্যতামূলক নয়। এতে মারকেটর প্রজেকশন নিষিদ্ধ করা হয়নি এবং কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্রকে বাধ্যতামূলক বিকল্প হিসেবেও নির্ধারণ করা হয়নি। বরং ইকুয়াল আর্থসহ আয়তনভিত্তিক মানচিত্রের ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
আফ্রিকার বাস্তবতা তুলে ধরার উদ্যোগ
টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডুসি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বলেন, মানচিত্র শুধু ভৌগোলিক তথ্য প্রকাশ করে না, এটি শিক্ষা, কল্পনা ও বিশ্ব সম্পর্কে মানুষের সম্মিলিত ধারণাকেও প্রভাবিত করে। তার মতে, নতুন প্রস্তাবটি আফ্রিকার বাস্তব আয়তন ও অবস্থানকে আরও সঠিকভাবে তুলে ধরবে।
আফ্রিকান ইউনিয়ন চলতি বছরের মার্চেই ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন গ্রহণ করেছে। টোগো আগামী বছরের শুরুতে রাজধানী লোমেতে ইউনেস্কো, আফ্রিকান ইউনিয়ন এবং গুগলের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণে একটি বৈঠকের পরিকল্পনা করছে। সেখানে বাস্তবে নতুন মানচিত্র ব্যবহারের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
কেন কোনো সমতল মানচিত্রই পুরোপুরি নির্ভুল নয়?
পৃথিবী গোলাকার। তাই গোল পৃথিবীকে সমতল কাগজ বা পর্দায় তুলে ধরতে গেলে কোনো না কোনো বিষয় বিকৃত হবেই। কোনো মানচিত্রে আকৃতি, কোনোটিতে আয়তন আবার কোনোটিতে দূরত্ব বা দিকের নির্ভুলতা কিছুটা কমে যায়।
মারকেটর প্রজেকশন ১৬ শতকের সমুদ্রযাত্রার প্রয়োজন মেটাতে দিক ও কোণকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। প্রায় ৫০০ বছর পর ইকুয়াল আর্থ সেই অগ্রাধিকার বদলে দিয়ে মহাদেশগুলোর প্রকৃত আয়তনকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
ফলে নতুন মানচিত্রে বিশ্বকে দেখলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি চোখে পড়বে আফ্রিকাকে ঘিরেই। যে মহাদেশকে প্রচলিত মানচিত্রে তুলনামূলক ছোট মনে হয়, বাস্তবে সেটি ইউরোপ, ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো একাধিক বড় দেশের সম্মিলিত আয়তনের তুলনায় কতটা বিশাল, তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।









