চীনের হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ‘গোপন তথ্য’ সংগ্রহ এবং দেশটির সরকারের নিবন্ধনবিহীন এজেন্ট হিসেবে কাজ করার দায়ে মার্কিন সাংবাদিক থমাস পকেন দ্বিতীয়কে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার ১ সেপ্টেম্বর ভার্জিনিয়ার আলেকজান্দ্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত এই সাজা দেন। ৫০ বছর বয়সী পকেনকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনের একটি হোটেল থেকে এফবিআই গ্রেপ্তার করে।
আদালতের নথি ও প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, পকেন ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তাকে চীনে থাকা এক নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ওই নারীকে পকেন চীনা গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট বলে বিশ্বাস করতেন।
পকেন চীনে বসবাস করতেন এবং দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন সংবাদ সংস্থায় সম্পাদক ও ভাষ্যকার হিসেবে কাজ করেছেন। গত জুনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চীনের নিবন্ধনবিহীন এজেন্ট হিসেবে কাজ করার অভিযোগ স্বীকার করেন।
মামলার প্রসিকিউটর এলি রস আদালতে বলেন, সাত বছর ধরে চীনা সরকারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে পকেন ১ লাখ ডলার পেয়েছেন। তার চীনা নিয়ন্ত্রক তাকে এক পর্যায়ে মিথ্যা শনাক্তকরণ পরীক্ষাও করিয়েছিলেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, পকেনের তৈরি প্রতিবেদন চীনের শীর্ষ নেতৃত্ব এমনকি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কাছেও পৌঁছানো হতো বলে তাকে জানানো হয়েছিল।
রস আরও বলেন, চীনা গোয়েন্দার সঙ্গে চুক্তির অংশ হিসেবে পকেন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে তার যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। গ্রেপ্তারের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের যে কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি দেখা করেছিলেন, তাকেও ওই চীনা নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন পকেন।
প্রসিকিউটর বলেন, পকেন অর্থের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসব সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। এফবিআই এক পর্যায়ে তাকে দ্বৈত এজেন্ট হিসেবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি। এফবিআইয়ের সঙ্গে নিজের চীনা যোগাযোগের বিষয়ে কথা বলার পরও সংস্থাটির দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করেননি তিনি এবং চীনা নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন।
তবে প্রসিকিউশন ও পকেনের আইনজীবী চার্লস বার্নহ্যাম উভয়েই স্বীকার করেছেন, পকেন চীনের কাছে কোনো শ্রেণিবদ্ধ বা গোপন সরকারি নথি সরবরাহ করেননি।
আদালতে পকেন বলেন, আমি অনেক গোপন তথ্য জেনেছিলাম এবং চীনাদের এসব তথ্য জানিয়েছিলাম। নিজের কর্মকাণ্ডকে ‘ভুল’ ও ‘ভয়াবহ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক উন্নত করার আন্তরিক ইচ্ছা থেকেই তিনি এসব করেছিলেন।
পকেন বলেন, আমি ভেবেছিলাম আমি সাহায্য করছি। এখন বুঝতে পারছি, এর ফলে যুদ্ধসহ আরও বড় ক্ষতি হতে পারত।
বিচারক লিওনি ব্রিংকেমা পকেনের অপরাধকে ‘অত্যন্ত গুরুতর’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পকেন নিজে শ্রেণিবদ্ধ তথ্য সরবরাহ না করলেও তার চীনা নিয়ন্ত্রক এমন তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তা তিনি জানতেন। এরপরও তিনি ওই নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তার যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
পকেনকে ৩৩ মাসের কারাদণ্ড দেওয়ার আবেদন করেছিল প্রসিকিউশন। অন্যদিকে তার আইনজীবী প্রবেশন অথবা হাফওয়ে হাউসে সাজা কাটানোর আবেদন করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত আদালত তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন।
পকেন যে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাকে চীনা গোয়েন্দার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, আদালতের নথিতে তাকে শুধু ‘পারসন ওয়ান’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। এফবিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই ব্যক্তি প্রশাসনে আরও উচ্চপদে যাওয়ার আশা করছিলেন। বিচারক বলেন, ঘটনাটি ওই ব্যক্তির ক্যারিয়ারে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তিনি নিজেও ওই ব্যক্তির পরিচয় জানেন না বলে আদালতে জানান।
পকেনের বন্ধুদের ভাষ্য, চীনে তিনি আর্থিকভাবে খুব কষ্টে ছিলেন এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও সমস্যায় ভুগছিলেন। চীনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইচ্যাটে তিনি ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা এমএজিএমুখী একটি গ্রুপ পরিচালনা করতেন। প্রবাসী মার্কিনিদের মধ্যে তিনি ট্রাম্পপন্থী বিরল কণ্ঠ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিলেন।
পকেন টেক্সাসের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় একটি পরিবারের সদস্য। তার বাবা থমাস পকেন সিনিয়র ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনীর সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ছিলেন। পরে তিনি রোনাল্ড রিগ্যান প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত টেক্সাস রিপাবলিকান পার্টির চেয়ারম্যান ছিলেন।
মঙ্গলবার ছেলের সাজা ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন ৮২ বছর বয়সী পকেন সিনিয়র। তবে তিনি আদালতে কোনো বক্তব্য দেননি।









