আশুলিয়ায় ‘কনফিডেন্স প্রিন্টিং’ প্রেস নামের একটি প্রেসে চলতো অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প মূদ্রণের কাজ। অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প মূদ্রণের পর মেশিনের মাধ্যমে কাটিং ও ছিদ্রকরণ করে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানসহ আদালতে কোর্ট ফি ও অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প সরবরাহ করতো একটি চক্র।
চক্রের সঙ্গে বিভিন্ন অনুমোদিত ভেন্ডরদের সু-সম্পর্ক থাকায় তারা সকল অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের নিকট বিক্রি করতো। ২ টাকা থেকে ৫০০ টাকার পর্যন্ত বিক্রি করতো এসব জাল অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প। প্রতি মাসে ৮ থেকে ১০ রিম কাগজের এসব অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প। চক্রের সদস্যরা এই টাকা দিয়ে গড়েছেন বাড়িসহ বিভিন্ন সম্পত্তি। আর এতে ২২ কোটি টাকার রাজস্ব খোয়া যেতো সরকারের।
মঙ্গলবার ১৩ জুন রাতে র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা এবং র্যাব-৪ এর একটি দল ঢাকার আশুলিয়া ও মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে করে অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প তৈরী চক্রের অন্যতম হোতা মো. সোহেল কাজী (৩১) সহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
গ্রেপ্তাররা হলেন- ১. মো. সোহেল কাজী , মো. জাহাঙ্গীর আলম ওরফে জাহিদ, মো. সোহেল রানা, মো. সাব্বির হোসেন, মোছা. সাবিনা ইয়াছমিন, মোছা. শাহনাজ আক্তার, কামরুল হাসান, মো. সুমন, মো. বিল্টু, মো. সেন্টু মিয়া।
এসময় তাদের কাছ থেকে সর্বমোট ২২ কোটি ১ লাখ ৪৫ হাজার ৮০০টাকার ১১ লাখ ১ হাজার ৪২০টি নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্প ও নগদ ৩০ হাজার ৭৪৫ টাকা ও বিপুল পরিমাণ অন্যান্য সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়।
বুধবার ১৪ জুন রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
তিনি বলেন, চক্রটি প্রায় ২ বছর যাবত ঢাকার আশুলিয়ার বলিভদ্র এলাকায় অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি তৈরী করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে বিপুল পরিমান অর্থ হাতিয়ে নেয়। চক্রটি মূলত সোহেল কাজী এর মাধ্যমে পরিচালিত হত। অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প তৈরি ও বিক্রয়ে অন্যান্যরা সোহেল কাজীর সহযোগি হিসেবে কাজ করত। সোহেল কাজী পূর্বে বিভিন্ন প্রিন্টিং প্রেস এ চাকুরীর সুবাদে সেখান থেকে সে বিভিন্ন রেভিনিউ স্ট্যাম্প তৈরীর কাজ রপ্ত করে।
অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প চিহ্নিতকরণ সহজ না হওয়ায় এবং অধিক মুনাফা লাভের আশায় সে নিজ ব্যবস্থাপনায় অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প তৈরি ও বিক্রয়ের পরিকল্পনা করে। আশুলিয়াস্থ ‘কনফিডেন্স প্রিন্টিং’ প্রেস এর মালিক ও অন্যান্য কর্মচারীদের সাথে পরিচয়ের সূত্র ধরে সে উল্লেখিত ছাপা খানায় অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প মূদ্রণের কাজ শুরু করে।
খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেপ্তার জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে রাজধানীর উত্তরা, বনানী, গুলশান, সাভার ও টঙ্গীসহ দেশের বিভিন্ন আদালতে কোর্ট ফি ও অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প সরবরাহ করা হত। বিভিন্ন সময় অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প সরবরাহ করার সুবাদে জাহাঙ্গীর এর সাথে জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প তৈরী করতে পারে এমন অনেক ব্যক্তির পরিচয় হয় এবং তারা সহযোগী হিসেবে কাজ শুরু করে। এভাবে তারা ১০-১৫ জনের একটি চক্র গড়ে তুলে। এছাড়াও তার সাথে বিভিন্ন অনুমোদিত ভেন্ডরদের সাথে সু-সম্পর্ক থাকায় সে তাদের নিকট কমমূল্যে অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি সরবরাহ করত। ভেন্ডররা এ সকল অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করত।
তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে এক রিম কাগজের মাধ্যমে অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প তৈরি করতে গড়ে তাদের ৩০-৪০ হাজার টাকা খরচ হত। সোহেল তৈরি করে জাহিদের কাছে এক লাখ টাকায় বিক্রি করত। জাহিদ ওই অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্পগুলো রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আনুমানিক ২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করত। এভাবে তারা প্রতি মাসে ৮-১০ রিম কাগজ দিয়ে অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প তৈরি করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করে আসছিল।
গ্রেপ্তারদের বিষয়ে তিনি বলেন, সোহেল কাজী প্রায় ১৬ বছর আগে মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে বিভিন্ন প্রিন্টিং প্রেসে কাজ শুরু করে। তার নেতৃত্বে বিগত প্রায় ২ বছর যাবত চক্রটি অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি তৈরি ও বিক্রয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। একপর্যায়ে অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প তৈরীর চাহিদা বেড়ে গেলে সোহেল কাজী সে এই কাজে স্ত্রী সাবিনা ইয়াছমিনসহ স্ত্রীর বড় ভাই সোহেল রানাকেও সম্পৃক্ত করে। তার স্ত্রী সাবিনা ইয়াছমিন বাসা থেকে মালামাল ডেলিভারী ও আর্থিক বিষয় দেখাশুনা করত। প্রিন্টিং প্রেসে অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি মূদ্রণের পর সোহেল রানার বাসায় পারফেক্ট মেশিনের মাধ্যমে কাটিং ও ছিদ্রকরণসহ পরের ধাপের কার্যক্রম সম্পন্ন করত। এছাড়াও তার একটি নিজস্ব ট্রাক রয়েছে। ট্রাকের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে মালামাল পরিবহনের আড়ালে সে বিভিন্ন সময় অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প সরবরাহ করত।
জাহাঙ্গীর ৫-৬ বছর পূর্বে মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে একটি প্রেসের কারখানায় চাকুরী শুরু করে। সোহেলের সাথে অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি তৈরি ও বিক্রয়ের সাথে যুক্ত হয়। অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প তৈরি করে জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে তা রাজধানীর বনানী, গুলশান, উত্তরা, টঙ্গী ও সাভারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তার পরিচিত ভেন্ডরদের কাছে বিক্রি করা হত। তার স্ত্রী শাহনাজ স্বামীর সহযোগি হিসেবে অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প তৈরী ও বিক্রয় ও বহনকারী হিসেবে সহযোগিতা করে আসছিল। তারা স্বামী-স্ত্রী উভয়ে উক্ত জালিয়াতির মাধ্যমে মানিকগঞ্জ জেলা সদরে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা মূল্যের একটি বাড়ি নির্মাণ করেছে।
সাব্বির বিগত ২-৩ বছর ওই প্রেসে কাজ করছিল। ২ বছর আগে সোহেল কাজীর মাধ্যমে এই চক্রের সাথে জড়িত হয়ে অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প তৈরীর কাজ করে আসছিল। কামরুল, সুমন, সেন্টু ও বিল্টু উক্ত প্রিন্টিং প্রেসে কাজ করত এবং প্রেসে অবৈধ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি মূদ্রণের কার্যক্রম করত।
গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে বলেও জানান তিনি।









