নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের পর ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে দেশটি। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, এটি কোনো দয়া বা অনুদানের বিষয় নয়, বরং আইনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়।
গত বুধবার ২৬ আগস্ট ভুটেকোশি নদীর অববাহিকায় উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ ধসে ভয়াবহ পানির ঢল নামে। বরফশীতল পানি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোতে নেপালের অন্তত তিনটি জেলার বিভিন্ন এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বুধবার ২ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি’র তথ্য সূত্রে, নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য তুলনামূলকভাবে খুব সামান্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করলেও এর ভয়াবহ প্রভাব বহন করতে হচ্ছে। দ্রুত হিমবাহ গলে যাওয়া এবং পাহাড়ি এলাকায় ভয়াবহ দুর্যোগের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করছে কাঠমান্ডু।

কান্তিপুর টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খানাল বলেন, নেপাল এখন দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তার ক্ষেত্রে ‘এইড’ বা সাহায্যের বদলে ‘ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ’-এর দাবি তুলছে।
তিনি বলেন, এটি দয়ার বিষয় নয়। এটি আইনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়।
খানালের ভাষ্য অনুযায়ী, চীন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশ, যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় এবং ভারত তৃতীয়। তাই এসব দেশের ঐতিহাসিক দায় রয়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরবে কাঠমান্ডু। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণের দাবিও জানানো হবে।
তিনি বলেন, এটি সভ্যতার টিকে থাকার প্রশ্ন। হিমালয়ের হিমবাহগুলো যদি বিলীন হয়ে যায়, তাহলে গঙ্গা ও ত্রিশূলীর মতো নদীর ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণ এশিয়ার ২০০ কোটির বেশি মানুষের পানির নিরাপত্তা স্থায়ীভাবে হুমকির মুখে পড়বে।

এদিকে নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবিতে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে বলে জানিয়েছেন খানাল।
ভয়াবহ বন্যার পর নেপাল ‘ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ’-এর বোর্ডের কাছেও আনুষ্ঠানিকভাবে জরুরি আর্থিক সহায়তা চেয়েছে।
নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে এবং বন ও কৃষিমন্ত্রী গীতা চৌধুরীর যৌথ স্বাক্ষর করা চিঠিতে বলা হয়েছে, বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং ঘরবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ মাত্রা এখনও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এর ব্যাপকতা এতটাই বেশি যে তা মোকাবিলায় নেপালের তাৎক্ষণিক সক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
২০২২ সালে কপ-২৭ সম্মেলনে ‘ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে কপ-২৮ সম্মেলনে এটি কার্যকর করা হয়।
জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই ‘জলবায়ু ন্যায্যতা’র ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। নয়াদিল্লির যুক্তি, দেশের মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণ তুলনামূলকভাবে কম। তাই কোনো দেশের জলবায়ু সংক্রান্ত দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক নিঃসরণ, উন্নয়নের প্রয়োজন এবং সক্ষমতার পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
ভারত জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে সমর্থন করে। একই সঙ্গে দেশটি বলে আসছে, শিল্পায়নে ঐতিহাসিকভাবে এগিয়ে থাকা পশ্চিমা দেশগুলো বৈশ্বিক কার্বন বাজেটের বড় অংশ ব্যবহার করেছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোর প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা উচিত।









