সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই প্রতিবাদ-প্রতিক্রিয়ায় সরব সরকার এবং আওয়ামী লীগ। সাতশ ৯৯ পৃষ্ঠার রায়ে উঠে আসা মূলতঃপর্যবেক্ষণ নিয়েই আপত্তি তুলছেন মন্ত্রী-এমপিরা।
বিচারকদের অপসারণে সংসদের কর্তৃত্ব কেড়ে নেয়ার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং একক নেতৃত্ব বিষয়গুলোতে পর্যবেক্ষণগুলো নিয়েই প্রতিবাদমুখর সরকার। সরকারের শরিক দলগুলোও একই অবস্থানে আছে।
১৪ দলের মুখপাত্র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলছেন: বৈধ সংসদ, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু নিয়ে রায়ে যে পর্যবেক্ষণ রয়েছে তা ১৪ দল প্রত্যাখ্যান করছে। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে দেশের মানুষ জানে। বঙ্গবন্ধু যে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা চন্দ্র-সূর্যের মতোই সত্য। এটা নিয়ে রায়ে যা বলা হয়েছে, তা জনগণ মেনে নেবে না, ক্ষমা করবে না। সুতরাং এ রায়ের পুনর্বিবেচনা জরুরি।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব উল আলম হানিফ বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। এখানে জাতির পিতার বাইরে অন্য কারও কথা বলার কোন সুযোগ নেই। এই একক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যারা কথা বলতে চান, তারা মূলত স্বাধীনতার ইতিহাসকে বিকৃত করার চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছেন। আমরা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিতে চাই, সাংবিধানিক পদে থেকে আপনি ইতিহাস বিকৃতি করবেন, এটা বাংলাদেশের জনগণ কখনো মেনে নেবে না।’
নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের মতে, ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে রায়ে ১৬ কোটি মানুষের ভোটে নির্বাচিত সংসদকে অবমাননা করা হয়েছে। বাংলাদেশে বাস করে বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার করবেন না, এটা শুধু ভাঁওতা দেওয়ার শামিল।
বিষয়টি মূলতঃ যে মন্ত্রণালয়ের তার দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলছেন, ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে আপত্তিকর, অপ্রীতিকর ও অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যের মাধ্যমে ইতিহাস বিকৃত হয়েছে। এক্সপাঞ্জ করার আবেদন জানানোর জন্য ওই বক্তব্যগুলো আরো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
গত ৩ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের কাছে ন্যস্ত করে আনা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল খারিজ করে রায় দেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ।
গত ১ অাগস্ট পূর্ণাঙ্গ সে রায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত রায় অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের সুপারিশ করার ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে ফিরে আসে। পাশাপাশি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের যে সংশোধন আনা হয় তা সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক বলে রায়ে উল্লেখ করেন প্রধান বিচারপতি।
এছাড়াও রায়ের পর্যবেক্ষণে, গণতন্ত্র, রাজনীতি, সামরিক শাসন, নির্বাচন কমিশন, সুশাসন, দুর্নীতি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে।
প্রধান বিচারপতি পর্যবেক্ষণে লিখেছেন: ১৯৭১ সালে আমরা যে অলঙ্ঘনীয় ঐক্য গড়েছিলাম, তা শত্রুরা নস্যাৎ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। আজ আমরা একটি মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে বাস করি। অথচ আজ ঔদ্ধত্য এবং অজ্ঞতাকে আমরা প্রশ্রয় দিয়ে চলছি। কোনে একজন ব্যক্তি দ্বারা কোনে একটি দেশ বা জাতি তৈরি হয়নি। আমরা যদি সত্যিই জাতির পিতার স্বপ্নে সোনার বাংলায় বাঁচতে চাই, তাহলে এই আমিত্বর আসক্তি এবং আত্মঘাতী উচ্চাভিলাষ থেকে আমাদের মুক্ত থাকতে হবে। এই আমিত্ব হলো কেবল এক ব্যক্তি বা একজন মানুষ সবকিছুই করতে পারেন এমন ভাবনা।









