ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান ও গাজায় ইসরায়েল যুদ্ধের সমালোচনা করায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তাদের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে বলে রায় দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ক্যালিফোর্নিয়ার জেলা আদালতের বিচারক নোয়েল ওয়াইজ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের (ডিএইচএস) কঠোর সমালোচনা করে এ রায় দেন। এসব সংস্থা সুরক্ষিত মতপ্রকাশের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বিদেশি নাগরিকদের বিতাড়নের উদ্যোগ নিয়েছিল।
৯০ পৃষ্ঠার রায়ে বিচারক ওয়াইজ বলেন, সহজভাবে বললে, যুক্তরাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা জনগণের অধিকার। এটি কেড়ে নেওয়ার অধিকার সরকারের নেই।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নিয়োগ দেওয়া বিচারক ওয়াইজ আরও বলেন, সরকারের কর্মকাণ্ড ও নেতাদের সমালোচনা করে কথা বলতে পারা একটি দেশের গণতন্ত্রের সুস্থতার প্রমাণ।
তিনি বলেন, নাগরিক ও অ-নাগরিক সবাইকে নিজেদের কথা বলার ক্ষেত্রে আত্মসংযম করতে এবং সরকারের প্রতিশোধের ভয়ে নিজেদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সেই গণতান্ত্রিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
যেভাবে শুরু শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
মামলাটির কেন্দ্রে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে ফিলিস্তিনপন্থী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিল ও আটকের ঘটনা।
২০২৫ সালের মার্চে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহমুদ খলিলকে আটকের মধ্য দিয়ে এ ধরনের অভিযান শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি সে সময় ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল। স্থায়ী মার্কিন বাসিন্দা ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী খলিল আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একজন গুরুত্বপূর্ণ আলোচক হিসেবে সামনে আসেন।
খলিল নিজেও আলাদা একটি মামলায় তার বিতাড়নের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করছেন। শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি আদালতের রায়কে স্বাগত জানান।
তিনি লেখেন, ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলতে কারও ভয় পাওয়া উচিত নয়।
খলিলের মতো শিক্ষার্থীদের আটকের ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করেই পররাষ্ট্র দপ্তরের তৎকালীন মন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়।
২০২৫ সালের আগস্টে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন ছাত্র সংবাদপত্র ‘দ্য স্ট্যানফোর্ড ডেইলি’ আদালতে অভিযোগ করে, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের কয়েকজন অ-নাগরিক লেখক ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ নিয়ে প্রতিবেদন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
মামলায় আরও দুজন বেনামি বাদী যুক্ত হন। তারা কোনো অপরাধের রেকর্ড না থাকা বিদেশি নাগরিক। তারা জানান, শিক্ষার্থী ভিসা হারানোর আশঙ্কায় তারাও নিজেদের মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য বোধ করছিলেন।
ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য বিদেশি শিক্ষার্থীদের বিতাড়নের উদ্যোগের পক্ষে ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট’কে আইনি ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছে।
আইনের একটি ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বিদেশি নাগরিকের যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান দেশটির জন্য ‘সম্ভাব্য গুরুতর বৈদেশিক নীতিগত বিরূপ প্রভাব’ তৈরি করতে পারে বলে মনে হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দিতে পারেন।
তবে সমালোচকদের বক্তব্য, এই আইনি মানদণ্ড আদালতে খুব বেশি পরীক্ষা করা হয়নি। একই সঙ্গে এটি মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীকে অতিক্রম করতে পারে না। প্রথম সংশোধনী নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত করে।
রায়ে বিচারক ওয়াইজ ভিসা বাতিলের নীতি প্রয়োগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সমালোচনা করেন। তিনি নীতিটিকে ‘কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ডবিহীন’ বলে উল্লেখ করেন।
বিচারক বলেন, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে অ-নাগরিকদের ভিসা বাতিলের ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপে একটি স্পষ্ট ধারা দেখা গেছে। যারা সরকার, সরকার সমর্থিত ব্যক্তি বা কোনো নির্দিষ্ট কারণের সমালোচনা করেছেন, তাদের ভিসা বাতিল করা হয়েছে। বিচারকের মতে, এটি ‘গুরুতর বৈষম্যমূলক প্রয়োগের’ উদাহরণ।
মামলাটি করা অলাভজনক সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ইন্ডিভিজুয়াল রাইটস অ্যান্ড ফ্রি এক্সপ্রেশনের আইনজীবী কনর ফিটজপ্যাট্রিক রায়টিকে প্রথম সংশোধনীতে সুরক্ষিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিজয় হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, আজকের রায় প্রমাণ করে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং প্রত্যেক মানুষের অবিচ্ছেদ্য অধিকার।
শিক্ষার্থীদের বিতাড়ন অভিযান নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এর আগেও আদালতের বাধার মুখে পড়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ম্যাসাচুসেটসের একটি ফেডারেল আদালত রায় দিয়েছিল, ফিলিস্তিনপন্থী কর্মকাণ্ডের কারণে অ-নাগরিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষাবিদদের আটক ও বিতাড়নের চেষ্টা করে মার্কিন কর্মকর্তারা তাদের প্রথম সংশোধনী অধিকার লঙ্ঘন করেছেন।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সংগঠনের জোট ওই মামলা করেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, বিতাড়ন নীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে ‘দমন-পীড়ন ও ভয়ের পরিবেশ’ তৈরি হয়েছে।









