‘আম্মা’ বরাবরই গম্ভীর স্বভাবের ছিলেন। হাসতেন খুব কম, তবে হাসলে মিষ্টি দেখাত তাকে। অনেক ভক্তের বিশ্বাস তার হাসিতে আছে আধ্যাত্মিক ঔজ্জ্বল্য। আর তামিলনাড়ুজুড়ে প্রবাদ চালু আছে ‘আম্মা যেদিন হাসেন সেদিন ঈশ্বরও হাসেন’ আম্মার হাসিমুখ দেখলে ভালো কাটবে দিন। তাই লাখ লাখ মানুষ সকালে টিভি-চ্যানেল খুলে রাখতেন যদি দেখা যায় আম্মার হাসিমুখ।
দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যক্তি পূজার রাজনীতিতে নিজ রাজ্যে এমনই ছিল তার ভাবমূর্তি। আর কেবল তামিলনাড়ু বললে ভুল বলা হবে। ১৯৯০ পরবর্তীতে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে তার প্রভাব অস্বীকার করতে পেরেছেন কে? রাজীব গান্ধী থেকে নরেন্দ্র মোদী তার দুয়ারে কে-না ধরনা দিয়েছেন? তার একটি চিঠির জন্য আটকে গিয়েছিল অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকার গঠন। সেবার জয়ললিতা এনডিএ জোটে। তার দল এআইডিএমকে ১৯৯৮-এর নির্বাচনে তামিলনাড়ুতে পেয়েছিল অনেকগুলো আসন। স্পষ্টতই তার সমর্থনের ওপর নির্ভর করছিল বাজপেয়ীর সরকার গঠন। সব যখন চূড়ান্ত শেষ মুহূর্তে বেঁকে বসলেন জয়ললিতা। নিয়ম অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে সমর্থনের চিঠি পাঠালেন না জয়ললিতা। দিল্লীজুড়ে অধীর অপেক্ষা। কিন্তু খেয়ালি, একরোখা আম্মা নীরব।
সারা দিল্লী তখন গাইছে ‘চিঠ্ঠি অ্যায়ি হ্যায়’ কিন্তু চিঠি যে আর আসে না! দেশের সরকার গঠন থেমে গেছে। শেষ পর্যন্ত দেশজুড়ে খ্যাত ‘গ্ল্যামার কুইন’ জয়ললিতার কাছে বাজপেয়ীর অন্যতম শীর্ষ নেতা ‘প্রিন্স চার্মিং’ যশোবন্ত সিংকে পাঠান। কীভাবে সফল হয়েছিলেন তা জানা না গেলেও শেষ পর্যন্ত জয়ললিতার চিঠি আদায়ে সক্ষম হয়েছিলেন। যশোবন্তের এই চিঠি নিয়ে সিপিএম সাংসদ সোমনাথের ব্যঙ্গ সারাদিন অচল রেখেছিল লোকসভা। জয়ললিতা এমনই। জেদী, একরোখা, চোখা কথাবার্তা, একগুয়ে, খেয়ালি সেই সঙ্গে বেপরোয়া। আর এসব নিয়ে তিনি কেবল নিজ রাজ্য নয় সর্বভারতীয় রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন।
রাজনীতির বাইরে একটি ঘটনা জয়ললিতার এই স্বভাব প্রমাণের উদাহরণ হতে পারে। রাজনৈতিক গুরু ও অসংখ্য ছবির নায়ক এমজিআরকে জড়িয়ে নানা কথা বাতাসে উড়ত ৭০-৮০-এর দশকে। অসন্তুষ্ট ছিলেন এমজিআরের স্ত্রী জানকী। ২৪ ডিসেম্বর ১৯৮৭ এমজিআরের মৃত্যু সংবাদ শুনেই ছুটে যান তার বাড়িতে। সেদিন তাকে ঢুকতে না দিয়ে অপমানের চূড়ান্ত করেন জানকীর সমর্থকরা। দমে যাননি জয়ললিতা গুরুর শব নিয়ে যাওয়া হলো রাজাজি হলে। শোনা মাত্রই ছুটে গেলেন সেখানে। একটানা ২১ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রইলেন গুরুর মাথার কাছে। জানকীর সমর্থকরা চিমটি কেটেছেন, পা মাড়িয়ে দিয়েছেন, করেছেন অশ্লীল গালাগাল কিন্তু মাথার কাছ থেকে টলানো যায়নি জয়ললিতাকে। আর রাজনৈতিক জেদের উদাহরণ হতে পারে বিধানসভায় একবার অপদস্থ হয়ে শপথ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী না হয়ে ফিরবেন না। কথা রেখেছিলেন তামিলনাড়ুর ‘আম্মা’ কেবল একবার নয় পাঁচবার শপথ নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রীর। সেই ১৯৮৪ তে তার সাথে লোকসভায় কথা বলে খুশবন্ত সিং জানিয়েছিলেন, ‘এ মেয়ে পাখির চোখ রেখেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে, তবে আপাতত ও তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হতে চায়।’ তার নাম উঠে এসেছে প্রধানমন্ত্রীর জন্য। জানতে চাইলে বলতেন, তামিলনাড়ুতে আমার কিছু কাজ বাকি রয়েছে। আর তামিলনাড়ুর জনগণও তাকে দিয়েছে দু’হাত ভরে। তার মৃত্যু সংবাদে শোকাহত হয়ে প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষের মৃত্যু আর অসংখ্য মানুষের আঙ্গুল কেটে ফেলা তারই প্রমাণ।
কোনো কিছুই তাকে বিরত রাখতে পারেনি তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে। জয়ললিতা ভারতের কোন অঙ্গরাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী যিনি ক্ষমতায় থাকতে জেলে গিয়েছিলেন বছর দুয়েক আগে ’৯১-এ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ক্ষমতা ছাড়লে করুণাবিধি তাকে বেকায়দায় ফেলতে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ৬৬ কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এফআইআর দায়ের হয়। আর ২৮ কেজি স্বর্ণ আর ৮০০ কেজি রুপার অবিশ্বাস্য গল্প ছড়ায়। শোনা যায় ১০ হাজার শাড়ি আর সাত হাজার জোড়া জুতার গল্প। গ্রেফতার হয়ে জেল খাটেন এক মাস। প্রতিদ্বন্দ্বীরা উল্লাস করেছেন, এবার জয়ললিতার তরী ডুবল। কিন্তু তিনি তো হাঁটছেন আপামর জনসাধারণের ‘আম্মা’ হওয়ার পথে। তাকে কে দমায়? ২০১৪-এর ২৭ সেপ্টেম্বর আদালত তাকে চার বছরের সাজা দিলে রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি দেখছিলেন অনেকেই। কিন্তু ২০১৬তে জয়ললিতা বুঝিয়ে দেন যুক্তি নয় ভক্তিই বড়। আবার মুখ্যমন্ত্রী। ‘আম্মা’ বিশ্বাস করতেন ‘ঈশ্বর ও জনতার সঙ্গে তার রয়েছে আত্মিক জোট।’
আম্মার অবদান তামিলনাড়ুতে দৃশ্যমান। মুল্লাপেরিয়ার বাঁধ তামিলনাড়ুর কৃষিকে সঞ্জীবনী শক্তি যুগিয়েছে। জয়ললিতা ওয়েলফেয়ার স্কিমের অধীনে ছাত্রদের বিনামূল্যে ল্যাপটপ, গরিবদের জন্য, স্বল্পমূল্যে খাবার, মিড-ডে মিল ও সরকারী স্কুলে ছাত্রদের জন্য খাবার। গ্রামের তাঁতিদের জন্য বিনামূল্যে ২০০-৭৫০ ইউনিট বিদ্যুত সরবরাহ। বিয়ের খরচ বহন ও মঙ্গল সূত্রের জন্য ২৫ হাজার রুপিতে ৪ গ্রাম স্বর্ণ দিয়েছেন। মদে নিয়ন্ত্রণ ও ২০০৩-এ রাজস্বে বিপুল ক্ষতি মেনেও
লটারি বন্ধ করে দেন রাজ্যে। বৃষ্টির জল সংরক্ষণ ও কন্যা ঋণ হত্যা বন্ধে তার ক্র্যাডল বেবি স্কিম বহুল আলোচিত। ২০১৫-এর সেপ্টেম্বরে ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সম্মেলন আয়োজন করে নিজ রাজ্যে এনেছিলেন ২.৪২ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ। জনগণের স্বল্পমূল্যে আহারের জন্য ‘আম্মা রেস্টুরেন্ট’ আর যাতায়াতের জন্য ‘আম্মা বাস’ তো সবার জানা। তাই হাজারো দুর্নীতি আর কেলেঙ্কারির অভিযোগের পরেও জয়ললিতা জয়রাম ছিলেন আপামর জনসাধারণের আম্মা। আর তার পোয়েস গার্ডেনের প্রাসাদে ধরনা দিয়েছেন একাধিক প্রধানমন্ত্রী। সেই রাজীব গান্ধী থেকে নরেন্দ্র মোদি চেয়েছেন ‘আম্মার আশীর্বাদ।
তামিল ও তেলুগু ছবির নিজ সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সর্বাধিক উপাজর্নকারী জয়ললিতা জয়রাম রাজনীতিতে আসেন তার ছবির নায়ক হয়ত জীবনেরও এমজিআরের হাত ধরে। পেছনে রয়েছে প্রথম প্রেমিক থেকে শুরু করে অসংখ্য পুরুষের ছুরি মারার ইতিহাস। কোটিপতি পিতার নিঃস্ব অবস্থায় মৃত্যু থামিয়ে দিয়েছে তার পড়াশোনা, দশম শ্রেণীর পরীক্ষায়
সারা রাজ্যে প্রথম হয়ে রাজ্য সরকারের বৃত্তি পেয়েও উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পাননি । ইচ্ছার বিরুদ্ধে ১৬ বছর বয়সে প্রাপ্ত বয়স্ক ছবিতে অভিনয় করতে হয়েছে যা তিনি দেখতে পারেননি অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায়। তাই নিজেকে ঢেকে রাখতেন হেঁয়ালির ঘোমটায়। দোর্দণ্ড- প্রতাপে শাসন করেছেন পুরুষ সহকর্মীদের। সামলেছেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দাবার চাল। নিজেকে সচেতনভাবেই উপস্থাপন করতেন বঞ্চিত এক নারী হিসেবে।
এমজিআরের শেষ যাত্রায় তাকে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে নিগ্রহ করেছে বহু অপরিচিত হাত। কিন্তু তিনি উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। নিঃসঙ্গ ব্যক্তিজীবনে ভালবাসার কাঙ্গাল এই নারী হয়ত শপথ নিয়েছিলেন জনতার ভালবাসা আর সম্মান আদায়ের। তা তিনি করেছিলেন বটে। হয়ে উঠেছিলেন তামিলনাড়ুর শ্রদ্ধেয় ‘আম্মা’। তামিলনাড়ুর ‘আম্মা’ জয়ললিতা জয়রাম আর নেই। ৭৩ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর চেন্নাইয়ের এ্যাপোলো হাসপাতালে ৫ ডিসেম্বর ২০১৬ তে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। তামিলনাড়ুবাসী আর দেখবে না তাদের আম্মার স্বর্গীয় হাসি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)









