মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজনীতিক এবং সমর নায়কদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া কারও বয়সই পঞ্চাশোর্ধ ছিল না। বেশিরভাগই ছিলেন ত্রিশের কোঠায়। এদের কারোরই ফিদেল কাস্ত্রোর মতো গেলিরা যুদ্ধের কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। তারপরও এই রাজনীতিক এবং সমর নায়কেরা কীভাবে একটি শক্তিধর সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করে দেশ স্বাধীন করার মতো মিরাকল ঘটিয়ে ফেললেন?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং শান্তি ও সংঘর্ঘ বিশেষজ্ঞদের মতে: মূলত অসীম দেশপ্রেম, তীব্র জাতীয়তাবোধ এবং সীমাহীন সাহসই তাদের উদ্বুদ্ধ করেছিলো এতো বড় ঝুঁকি নিতে। অসামান্য মেধাই এতটা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল এসব নায়ককে।
তারা বলছেন: এই উদ্বুদ্ধ হওয়া ছিলো দীর্ঘ ২৪ বছরের শোষণ, নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই। যার কারণে কেবল রাজনীতিক এবং সেনাবাহিনীই নয়, মুক্তির নেশায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিল গোটা জাতি।
১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বয়স ছিলো ৫১ বছর। তাজউদ্দিন আহমেদের বয়স ৪৬ বছর, তৎকালীন মেজর ও সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমানের বয়স ৩৫ এবং আরেক মেজর ও সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের বয়স ছিলো ৩৪ বছর। এছাড়া বেশিরভাগ সমর নায়কেরই বয়স ছিল ৩০ এর কোঠায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: তাদের যে বয়স ছিল, কোন বিরাট কিছু ঘটিয়ে দেওয়ার জন্য ওই বয়সটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। কারণ পৃথিবীর বড় বড় ঘটনার দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই তাদের পেছনে ছিল ওই বয়সী তরুণদেরই অবদান।

‘তবে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি তাদের উদ্বুদ্ধ করেছে এতো বড় ঝুঁকি নিতে সেটা হচ্ছে অগাধ দেশপ্রেম এবং তীব্র জাতীয়তাবোধ। তাছাড়া তাদের প্রত্যেকেই কিন্তু প্রখর মেধাবী ছিলেন। মেধাবী ছিলেন বলেই তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে ওই বয়সেই অত বড় পজিশনে চলে গিয়েছিলেন। আর এই মেধাই তাদের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করেছিল।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার মনে করেন: এই যে জীবন বাজি রাখার ব্যাপারটি হুট করে ঘটেনি, বরং একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর একটা সময় তাদের কাছে জীবন মরণ তুচ্ছ হয়ে গেছে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন: ৪৭-এ যে ভুলটা হয়েছিল জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে, সেই ভুলটা মাত্র ২৪ বছরের মধ্যে সংশোধিত হয়ে গেল। আমরা আধুনিক জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞায় নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারলাম। কোন অর্থে বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে উত্তম, এই অর্থে উত্তম যে জাতি ধর্মভিত্তিক হয় না। জাতি হয় ভাষাভিত্তিক। ইডিওলজির জায়গায় পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ উত্তম।
‘এই যে চেতনা এটাই আসলে সবাই উদ্বুদ্ধ করেছিল। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র হোক বা গ্রামের একজন বেকার যুবক হোক। সবাই মনে করেছিল যে আসলে একটা পরিবর্তন দরকার। সেখানে ব্যক্তির ভুমিকা থাকলেও তা প্রধানতম ছিল না।’
তার মতে, (১৯৪৭-৭১) এই ২৪ বছর ধরে বাঙালি জাতীয়তাবাদী যে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে উঠেছে এবং বাঙালিদের প্রতি যে বৈষম্য, এটা বাঙালিদের মধ্যে যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল সেটাই আসলে আপামর বাঙালি জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য।

তিনি বলেন: প্রথমে এটা (পাকিস্তানের বৈষম্য) ছিল বিস্ময়। কারণ এদেশের ৯৮ শতাংশ লোক ভোট দিয়েছে পাকিস্তানের জন্য (১৯৪৭), ধর্মের নামে। কিন্তু ৪৮ এর পর থেকেই উর্দু নিয়ে শুরু হয়ে গেল (বৈষম্য)… এটা প্রাথমিকভাবে ছিল বিস্ময়, তারপরে এটা হতাশায় রূপান্তরিত হয়। আর এই হতাশা থেকেই জন্ম নেয় ক্ষোভ-বিক্ষোভ। সেটার প্রথম বড় বহিঃপ্রকাশ ছিলো ৫২’র ভাষা আন্দোলন। আর সেটা আমরা কার্যে পরিণত করলাম ৫৪ সালের নির্বাচনে, যে তোমাদের সঙ্গে আমাদের মিলছে না।
‘এভাবে ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রাম চলছিল এবং একটি যৌক্তিক পরিণতির দিকে এগোচ্ছিল। সেটা হচ্ছে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের চেয়ে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ভালো। এটা একটা মোমেন্টামে চলে যায় ৭০’র নির্বাচনের পরবর্তী যে প্রতারণা, সেটা ছিল দেয়াশলাইয়ের কাঠিতে আগুন দেওয়ার মতো। এরপর আর বাংলাদেশ পাকিস্তান থাকেনি। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মধ্য দিয়ে সেটা সেটেলড হলো।’
‘এই যে একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলছে, সেটার মধ্য দিয়ে একটা জাতি আসলে জাতিতে পরিণত হচ্ছে। তখন তার কাছে জীবন, মরণ তুচ্ছ হয়ে যায়। তা না হলে পৃথিবীর একটা ফাইনেস্ট সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে রুমির মতো একজন সংস্কৃতিমনা মিডল ক্লাস ঘরের ছেলে যেমন গেরিলা হচ্ছে, আবার গ্রামের একটা মালকোছা মারা ছেলে– সেও একটা বাঁশ লাঠি নিয়ে নেমে যাচ্ছে। এই যে বিস্ময়করভাবে পুরো জনগোষ্ঠী এক হয়ে যাওয়া এটাই ছিলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। এটা শ্রেণিগত মেরুকরণ এবং ধর্মগত মেরুকরণের উর্ধে চলে গিয়েছিল,’ বলেন শান্তনু মজুমদার।









