এবার ঈদের খুশিকে ম্লান করে দিয়েছে গুলশানের জঙ্গি হামলা। ঘাতকের খুনের চাপ চাপ রক্ত দেশের আপামর মানুষের হৃদয়কে যেন রক্তাক্ত করেছে। স্তব্ধ আর শোকসন্তোপ্ত হয়েছে পুরো জাতি। এই শোকের আবহেই ফিরে এসেছে দেশের বৃহত্তর উৎসব- ঈদ। উৎসব তো আর ঘাতকের সমন মেনে এগোয় না। উৎসব আসে সময় গুণে, তারিখ মেনে। দেশের মানুষ একটু একটু করে শোক কাটিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে। উৎসবের আনন্দালোকে মিশে যাবার চেষ্টা করছে। এটা তো করতেই হবে। শুধু শোক করলে তো চলবে না। ঘাতক তো চাইবেই জীবন থামিয়ে দিতে। কিন্তু নির্বোধ ঘাতক জানে না, মরণেই থামে জীবন! জীবন এগিয়ে যাবে। জীবন জয়ী হবে। আর জীবনে উৎসবের সমারোহ থাকবেই। জীবন এগিয়ে যাবে নবজীবনের ধারাপাত গেয়ে।
এদিকে টানা রোদ ও গরম কাটিয়ে প্রকৃতি এখন শীতল হতে শুরু করেছে। সূর্য নয়, শুরু হয়েছে বৃষ্টির দাপট। ঈদ-উৎসব এবার শোক আর বৃষ্টিতে আলাদা রং নিয়েছে। বৃষ্টি উৎসবের আড়ম্বরে বাগড়া দিলেও অন্য রকম এক ভাবপ্রবণতা সৃষ্টি করেছে। উদাস ও বিষন্ন করে তুলেছে। সকাল থেকেই আকাশ কালো করে থাকছে, খেয়ালখুশি মতো নেমে আসছে জলের ধারা। চারপাশ ঝাপসা করে নেমে আসছে বৃষ্টিধারা। এ যেন বাঙালির শোকের অশ্রু!
আমরা কী দেখব জানলার বাইরে তাকালে? বিভিন্ন বাড়ির ছাদ জুড়ে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির ধারা, ভিজতে থাকা শহর, গলি, পথঘাট ইত্যাদি। কিন্তু একজন এসব দেখেননি। তিনি দেখেছেন বিস্তীর্ণ প্রান্তরে বৃষ্টির অবিরত ঝরে চলা। দেখেছেন, আর লিখে রাখছেন একের পর এক লাইন। মেঘের হাতে চিঠি পাঠাচ্ছেন। তিনি স্বয়ং কালিদাস। হয়তো এমনই কোনো বর্ষাকালে তিনি লিখেছিলেন মেঘদূত।
বর্ষাকাল যে কবিদের সব চাইতে উর্বর সময়, এ কথা মোটামুটি প্রমাণিত। সারা জীবন ধরে যেমন বর্ষার কবিতা লেখা হয়ে চলে। সারা জীবনের বর্ষাকালগুলোতেও লেখা হয় অনেক কবিতা। আসলে বর্ষাকালের দাবিই আলাদা। জানালার বাইরে ঝিরঝির থেকে ঝমঝম জমে উঠবে আর মনের মধ্যে নতুন কবিতা খেলা করবে না, এ আবার হয় নাকি? বৃষ্টি যদি আসে, কবিতা তার পিছু পিছু আসবেই।
কথাটা যে মিথ্যে নয় মোটেই, শঙ্খ ঘোষ বলেছেন, ‘বৃষ্টির সঙ্গে কবিতার একটা নিবিড় যোগাযোগ তো আছেই।’ তার কবিতায় যেমন ফিরে ফিরে এসেছে বৃষ্টি, বৃষ্টিতেও ফিরে ফিরে তার কাছে এসেছে কবিতা।
কবিদের অনুভবে বৃষ্টি যেন এক আশ্চর্য মায়াবী ধারা। ‘আমিও ভেঙেছি কিছু, ছোট মাপে/এই ধরো জলের গেলাস/বৃষ্টির ভিতরে হেঁটে শ্রাবণের কিছুটা ভেঙেছি’।
এভাবেও ভাবা যায়, দেখা যায় বৃষ্টিকে? যেন বৃষ্টি একটা অবিশ্রান্ত অঝোর পর্দা, যার শরীর ভেঙে দিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি আমি। প্রতি মুহূর্তে তৈরি হতে থাকা নতুন নতুন ফোঁটাগুলোকে ভেঙে চুরমার করেই তো আমার এগিয়ে চলা। আমি তো তা হলে শ্রাবণের কিছুটা ভাঙলাম!
শ্রাবণও ভেঙেছে কিছু কম নয়। এই বাংলার কবিদের, কবিতাদের সে বারবার নিংড়ে নিয়েছে। তবেই লেখা হয়েছে এই কবিতা:
‘অন্তরের পথঘাট এবার বর্ষায় গেছে ভেঙে/খোয়া-খল ছড়িয়ে রয়েছে/হাঁ-খোলা নয়ানজুলি উঠে এসে বসেছে সমূহ/বুক জুড়ে।/শান্তি নেই, পথঘাট বাজার কোথাও শান্তি নেই/শুধু হেঁটে যাবো বলে, ভালোবাসা/তোমাকে পথিক/ক’রেও কি শান্তি আছে?’
চিরকালীন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। বৃষ্টি তার আঙুলে পোষা ছন্দের মতো ঘুরঘুর করত। নইলে কীভাবে এক জন মানুষ লিখতে পারেন ‘বৃষ্টি যখন নামল, আমি উঠোনপানে একা/দৌড়ে গিয়ে ভেবেছিলাম তোমার পাবো দেখা/কিন্তু তুমি নেই বাহিরে, অন্তরে মেঘ করে/ ভারী ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরে’। বা এমন আরও অজস্র পঙতি? প্রেম আর প্রবাদের মাঝখানে পায়চারি করতে থাকা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা বারবার ভিজে উঠেছে তুমুল বৃষ্টিতে।
বৃষ্টির সঙ্গে কবিতা জন্ম নেওয়ার কোনও অলীক যোগাযোগ সেই কবে থেকে শুরু হয়েছে কে জানে!
হাজারো বদল সত্ত্বেও, বৃষ্টির শেকলে বাঁধ পড়বার ইচ্ছে হারায়নি কবির মন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘যখন বৃষ্টি পড়ে তখন গাছের নীচে দাঁড়াই একলা/দূরে মাঠের ওপারে মাঠ শূন্য ঝাপসা/ বৃষ্টি থেকে বৃষ্টি আসে, ঢেউ-এর পর ঢেউ-এর বৃষ্টি/গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকার নিঃস্বতা কী বিষম নিঃস্ব।’
মেঘ আর বৃষ্টিতে মেঘমল্লারের মতো মনের মধ্যে ভেসে আসে কিছু অবিস্মরণীয় পঙতি: 
‘শহর জুড়ে বৃষ্টি পড়ে,/বুকের মধ্যে কান্না ঝরে।/এ কোন ব্যথা, চিনি না তো/হৃদয়টাকে ছিন্ন করে?’
এই বৃষ্টিভেজা দিনে পণ্ডিত রশিদ খানের মেঘমল্লার শুনে যে এত ভার জমছে মনে, তার কারণ এর তীব্র বিরহ রস, নায়িকার একাকিত্ব, প্রকৃতির তাণ্ডবে তার গেয়ে ওঠা :
‘পিয়া নহি ঘর, সজনি/রায়ানা অন্ধেরি, ডর মোহে লগে/বাদল গরজে, বিজরি চমকে/মেঘা বরসে, অতি ডরাবে।’
আসলে বৃষ্টি দিয়ে বোধ হয় অনেক কিছুকে স্পর্শ করতে পারা যায়, ছুঁয়ে ফেলা যায়। যা আমার হাতের নাগালের বাইরে, তাকেই আমি আদর করতে পারি বৃষ্টি মারফত। তাই কবীর সুমন লেখেন, ‘বৃষ্টি যেখানে তোমার চোখের জলে/অন্য কারোর দুঃখের কথা বলে/সেইখানে হবে দেখা/তোমার সঙ্গে একা’। ‘মেঘপিওনের ব্যাগের ভিতর মনকেমনের দিস্তা/মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়, ব্যাকুল হলে তিস্তা’…এও তো আরেক মেঘদূত।
বৃষ্টির তোড়ে চিঠি ভাসিয়ে দেওয়ার সাধ হয়তো সব কবিরই থাকে। অথচ চিঠির বদলে সে নিজেই হয়তো ভেসে যায় এক ঝিরঝিরে বর্ষার সকালবেলায়।
হয়তো আকাশ কালো করে আসা বর্ষাকালের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বরাবরের মনকেমন, চিরকালের ডিপ্রেশন। এবার এই ঈদের ছুটির বর্ষার দিনগুলোও কেমন যেন ডিপ্রেশনে কেটে যাচ্ছে। অলস বিষন্ন উদাস, হয়তো খোলা জানলার বাইরে তাকিয়ে তাকিয়েই কেটে গেল আস্ত সকাল, এমনকি দুপুর! কোনো কাজে মন নেই, অকাজেও না। মন যে কীসে আছে, কে জানে। আসলে খারাপ আছে মন।
এভাবে ভাবতে ভাবতে বিকেল, ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যে। মাঝে মধ্যে মনে হয়, ভুবন পেরিয়ে যাই বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায়। যেখানে থাকবে শুধুই ভালোবাসা, উৎসব আর বৃষ্টি। যেখানে থাকবে না হিংসা হানাহানি রক্তপাত। যুবকেরা যেখানে অলীক ধর্মরাজ্যের জন্য প্রাণঘাতী হবে না। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে বর্ষার কাব্য লিখবে। মা-বাবা-ভাইবোন-বন্ধুপরিজনের স্নেহসুখে রচনা করবে প্রাণের ও উৎসবের সমাজ। যেখানে ধর্ম পরিচয় মুখ্য না হয়ে ‘মানুষ’ পরিচয়ে একে অপরকে আলিঙ্গন করবে।
তেমন একটা পৃথিবীর জন্য কী হেঁটে যাওয়া যাবে বৃষ্টি-আগুনের ওপর দিয়ে?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









