ভিন্নমত দমনের ও মুক্তবাককে গলা চেপে ধরার এক শ্বাসরুদ্ধকর সময় পার করছে
প্রিয় বাংলাদেশ। এ এমন এক সময় যখন মানুষের কথা বলার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা
নেই, শুধুমাত্র চিন্তা প্রকাশের “অপরাধে” দিনে দুপুরে মানুষ খুন হয়ে
যাচ্ছে, নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ রাষ্ট্র নানা ছুতোয় প্রকাশ্যে দায়
অস্বীকার করছে।
এই ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ সময়ে বিরুদ্ধস্রোতে সাঁতরে মানুষের মত প্রকাশের অধিকার ও ন্যায়বিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই দুঃসাহসের কাজ। ইমরান এইচ সরকার সেই কাজটি করছেন, কালের পৈঠায় দাঁড়িয়ে ভবিষ্যত প্রজন্ম হয়তো সফলতা বিচার করবে, আমার সময় থেকে আমি তাঁকে অভিবাদন জানালাম।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও খুনের কথিত ষড়যন্ত্রের জন্য শফিক রেহমানকে গ্রেফতার করার পর নিজের ফেসবুক পোস্টে সেটির নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ইমরান এইচ সরকার। শফিক রেহমান প্রবীণ সাংবাদিক এবং বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী। স্পষ্টতই ইমরান এইচ সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের সাথে তার যোজন যোজন তফাৎ, কিন্তু ব্যক্তিচিন্তা ও রাজনৈতিক দর্শনের বাইরে এসে ভিন্নমতকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দমনের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ঔদার্য তিনি দেখাতে পেরেছেন।
এবার আসা যাক জনাব সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্য প্রসঙ্গে। ইমরান এইচ সরকারের সঙ্গে তাঁর দর্শনগত ফারাককে ব্যক্তিবিরোধে রূপান্তর করে তিনি স্পষ্টতই তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সীমাবদ্ধতার দিকটি উন্মোচন করেছেন। ইমরান এইচ সরকারের দিকে গুরুতর অভিযোগের আঙুল তাক করার পাশাপাশি বলেছেন, ‘তাকে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে আমাদের সরকারের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।’
সরকারিদলের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির এই উক্তিতেই দেশের মতপ্রকাশ ও বাকস্বাধীনতার সামগ্রিক পরিস্থিতি ফুটে উঠেছে। আবার উক্তিটির প্রতি দৃষ্টিপাত করি, তিনি শুধু ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানাননি, রাজসুলভ আদেশ দিয়েছেন। এই উক্তি তাঁর রাজসুলভ অহম, অসহিষ্ণুতা ও ভিন্নমত দমনের জিঘাংসার পরিচায়ক। সজীব ওয়াজেদ জয় সন্দেহ করেছেন, ইমরান এইচ সরকারকে বিএনপি পয়সা দেয় কিনা!
অত্যন্ত হাস্যকর কথা। টাকার বিনিময় ছাড়াও মানুষ যে নৈতিকতার জোরে প্রতিবাদে উচ্চকণ্ঠ হতে পারে, সেই সত্যটি বঙ্গবন্ধুর পৌত্রের জানা নেই! রুচিবোধ ও দর্শনের এই সীমাহীন দৈন্য আমাদেরকে আহত ও হতাশ করেছে। একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যখন শিশুসুলভ অভিমানে ভিন্নমতপ্রকাশকারীকে আনফ্রেন্ড/আনফলো করার আহ্বান জানান, আমরা গভীর মর্মপীড়া অনুভব করি। আমরা বুঝতে পারি, যে অন্ধকার সুড়ঙ্গে আমার বাংলাদেশ পতিত হয়েছে সহসা তার থেকে পরিত্রাণের সম্ভাবনা নেই। যে সজীব ওয়াজেদ জয়রা আমাদের ভবিষ্যত রাজনীতির কর্ণধার তারা যখন একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের জের ধরে ভিন্নমতের প্রতি এমন জিঘাংসা দেখাতে পারেন, তখন এই সন্দেহটি আরো পাকাপোক্ত হয়, তাদের পক্ষে শফিক রেহমানকে হেনস্থা করা কঠিন কিছু নয়।
তিনি ইমরান এইচ সরকারকে ক্ষমা চাইতে বলেছেন। ভুল হলে ক্ষমা চাওয়াতে লজ্জার কিছু নেই। কিন্তু ইমরান এইচ সরকার ঠিক কোথায় ভুল করেছেন? সেই ব্যাপারটি তো পরিস্কার করলেন না জনাব সজীব ওয়াজেদ। ভিন্নমত প্রকাশের জন্য ইমরান এইচ সরকার ক্ষমা চাইতেই পারেন, তবে তার আগে সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিতে হবে, এইদেশে কারো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই, প্রকাশিত মত সরকারের বিরুদ্ধে গেলে মতপ্রকাশকারী ক্ষমা চাইতে বাধ্য থাকবে। তাছাড়া মতপ্রকাশের জন্য ইমরান এইচ সরকারকে সরকারের কাছে ক্ষমা চাইতে হলে, অসংখ্য গুরুতর ব্যর্থতার জন্য সরকার কেনো জাতির কাছে ক্ষমা চাইবে না?
বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ লুটপাট, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি করে হাজার হাজার মানুষকে পথে বসানো, প্রতিদিন কোটি কোটি ডলার বিদেশে পাচার, সর্বস্তরে লুটপাট-দুর্নীতি, দেশজুড়ে হত্যা-গুম-ধর্ষণের ধারাবাহিক মঞ্চায়ন, প্রশ্ন ফাঁস করে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস, সজীব ওয়াজেদ জয়দের সরকার কোনটির প্রতিবিধান করতে পেরেছে? অথচ সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনার জন্যই এদেশের জনগণ তাঁদের ক্ষমতায় এনেছিলো। সেই ব্যর্থতার দায় নিয়ে একটিবারের জন্য কি তাঁরা জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন?
ক্ষমা চাইতে হলে, সরকারকেই ক্ষমা চাইতে হবে। সরকারের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে স্মরণ করিয়ে দেই, ভিন্নমতকে দমন করে ক্ষমতার মসনদ চিরস্থায়ী করার ইতিহাস নেই। দয়া করে ভিন্নমত দমনের চেষ্টা না করে গুম-খুন-ধর্ষণ-লুটপাটের বিচারে উদ্যোগ নিন। ইতিহাসে নন্দিত হয়ে থাকবেন।









