ভারতের সচরাচর যা ঘটে না, তাই ঘটলো মঙ্গলবার। জঙ্গি ধরার মতো কয়েকটি শহরে একযোগে অভিযান চালিয়ে বর্ষীয়ান কবি ও মানবাধিকারকর্মী ভারভারা রাও, দুইজন আইনজীবী সুধা ভরদ্বাজ ও অরুণ ফেরেরা, সাংবাদিক গৌতম নওয়ালাখা এবং অধ্যাপক ভারনন গনসালভেসকে গ্রেপ্তার করলো পুলিশ। এখানেই শেষ নয়; আরও কয়েকজন সুপরিচিত মানবাধিকারকর্মী, অধ্যাপক, সাংবাদিক ও আইনজীবীকে গ্রেপ্তারের জন্য খোঁজা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
আটক এসব বুদ্ধিজীবীর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশের দাবি, তাদের কেউ নিষিদ্ধ মাওবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। কেউ আবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে হত্যার ষড়যন্ত্রে যুক্ত। তবে তাদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে গত জানুয়ারিতে মহারাষ্ট্রের ভিম কোরেগাঁওয়ে দলিত সম্প্রদায় ও মারাঠা উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্য সংঘর্ষে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এমন ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের পর স্বভাবতই পুরো ভারত জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। শুধু ভারতেই নয়, প্রতিবাদ এসেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকেও। বিখ্যাত লেখক অরুন্ধতী রায় এই গ্রেপ্তারকে দেশটিতে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
মূলত ভারতে কালো আইন হিসেবে পরিচিত ‘আন-লফুল অ্যাক্টিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট’-এর আওতায় এসব বুদ্ধিজীবীর গ্রেপ্তার করায় সমালোচনার তীব্রতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। কেননা এই আইন করাই হয়েছিল সন্ত্রাসবাদীদের মোকাবিলার জন্য। যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে দিনের পর দিন কারাগারে রাখা যায়। কিন্তু যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা কেউ সন্ত্রাসী বা সমাজবিরোধী নন। তারা সবাই বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের পরিচিত মুখ।
তবে ভিন্ন কথা বলছে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এবং তাদের মূল সংগঠন আরএসএস। তাদের দাবি আইন মেনেই এসব ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। এর পেছনে রাজনৈতিক কোনো কারণ নেই। অবশ্য বিরোধীরা এই দাবিকে নাকচ করে দিয়ে বলছে, এই আচরণ বিজেপির ‘দলিতবিরোধিতা’র বড় প্রমাণ। কারণ তারা ‘বর্ণহিন্দুদের দল’।
প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় ভারতের অনেক ঘটনায় সতর্ক দৃষ্টিতে রাখতে হয় বাংলাদেশকে। কেননা নানাভাবে সেইসব ঘটনার কোনো না কোনো প্রভাব এদেশেও পড়ে। আমরা লক্ষ্য করেছি, ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় অাসার পর গত কয়েক বছর ধরেই ‘গো-হত্যা’, ‘গো-রক্ষা’, আসামে নাগরিকত্ব নিবন্ধন কর্মসূচি বা এনআরসি’র মতো নানা ইস্যুতে সাম্প্রদায়িক সংঘতের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেকেরই অভিযোগ ভারতে এখন সবচেয়ে বেশি অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি বিরাজ করছে।
আর এই অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে সরব ছিলেন এই বুদ্ধিজীবী মহল। কিন্তু বিজেপি একে তাদের বিরোধিতা ধরে নিয়ে দমন-পীড়নে নেমেছে। সমস্যাটা এখানেই। কোনটা সরকার বিরোধিতা আর কোনটা ব্যক্তি, গোষ্ঠী অথবা রাষ্ট্র বিরোধিতা– তা অালাদা না করেই এই ধরনের আচরণে মূলত ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয় সমাজ বা রাষ্ট্রকেই।
এই ধরনের ঘটনা যে শুধু ভারতেই ঘটছে, তা নয়। পুরো বিশ্বে ভিন্নমত দমনের চিত্র মোটামুটি এমনই। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে। পার্থক্য শুধু সংখ্যায় বা পরিমাণে। সময়টাই যেন এমন; কোনোভাবেই ভিন্নমত সহ্য করা হবে না।
আমরা মনে করি, ভিন্নমত দমন গণতন্ত্রের সংস্কৃতি নয়, বরং তাকে শ্রদ্ধা জানানোই গণতন্ত্রের বড় অলঙ্কার, ঐতিহ্য। তাকে সম্মান জানাতে হবে।









