পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় নিয়োজিত সেনা সদস্যদের কাছে নিয়মিত আগ্নেয়াস্ত্র থাকলেও তাদের কাছে কোনো গুলি ছিলো না। প্রথম দফা আক্রমণের আগেই তাদের কাছ থেকে ইউনিটের সুবেদার মেজর আব্দুল ওয়াহাব জোয়ার্দার সব গুলি নিয়ে যায়। এই সুবেদার মেজরকে হত্যাকাণ্ডের পরপরই র্যাংক ব্যাজ পরিয়ে লেফটেন্যান্ট হিসেবে ঘোষণা করে সৈয়দ ফারুক রহমান।
সেসময়ের ওয়ান ফিল্ড আর্টিলারির যে ইউনিটটি রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলো, তার একাধিক সদস্যের সাক্ষ্যে আব্দুল ওয়াহাব জোয়ার্দারের গুলি নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি এসেছে। তাদের একজন প্রসিকিউশনের পাঁচ নম্বর সাক্ষী সুবেদার গণি।
তিনি জানিয়েছেন, ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে ক্যাপ্টেন বাশারের (তিনিও একজন সাক্ষী) নেতৃত্বে তাদের রেজিমেন্টের ১০৫/১০৬ জনের এক কোম্পানি ফোর্সকে ঢাকায় বদলি করা হয়। তিনিসহ অন্যরা আগস্ট মাসের ১/২ তারিখ থেকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে ডিউটি শুরু করেন। পালাক্রমে ডিউটি শেষে তারা ৩১ নম্বর বাড়িটিতে থাকতেন।
রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সুবেদার গণি একজন গার্ড কমান্ডার ছিলেন। তিনি জানান: ১৫ আগস্ট ভোর আনুমানিক সোয়া ৪টার দিকে তাদের রেজিমেন্টের সুবেদার মেজর আব্দুল ওয়াহাব জোয়ার্দার এসে গার্ড পরীক্ষা করেন। তারপর তিনি (জোয়ার্দার) বলেন, ‘তোমাদের পুরাতন গুলি দিয়ে দাও, আমি নতুন গুলি দিচ্ছি।’ গুলি নিয়ে জোয়ার্দার জিপে উঠে চলে যায়, কিন্তু নিরাপত্তারক্ষীদের নতুন কোনো গুলি দেওয়া হয় নি।
কিছুক্ষণ পর অপর গার্ড কমান্ডার হাবিলদার কুদ্দুস (তিনিও একজন সাক্ষী) গার্ডদল নিয়ে ডিউটির জন্য আসলে গণি তাকে গুলি নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। তবে তখনও তারা বুঝতে পারেন নি যে কী ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে! তাই যথারীতি নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় পতাকা উত্তোলন শুরু করেন। বিউগলের সুরে পতাকা উত্তোলনের শেষ মুহূর্তে ধানমণ্ডি লেকের দক্ষিণ দিক থেকে প্রচণ্ড গুলি শুরু হয়।
গণি জানান, ৫/৭ মিনিট পর গুলি বন্ধ হলে রুম থেকে বের হয়ে দেখেন ক্যাপ্টেন হুদা এবং মেজর নূর আরো ৭/৮ জন খাকি ও কালো পোষাকধারীসহ সশস্ত্র অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে গাড়ি থেকে নামছে। তারাসহ ল্যান্সারের মেজর মুহিউদ্দিনসহ ‘হ্যান্ডস-আপ’ ‘হ্যান্ডস-আপ’ বলতে বলতে আর গুলি করতে করতে বাড়ির ভেতর ঢুকে যায়।
প্রেসিডেন্ট গার্ডদের তখন কি অবস্থা সেটা বর্ণনা করেছেন চার নম্বর সাক্ষী হাবিলদার কুদ্দুস। তিনি জানান, দক্ষিণে লেকের দিক থেকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের দিকে লাগাতার গুলি আসতে থাকলে তিনি গার্ডদলসহ দেওয়ালে লাইন পজিশনে যান। গুলি বন্ধ হওয়ার পর পাল্টা গুলি করার জন্য গুলি খোঁজাখুঁজি শুরু করলে বুঝতে পারেন, সকল গার্ডের কাছ থেকেই গুলি নিয়ে গেছে তাদের সুবেদার মেজর আব্দুল ওয়াহাব জোয়ার্দার।
সেনাবাহিনীতে সুবেদার মেজর পদটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার মাধ্যমেই সৈন্যদের সঙ্গে কমিশন্ড অফিসাররা যোগাযোগ করেন, নির্দেশনা পৌঁছান। বাস্তব অর্থে সুবেদার মেজরকে অধীনস্তরা তাদের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেন। তাই ওই সময় কুমিল্লাভিত্তিক ওয়ান ফিল্ড আর্টিলারির সুবেদার মেজর জোয়ার্দার সেখান থেকে সৈনিকদের বেতনের টাকা এনে বিতরণের সময় গুলি নিয়ে যাওয়ায় কারো চ্যালেঞ্জ জানানোর সুযোগ ছিলো না, সেনাবাহিনীতে সেটা সম্ভবও নয়।
এভাবে দেশের রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে একটিও গুলি না থাকায় সেদিন সামান্য প্রতিরোধও তারা গড়ে তুলতে পারেন নি। বরং একজন নিহত হন, আহত হন কয়েকজন। সে হিসেবে রক্তাক্ত সেই ভোরে শুধু রাষ্ট্রপতির বিদায়ী প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলই নিহত হন নি, এক নিরাপত্তারক্ষীও নিহত হন। তিনি সিপাহী শামসু। এছাড়াও স্পেশাল ব্রাঞ্চের একজন পুলিশ অফিসারকেও হত্যা করে খুনিরা।
প্রসিকিউশনের ৩৩ নম্বর সাক্ষী হাবিলদার সেলিম জানান, ১৫ আগস্ট আনুমানিক ভোর পৌণে ৫টার দিকে হালকা অস্ত্রের গুলির আওয়াজ শুনে দ্রুত বাইরে আসেন। তখন পেট্রোল ডিউটিতে থাকা দুইজন সিপাহী দৌড়ে এসে জানান, ট্যাংকের আওয়াজ হচ্ছে, ফায়ারিং এর শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে আর্টিলারির কামানের গোলা তাদের ১৫/২০ গজ পূর্বদিকে বিষ্ফোরিত হয়। গোলার টুকরা তাদের চারজনকে আহত করে। তাদের মধ্যে সিপাহী শামসু সেখানেই মারা যান। এছাড়া সিপাহী মোফাজ্জল গুরুতর এবং অন্য দুইজন সামান্য আহত হন।
হাবিলদার সেলিম জানিয়েছেন, তিনি তখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। সকাল সাড়ে ৭টা/৮টার দিকে জ্ঞান ফিরলে তিনি নিজেকে গণভবনের ব্যারাকে শোয়া অবস্থায় পান।
ওই গণভবন এবং ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে ওয়ান ফিল্ড আর্টিলারির যে সদস্যরা ছিলেন, তাদের বেতন দেওয়ার নামেই কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসেছিলো সুবেদার মেজর আব্দুল ওয়াহাব জোয়ার্দার। সুবেদার গণি এবং হাবিলদার কুদ্দুস ছাড়াও একাধিক সাক্ষী বলেছেন, জোয়ার্দার তাদের কাছ থেকে গুলি নিয়ে গিয়েছিলেন যে কারণে ১৫ আগস্ট তারা সামান্য প্রতিরোধও গড়ে তুলতে পারেন নি। তবে মামলার রায়ে খালাস পায় ওয়াহাব জোয়ার্দার।
(আগামীকাল তৃতীয় কিস্তি: হুদা-ডালিম আগেরদিন ‘রেকি’ করে গেলেও গুরুত্ব দেয়নি কেউ)







