ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ আয়োজিত নিয়মিত পাঠচক্র ‘বীক্ষণ’-এর ২২১৬তম আসরে ভিন্নস্বরের কবিতা ও কবিতাভাবনা নিয়ে প্রাণবন্ত আড্ডা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আসা তিন ভিন্নস্বরের কবি শাফিনূর শাফিন, জুয়েইরিযাহ মউ ও রিমঝিম আহমেদ এ আয়োজনে নিজেদের কবিতাভাবনা, জীবনবোধ ও কবিতায় উঠে আসা নানা অনুষঙ্গ নিয়ে কথা বলেন।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১১টায় ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে জয়নুল আবেদিন উদ্যানে বসে বীক্ষণের এ আসর। ‘ভিন্নস্বরের কবিতা ও কবিতা ভাবনা’ শীর্ষক আয়োজনটি একপর্যায়ে কবিতা, জীবন ও সৃষ্টির নানা প্রসঙ্গ নিয়ে দারুণ এক আড্ডায় পরিণত হয়।
আলোচনার শুরুতে নিজের কবিতাভাবনা নিয়ে কথা বলেন কবি শাফিনূর শাফিন। চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তার কবিতায় কীভাবে প্রভাব ফেলেছে, তা তুলে ধরেন তিনি।
শাফিনূর শাফিন বলেন, “চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় আমার বেড়ে ওঠা। এখানে সব ধর্ম-গোত্রের মানুষের বসবাস। বাংলাদেশে আর কোথাও একসঙ্গে এত বৈচিত্র্য আছে কি না, আমার জানা নেই। হিন্দু-মুসলিম থেকে শুরু করে বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং আদিবাসী বিভিন্ন গোত্রের মানুষকে পাথরঘাটায় একসঙ্গে বাস করতে দেখেছি। যার কারণে সেই প্রভাবটা আমার যাপনে দারুণভাবে পড়েছে। আর তাই অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি এসব বিষয়ও আমার কবিতায় হয়তো পাওয়া যাবে।”
কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জুয়েইরিযাহ মউ তার কবিতায় শহর, নারী ও যৌথ পরিবারের অভিজ্ঞতার উপস্থিতির কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। সঙ্গত কারণেই শহরের ইমেজ আমার কবিতায় পাওয়া যাবে। সেই সঙ্গে আমার বাড়ি সিলেটে, একান্নবর্তী পরিবার। যে কোনো উৎসবে আমরা সিলেটের সেই একান্নবর্তী পরিবারে ফিরে যাই। তাই গভীরভাবে আমার কবিতায় যৌথ পরিবারের ইমেজও আছে। ভিন্নস্বরের কথা বলতে গেলে, আমি যে একজন নারী, ফলে কবিতায় নারীর একান্ত অনুভূতির কথাও পাওয়া যাবে।”
নিজের কবিতাকে এক দূরবর্তী আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তুলনা করেন কবি রিমঝিম আহমেদ। তার ভাষায়, “আমার কাছে কবিতা হচ্ছে সেই দূরের দ্বীপ, যেখানে আমি যেতে চাই, কিন্তু যেতে পারি না। সেই দ্বীপটা সরে সরে যায়।”
তিন কবির বক্তব্যে উঠে আসে তাদের নিজস্ব জীবন-অভিজ্ঞতা, বেড়ে ওঠার পরিবেশ, সমাজ ও মানুষের বৈচিত্র্য এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির নানা স্তর। তাদের কবিতার স্বাতন্ত্র্য ও ভিন্নস্বর নিয়েও আড্ডায় আলোচনা হয়।
বীক্ষণের এ বিশেষ আয়োজনে তিন কবিকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহে এসে অংশ নেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান বীক্ষণ ও ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের সভাপতি কবি আশরাফ মীর এবং সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা তারেক। একই সঙ্গে তারা তিন কবির কবিতায় স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর ও নিজস্ব কবিতাভাবনার প্রশংসা করেন।
ব্রহ্মপুত্রপাড়ের এ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ জং-এর সম্পাদক কবি সরকার আজিজ, কবি ও সাংবাদিক রওশন ঝুনু, কবি এহসান হাবীব, মুস্তাকিম বিল্লাহ মনি, সাঈদ ইসলাম, কবি অনিন্দ্য জসিম, আবুল কালাম আজাদসহ বীক্ষণ ও ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের সদস্যরা। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন কবি ফেরদৌসুল মনিরা লাবনী।
ময়মনসিংহের শিল্প-সাহিত্যচর্চায় দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের পাঠচক্র ‘বীক্ষণ’। ১৯৮৩ সালে যাত্রা শুরু করা এ পাঠচক্র নিয়মিতভাবে প্রতি শুক্রবার ব্রহ্মপুত্রপাড়ে বসে আসছে। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি দেশ-বিদেশের সমকালীন ও ঐতিহাসিক নানা বিষয়, রাজনীতি, সংকট, যুদ্ধ ও সমাজবাস্তবতা নিয়েও এখানে আলোচনা হয়ে থাকে।
৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এ ধারাবাহিকতার ২২১৬তম আসরেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে এবার আলোচনার কেন্দ্রজুড়ে ছিল তিন কবির তিন রকম কণ্ঠ- আর সেই ভিন্নস্বরেই ব্রহ্মপুত্রপাড়ের শুক্রবারের সকালটি হয়ে উঠেছিল কবিতাময়।









