জীবনে বিপদ, ভয়, দুশ্চিন্তা কিংবা অনিশ্চয়তা আসতেই পারে। কখনও হঠাৎ কোনো সংকট, কখনো অসুস্থতা, আবার কখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ মানুষকে অস্থির করে তোলে। ইসলামে এমন পরিস্থিতিতে আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি তাঁর কাছে সাহায্য ও নিরাপত্তা চাওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পড়ার জন্য সাহাবিদের বেশ কিছু দোয়া শিখিয়েছেন।
এসব দোয়ার মধ্যে এমন কিছু দোয়া রয়েছে, যেগুলো বিপদ, ভয়, দুশ্চিন্তা ও নানা অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার জন্য পড়া যায়।
সব ধরনের অনিষ্ট থেকে আশ্রয়
আল্লাহর সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) যে দোয়াটি শিখিয়েছেন, তা হলো—
“আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক।”
অর্থ: “আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।”
সহিহ মুসলিমের হাদিসে এই দোয়ার ফজিলতের কথা এসেছে। কোনো স্থানে অবস্থান করার সময় এটি পড়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া যায়।
ভয় বা সংকটে আল্লাহর ওপর ভরসা
বিপদের সময় মানুষের মনে ভয় তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এমন পরিস্থিতিতে কোরআনের একটি বাক্য মুমিনকে আল্লাহর ওপর ভরসা করার কথা মনে করিয়ে দেয়—
“হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল।”
অর্থ: “আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।”
—সূরা আলে ইমরান, ৩:১৭৩
কোরআনে বলা হয়েছে, মুমিনদের ভয় দেখানো হলে তারা এই বাক্য বলেছিল। এরপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও কল্যাণ নিয়ে ফিরে এসেছিল।
কঠিন সময়ে পড়ার দোয়া
কঠিন পরিস্থিতিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) যে দোয়াটি পড়তেন, তার মধ্যে আল্লাহর মহত্ত্ব ও ক্ষমতার স্বীকৃতি রয়েছে।
দোয়াটির শুরু—
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল আজিমুল হালিম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রব্বুল আরশিল আজিম…”
এর অর্থ হলো—“মহান ও সহনশীল আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। মহান আরশের রব আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আসমানসমূহের রব, জমিনের রব এবং সম্মানিত আরশের রব আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।”
—সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম
কঠিন মুহূর্তে এই দোয়া আল্লাহর মহত্ত্ব স্মরণ করতে সাহায্য করে।
দুশ্চিন্তা ও ঋণের বোঝা থেকে আশ্রয়
মানুষের জীবনে দুশ্চিন্তা, হতাশা, অক্ষমতা কিংবা ঋণের চাপও বড় ধরনের পরীক্ষা হতে পারে। এসব থেকে আশ্রয় চেয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি দোয়া শিখিয়েছেন—
“আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাজান, ওয়া আউযু বিকা মিনাল আজজি ওয়াল কাসাল, ওয়া আউযু বিকা মিনাল জুবনি ওয়াল বুখল, ওয়া আউযু বিকা মিন গালাবাতিদ দাইনি ওয়া কাহরির রিজাল।”
অর্থ: “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে; অক্ষমতা ও অলসতা থেকে; কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে এবং ঋণের বোঝা ও মানুষের প্রভাবাধীন হওয়া থেকে।”
—সহিহ বুখারি
দোয়াটিতে মানুষের জীবনের বিভিন্ন দুর্বলতা ও সংকট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।
দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের দোয়া
বিপদ থেকে মুক্তি চাওয়ার পাশাপাশি একজন মুমিন দুনিয়া ও আখিরাতের সামগ্রিক কল্যাণও চাইতে পারেন। কোরআনে শেখানো হয়েছে—
“রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়া কিনা আজাবান নার।”
অর্থ: “হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দিন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।”
—সূরা আল-বাকারা, ২:২০১
এটি কোরআনের অন্যতম ব্যাপক অর্থবোধক দোয়া। এতে দুনিয়ার কল্যাণ, আখিরাতের কল্যাণ এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি সবকিছুই চাওয়া হয়েছে।
দোয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন চেষ্টা
বিপদের সময় শুধু দোয়া করাই নয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি। অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়া, বিপদে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া কিংবা প্রয়োজন হলে অন্যের সহযোগিতা নেওয়া এসব বাস্তব উদ্যোগের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া একজন মুমিনের দায়িত্বশীলতার অংশ।
দোয়া মানুষের মনে আল্লাহর ওপর ভরসা তৈরি করে এবং কঠিন সময়ে আশা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
বিপদ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে পারে। তবে একজন মুমিন বিপদের সময় আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে পারেন। দোয়া, প্রয়োজনীয় চেষ্টা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা এই তিনটি বিষয় মনে রেখে কঠিন সময় মোকাবিলা করাই ইসলামের সুন্দর শিক্ষা।









