রবীন্দ্রনাথের কুটুম্বিতা বিচার কবিতার কথা মনে পড়ে ‘‘কেরোসিন-শিখা বলে মাটির প্রদীপে/ ভাই ব’লে ডাকো যদি দেব গলা টিপে/হেনকালে গগনেতে উঠিলেন চাঁদা/ কেরোসিন বলি ওঠে এসো মোর দাদা।’’ এক আলোকবর্ষ বহু দূরে থাক, এই তো সেদিনের কথা। প্রদীপ থেকে কেরোসিন বাতি, তা থেকে হারিকেন হ্যাচাকের যুগের ভেতরেই বিজলী বাতি এলো। কাঁচে ঘেরা ছোট্ট এক পৃথিবী তার মাঝে সূক্ষ্ণ তারের এক ঈন্দ্রজাল, কি এক অদ্ভুত সংযোগে ঘটছে স্থায়ী এক বিস্ফোরণ। যন্ত্রণাহীন জ্বলছে এক সেতু, তাতে আলোকিত আমরা। গল্পটা এখানে নয়। এই কাঁচের বাল্বের মতো মতো ঠুনকো আর কিছু নেই। ঠুস্ করে তার কেটে যায়, সংযোগ ছিঁড়ে যায় ভেতরে, বাদি নিভে যায় আর কস্মিনকালেও জ্বলে না। তাই কবি আসাদ চৌধুরী নারীকে ঠুনকো বোঝাতে লিখেছেন ‘লাল গোলাপের ঝলমলে বাল্ব নারী/ এক ফুঁ তে নিভিয়ে দিতে পারি।’
বহু বহু বাতি পেরিয়ে এলো টিউব লাইট। সাদা ধবধবে আলোয় সব ফকফকা। বাতি জ্বলে, পোড়ে বিদ্যুৎ। বিজ্ঞানীরা গলদঘর্ম, আহা যদি কমানো যেত বাতির খোরাক। বাতি জ্বলবে কিন্তু বিদ্যুৎ খাবে সামান্য। একদিন সে স্বপ্নও পুরণ করে এলো এনার্জি বাল্ব। বিদ্যুৎ খায় সামান্য, কিন্তু দেয় মিষ্টি শুভ্র নরম আলো। সাদার চেয়ে সাদা। সেই এনার্জির দিন পেরিয়েও কয়েক বছর হলো ঢুকেছে ‘এলইডি’ বাতি।
বাতির বিদ্যুৎক্ষুধা যেন মিলিয়ে যায়, খায় সামান্য, আলো দেয় ভরপুর। এই এলইডি ৮ জোৎস্নাকে হার মানিয়ে ঘরের ভেতর টেনে এনেছে আলোকিত দিন। রাতের আঁধারকে বিদায় জানিয়েছে যেন। গল্পটা এখানেও নয়।
এনার্জি সুরক্ষা বা এলইডি বাতির ওয়ারেন্টির কোনো সীমা নেই। কেউ দেয় পাঁচ বছর, কেউ পনের। কোনো কোনো কোম্পানির ওয়ারেন্টি আজীবন। কিন্তু বাতি ঠিকই কেটে যায়। ওয়ারেন্টির কাগজ নিয়ে বাতি বদলে আনতে যায় খুব কম মানুষ। ঠিক এই জায়গাতেই একটি বাণিজ্য সম্ভাবনা আছে।
বাণিজ্য এত গভীর ব্যাপার যে, শান্ত ও ঠাণ্ডা মাথায় সেটাকে ধরতে পারে কেবল সুক্ষ্মদর্শী উদ্যোক্তা কিংবা কারিগরী জ্ঞানে ঝানু কোনো চঞ্চল মানুষ। বয়স বারো হোক বা ষাট-সত্তর কিছু যায় আসে না।
পশ্চিম নাখালপাড়া রেলবাজার মসজিদের পাশে আবর্জনার এক স্তুপ জ্বলতে থাকে দিন রাত। ভাঙাচুরা বাতির এক স্তুপ সেখানে। বাতি মানে এনার্জি সেভিং বাল্ব। সেই স্তুপে বসে এক কিশোর বাতিতন্ত্রে মেতে থাকে। কিছু না, সে শুধু নষ্ট বাল্ব ভালো করে। নাম তুহিন।
দূর থেকে মনে হয় গভীর ধ্যানে মগ্ন কোনো বাতির পাগল। মনোযোগ কাঁড়ে আবার কাঁড়েও না। কথা হলো।
: একটা নষ্ট বাল্ব ভালো করতে কত নাও?
: তিরিশ টাকা।
: কয়দিন গ্যারান্টি?
: কমছে কম ছয় মাস। দুই চার বছরও টিকতে পারে।
: সারাদিন কয়টা বাল্ব ঠিক করতে পারো?
: দিনে পাঁচশটা আসলে, পাঁচশটাই করতে পারবো। আমার বড় ভাই সোহাগ, বড় কারিগর।
: ওয়ারেন্টি থাকলেই তো বাল্ব বদলে দেয়।
: ওয়ারেন্টির কাগজ কেউ রাখে না, সবাই হারাইয়া ফেলে। তারাই আমাগো কাছে আসে।
একজন দুটি বাল্ব ঠিক করিয়ে ছেলেটির হাতে ষাট টাকা দিয়ে গেলেন। মনে হলো ওরাই বাতি জ্বালায়। আর আমরা আলো মাখি। আমরা যত সৌখিনতা আর উজ্জ্বলতায় মাতি, ওরা নিশ্চিত হয়, ওয়ারেন্টির কাগজ আমরা হারিয়ে ফেলবোই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)









