প্রথমত বলে রাখি; এই ঢাকা শহরকে অনেক অনেক ভালোবাসি। বিষয়টা এমন নয় যে, যাওয়ার আর জায়গা নেই তাই মরিয়া হয়ে এমন ভালোবাসা। বরং ভালোবাসা এ জন্য যে, ‘এই শহর জানে আমার প্রথম সব কিছু’-তাই!
এই শহরের পথ আমার ভাষা বোঝে। এই শহরের ঝরে পড়া পাতারা আমার ভাষা বোঝে, ভাষা বোঝে এই চৈত্রে গাছে-গাছে গজিয়ে ওঠা নতুন পাতারা। এমনো দিন গেছে, রাত গেছে বুড়িগঙ্গা তীর থেকে তুরাগ পাড়ের ঘরে ফিরেছি একটিও বাক্য ব্যয় না করে। রিকসা চালক বুঝে নিয়েছেন আমার ইশারা-ভাষা। বাসের হেলপার, কন্ডাক্টরও বুঝে গেছেন আমি কোথায় নামবো। আর টোকা না দিতেই খুলে গেছে ঘরের দরজা। তো সেই শহর ছেড়ে অন্যদের গড়া ‘মোহরের কেল্লা’য় ‘শহরান্তরী’ হবো এই আমি?

নিজের শহর নিয়ে কথা বলার অধিকার তো আমার, আমাদেরই বেশি; নাকি? শহরের বেদনা দেখে আমাদের খারাপ লাগবে, মেজাজ চটে যাবে, আমরা অনেক অনিয়মের প্রতিকার চাইবো, এটাই স্বাভাবিক।
এতো নামি-দামি একটা শহর ঢাকা, অথচ তার ভেতরে পরিবহন সিস্টেম বলেকিছু নেই। উত্তর-দক্ষিণ মিলিয়ে দুই সিটি করপোরেশন আছে; তাদের কোটি কোটি টাকার বাজেট আছে, অথচ শহরের নাগরিকদের জন্য গণপরিবহন বলে কোনো বালাই নেই। যে যারমতো, যে কোনো সাইজের বাস নামাচ্ছে। নিত্য-নতুন রুট বের করছে আর চলছে ‘মানুষমারা’ প্রতিযোগিতায়। পুরো শহরে কোনো বাসস্ট্যান্ড নেই; আবার পুরো শহরটাই বাসস্ট্যান্ড। থামে না, ছুটতে চায় কিন্তু ঠিকঠাক গতি পায় না বলে সারাক্ষণই অস্থিরতা লেগে থাকে। তাই যাত্রীদের নামতে হয় প্রধান সড়কের মাঝখানে, উঠতেও হয় দৌড়ে। এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়তে হয় নারী, শিশু আর বয়স্ক মানুষদের। আর শহরের মাঝে এমন বাস চলে যাদের বাইরের দিকটা শত ধাক্কায় চামড়া ছিলে যাওয়া কুকুরের মতো। আর ভেতরটা নোংরা, তেল চিটচিটে দুর্গেন্ধ ভরা। জনস্বাস্থ্যের এই বিষয়টি দেখার মতো কেউ কোথাও আছে বলে মনে হয় না।

রাজপথে গণপরিবহনের এমন দুর্গতির সঙ্গে শব্দ দুষণের বিষয়টি রীতিমত উদ্বেগজনক এখন। কোর্ট বলেছে যত্রতত্র খামোকা হর্ন না বাজাতে। তা কেউ মানছে না। হাইড্রলিক হর্নের ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে, তাও চরমভাবে উপেক্ষিত।আদালত অর্ডার দিচ্ছে। কার্যকর যে করবে, সেই পুলিশ উদাসীন। কোর্ট বললো, আবাসিক এলাকায় রাতের একটা সময় পর হর্ন বাজানো নিষেধ। কে মানে কার কথা!
এতোসব শব্দ যন্ত্রণার সঙ্গে নতুন আপদ নেমে এসেছে শহরজুড়ে। তারনাম মোটর সাইকেলের হর্ন। যান-জটের এই শহরে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর এক অনিবার্য যানের নাম মোটর সাইকেল। সেই প্রয়োজন মেটাতে প্রতিদিন জ্যামিতিক হারে ঢাকা শহরের রাস্তায় নেমে আসছে মোটর সাইকেল। আর এ বাহনের চালকদের হুড়োতাড়া দেখলে মনে হবে কোথাও কোনো তাণ্ডব চলছে। তারা সময় মতো গন্তব্যে যেতে না পারলে সে প্রলব থামবে না। তাই সামনে জায়গা থাকুক বা না থাকুক বিরামহীন হর্ন বাজবে। ঢাকা শহরে কারণে অকারণে হর্ন বাজবে, এ আর দোষের কী? কিন্তু প্রশ্ন হলো মোটর সাইকেলে যদি ট্রাকের হর্ন বাজে বিপত্তি তখনি! মোটর সাইকেল নিয়ম ভাঙবে; উঠে যাবে পথচারীর চলা পথে এসব যেন নিয়মেই দাঁড়িয়ে গেছে। কেউ ঠেকাতে পারছে না এ অনিময়ম। মাঝেমাঝে দেখা যায় আইনের রক্ষক পুলিশ মোটর সাইকেল নিয়ে উঠে পড়ে ফুটপাতে।তা উঠুক, মানুষের গায়ে তুলে দিক মোটর সাইকেল; তাই বলে ট্রাকের হর্ন? এর একটা প্রতিকার হওয়া উচিত।
আর কথা হলো এই, মোটর সাইকেলের বেশিরভাগ চালক বয়সে তরুণ, তারা যদি একটু শব্দ সচেতন না হন, ভালো না বাসেন শহরটাকে তাহলে আমরা দাঁড়াবো কোথায়?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









