মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও তথ্যের অধিকার নিয়ে কাজ করা যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন আর্টিকেল নাইনটিন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছাড়া বিতর্কিত প্রযুক্তির মাধ্যমে মোবাইল, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি করতে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান জানান, মোবাইল ও সামাজিক মাধ্যমে ‘আইনসম্মতভাবে’ নজরদারি বা আড়িপাতার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মোবাইল ও সামাজিক মাধ্যমে আড়িপাতার ইসরাইলি আধুনিক সরঞ্জাম কেনার খবর নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই সংসদকে এ তথ্য জানান তিনি।
মঙ্গলবার ১৭ জানুয়ারি সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে আর্টিকেল নাইনটিন-এর দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ফারুখ ফয়সল বলেন: বাংলাদেশের আইন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে বহু বছর ধরেই মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেআইনি নজরদারি করার অভিযোগ রয়েছে। একাধিক ঘটনায় নাগরিক অধিকারকর্মী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সাধারণ নাগরিকের ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনা মানুষের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছাড়া মোবাইল, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি বৃদ্ধির সরকা্রের সাম্প্রতিক উদ্যোগ নাগরিকের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনযাপন, যোগাযোগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমত পোষণ, সুনাম, গোপনীয়তা, জীবন, সম্পদের অধিকারসহ একাধিক সাংবিধানিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করবে। জাতীয় নির্বাচনের আগে এই ধরণের উদ্যোগ মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করবে।
তিনি আরও বলেন, নজরদারি কার্যক্রম ঢালাও ভাবে করা যায় না। শুধুমাত্র আইনে উল্লেখিত সুনির্দিষ্ট কারনে, কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কার্যক্রম একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নজরদারি করা যায়। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি, ১৯৬৬ এর ১৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পরিবার, বসতবাড়ি বা চিঠিপত্রের ব্যাপারে খেয়ালখুশি মত হস্তক্ষেপ অথবা সম্মান ও সুনামের ওপর বেআইনী আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পাশাপাশি অনুরূপ হস্তক্ষেপ কিংবা আক্রমণের বিরুদ্ধে নাগরিকের আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র। সন্ত্রাস ও চরমপন্থা দমন, নাগরিকের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এইসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনে আইনের অধীনে রাষ্ট্র নজরদারি করতে পারে। তবে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের অধীনে পরিচালিত নজরদারি কার্যক্রম আইনানুযায়ী ও স্বচ্ছতার সাথে শুধুমাত্র রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রয়োজনে হচ্ছে কিনা তা তদারকি করার জন্য বিচার বিভাগ ও নাগরিক অধিকারকর্মীদের সমন্বয়ে স্বাধীন তদারক সংস্থা প্রয়োজন।”
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১ এর ধারা ৭১ অনুযায়ী আড়িপাতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে ২০০৬ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে এই আইনের ৯৭ক ধারায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে টেলিফোন আলাপ ও বার্তা রেকর্ড করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এই আইনে আড়িপাতার জন্য নির্বাহী বিভাগকে বিচার বিভাগ থেকে আড়িপাতার সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখপূর্বক পূর্বানুমতি নেওয়ার বিধান রাখা হয় নাই। পাশাপাশি এই আইনের অধীনে ‘সরল বিশ্বাসে’ পরিচালিত কার্যক্রমে দায়মুক্তি দেওয়া আছে। অভিযোগ আছে সরকার অধিকারকর্মী, ভিন্নমত পোষণকারী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে বেআইনি নজরদারি করছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে সরকার ভিন্নমত, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষসহ সাধারণ নাগরিকদের দমন করার জন্য আড়িপাতার বেআইনি ও যথেচ্ছ ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। এই সব কার্যক্রমের বিরুদ্ধে দায়মুক্তি বিধানের জন্য নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভেরও কোন সুযোগ নেই।
আর্টিকেল নাইনটিন সরকারকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য সকল অংশিজনকে সম্পৃক্ত করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করার দাবি জানায় এবং এই নীতিমালা প্রণয়নের আগে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি কার্যক্রম স্থগিতের আহ্বান জানায়।









