বেলকনির পাশে যে দরজা তা আমি খুব একটা বন্ধ করি না, সবসময় খোলাই থাকে। রাতের গভীরে কিংবা শেষ রাতে যখন আমার ঘুম ভাঙে তখন দরজা দিয়ে সোজা চোখ পড়ে বিস্তির্ণ বিলে। আজকেও শেষ রাতে আমার ঘুম ভাঙে, আমি বিছানা ছেড়ে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াই, হালকা বৃষ্টি আমার শরীর ভিজিয়ে দেয়। মনের উদাসীনতার সকল সীমা পরিসীমা ভেঙে যায়, নানান ভাবনা ভেসে ওঠে, মনে মনে সব লিখে ফেলি কিন্তু কোনটাই আর লেখা হয় না।
মনে পড়ে আমার বাবার চলে যাওয়ার কথা, কিন্তু এবার আর চোখ ছলছল করে না। একজন মানুষের স্মৃতি আর কতদিন তাজা থাকে! অথচ আব্বার অনুভূতি থেকে বের হতে আমার অনেকটা সময় লেগেছিল। সেই সময়টায় ‘আদিম’-এর শ্যুট আর সম্পাদনার কাজ শেষ করলেও, সাউন্ডের কাজ তখনও বাকি। কোন একটা জায়গা থেকে টাকা আসবে আর আমি সাউন্ডের কাজ শেষ করবো এই অবস্থা নেই। ফেসবুকেও শেয়ার সংক্রান্ত পোস্ট দিতেও লজ্জা লাগছিল তখন। আমি হাত পা গুটিয়ে বসে থাকি. আব্বার সঙ্গে সময় কাটাই।
মনে পড়ে আমার অসুস্থ আব্বা ওয়াশরুম ব্যবহার করতে গিয়ে তার পুরো শরীর নোংরা করে ফেলে, আমি তখন আব্বাকে প্রথম গোসল করাতে গেলে ‘অ্যা সেপারেশন’এর সেই দৃশ্যের আবিভার্ব ঘটে, আমার কান্না কিছুতেই থামছিল না। আব্বার সঙ্গে আমার তুমুল দূরত্ব থাকলেও সেই সময়টায় আব্বা আমার সন্তান হয়ে ওঠেন। আর্টের জার্নি আমাকে যে প্রশান্তি দেয়, আব্বার সঙ্গে কাটানো সময়ে আমি সেই প্রশান্তি পাচ্ছিলাম।
প্রায়ই রাতে আমি আব্বার পাশে বসে থাকতাম। আব্বার ঘুম হয় না, নিমোর্হ চোখে পাশের আলমেরির আয়নার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতেন তিনি। “আমারা সোনাবাবাটা তুমি কি দেখো?” এমন আদুরে প্রশ্নে আব্বা প্রায় চুপ থাকতেন, মাঝেমধ্যে বলতেন “দেখি… এই লোকটা কে?” আরো অস্পষ্ট কিছু উত্তর। আমরা টঙ্গীর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বললেও আব্বা প্রমিত ভাষায় কথা বলতেন। দাদা মারা যাওয়ার পর সাত বছর বয়সে আব্বা ঢাকা আসেন, তার পুরো জীবনটাই কাটে ধানমন্ডির কোন এক খান সাহেবের বাড়ি।
আমার তখন প্রায়ই আব্বার যুবক চেহারা আর নানান কর্মকাণ্ডের কথা মনে পড়তো। যদিও আমার যখন জন্ম আব্বার বয়স তখন পঞ্চাশ পেরিয়েছে। আব্বা রাজনৈতিক বিষয়াদির খোঁজ রাখতেন, বাসায় থাকলেই টিভিতে নিয়মিত খবর দেখতেন। ছবি কিংবা নাটক দেখা খুবই অপছন্দ করতেন। তবে আব্বা প্রায়ই তার এক সহকর্মী বন্ধুকে নিয়ে ইরাকের একটা সিনেমা থিয়েটারে গিয়ে ছবি দেখার অভিজ্ঞতার কথা বলতেন আর স্বভাবসুলভ হো হো করে হাসতেন। ঘটনাটার সারমর্ম এমন- ছবিতে একটা ঘোড়া দৌঁড়াতে থাকলে আব্বার বন্ধু ভয়ে থিয়েটার থেকে বের হয়ে যায়, সে ভেবে নেয় ঘোড়াটা তার দিকে ছুটে আসছে। আব্বার আর পুরো ছবি দেখা হয় না। দুই সংসার সামলানোর নানান কথাও আমার তখন মনে পড়ে, মনে পড়তো আব্বার মারমুখী আচরণের কথা। মানুষ হিসেবে আমার আব্বা বোকা ছিলেন, আব্বা কি তা বুঝতেন!
চোখের সামনে আমি একজন মানুষকে ধীরে ধীরে নিমোর্হ হতে দেখলাম এবং দেখলাম একজন মানুষ শুধু মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে, তাঁর আর কোন বিশেষ কাজ নেই। এবং একদিন আমিও খেয়াল করলাম ছবি দেখার রুচিতে আমার আমূল পরিবতন ঘটেছে। আগে আমি তুমুল আগ্রহে যে ছবিগুলো দেখতাম তা কন্টিনিউ করা আমার জন্য কঠিন হয়ে উঠলো, বরং ধীর লয়ের ছবির প্রতি আমি বিশেষ টান অনুভব করতে শুরু করলাম, আমার চারপাশটা থেমে গেল।
করোনার মধ্যে আব্বা চলে গেলেন, ২০২১ সালের ২৬ মার্চ। আমি যখন আব্বার লাশের পাশে স্থির বসে আছি তখন চারপাশে স্বাধীনতা দিবসের উচ্ছ্বাস, চারপাশ থেকে ভেসে আসে নানান সুরের দেশাত্ববোধক গান। আমার সবকিছু থেমে যাওয়া কিংবা স্ট্রেচারে পড়ে থাকা আমার প্রিয়তম বাবার রুক্ষ বিষণ্ন চেহারা কিংবা এই যে টানা তিন দিন কি ভীষণ শরীর ত্যাগের যন্ত্রণা আব্বা ভোগ করলেন তার কিছুতেই কারো কিছু যায় আসে না। আমার চারপাশের মানুষেরা তাদের মত করেই জীবন উদযাপন করলেন। আব্বা মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে নির্মাতা মাহদী হাসান ফোন করে টরেন্টোতে আদিমের সাবমিশনের বিষয়টা আমাকে কনফার্ম করলেন, আমি শান্ত গলায় মাহদীকে বললাম ‘‘ আমি হসপিটালে আছি, আর কিছু সময়ের মধ্যে আমার আব্বা মারা যাচ্ছেন!” যদিও আব্বার চলে যাওয়ার শারিরীক যে যন্ত্রণা, আর আমার ভেতরের যে হাহাকার এরমধ্যেও টরোন্টোর কথা জেনে আমি কিছুটা সময়ের জন্য স্বস্তি টের পাই।
আব্বা বেঁচে থাকতেই একটু একটু করে আদিমের কাজ শেষ করি, এরমধ্যে আব্বা চলে গেলেন। আদিম নির্মাণ করতে গিয়ে নানান মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছি, এরমধ্যে পাঁচ বছর হয়ে গেলো, কিন্তু কাউকে আদিমের বিষয়ে কোন সুসংবাদ জানাতে পারছি না! এমন পরিস্থিতিতে হতাশ হওয়া কোন দূরের ঘটনা না। আমি চাকরি করার চিন্তা করি কিন্তু প্রকোশলী বিদ্যায় পড়লেও ততোদিনে সব ভুলে গেছি, ইন্টারভিউ ফেইস করার সাহস নেই। কেমন করে যেন আমার মধ্যে ব্যবসায়িক চিন্তা ঘুরঘুর করতে শুরু করলো, যতদূর মনে পড়ে এই চিন্তার পেছনে বীথির অবদান রয়েছে।
গোল্লাছুট নাম দিয়ে আমি নারিকেলের নাড়ুর বিজনেস শুরু করি। বীথি, সুমি, অ্যানি, দিথী, ওরা বাসায় আমাকে নাড়ু বানিয়ে দেয় আমি তা সাইকেলে করে দোকান দোকানে ঘুরে বিক্রি করি। এবং আমি বুঝতে পারি আমার মার্কেটিং স্কিল বেশ ভালো। শুরুত একটু ঝামেলা হলেও অল্পদিনেই আমি দোকানিদের কনভিন্স করতে শুরু করি। ব্যবসার প্রসার ঘটে, সাইকেল ছেড়ে ভাইয়ের পরামর্শে আমি একটা ইলেকট্রিক স্কুটার কিনি, যা আমার ব্যবসার গতিকে আরো বাড়িয়ে দেয়। মনে হতে থাকে ছবি আর বানাবো না, ব্যবসায়ী হবো, কারণ ততোদিনে তীব্র অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে আর আদিমেরও কোন ভবিষ্যৎ দেখছিলাম না।
শীতে নাড়ুর চাহিদা ভালো, আমি টঙ্গীর বাইরেও গোল্লাছুটের মার্কেটিং করতে শুরু করি। লোকজন আগ্রহ দেখায়। কিন্তু চার্জার বাইক হওয়ায় খুব বেশি দূর যেতে পারিনা। সারাক্ষণই চার্জ ফুরিয়ে যাওয়ার ভয় কাজ করে। ব্যবসায়িক অবস্থাও ভালো, আমি একটা রেগুলার স্কুটি কিনে ফেলি। চার্জার স্কুটি দিয়ে হাবীব আর আনাইরা টঙ্গী, টঙ্গীর আশপাশে গোল্লাছুট নিয়ে যায়, আর আমার বিচরণ গাজীপুর সদর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ব্যবসার সুবাদে নানান মানুষের সঙ্গে কথা হয়, পরিচয় ঘটে, তখন প্রায়ই আদিম নির্মাণের শুরুর দিকের স্মৃতি মনে পড়তে থাকে। আবার ছবি নির্মাণের তাড়না একটু একটু করে জন্মালেও পাত্তা দেই না, ব্যবসাই করবো। মাস ছয়ের মধ্যেই পুরোদুস্তর ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছি। বিগড়ে যাওয়া সন্তানকে কর্মঠ দেখে আমার মাও মনে মনে ভীষণ খুশি, বুঝতে পারি।
আমাদের দেশের বাজারের অবস্থা এত আনস্টেবল! ক্রমাগত নাড়ুর কাঁচামালের দাম বেড়ে চলেছে। লাভের পরিমাণ কমতে থাকে, গোল্লাছুটের দাম বাড়ালেও কাস্টমার হারাবো। আবার তুলনামূলক কম দামে কেনা গুড়ের মানও খুব একটা ভালো না, মনে হচ্ছিল মানুষকে এসব কি খাওয়াচ্ছি! অন্যদিকে নাড়ু বানাতে গিয়ে আমার ছোট্ট কারখানার লোকজনের প্রায়ই কোমড় ধরে যাওয়ার অভিযোগ শুনি। এদিকে গরমের মাত্রা বাড়ায় নাড়ু নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার তখন অন্য বিজনেসে শিফট্ হওয়ার অবস্থা থাকলেও ভেতরে আমার অজানা বিষন্নতা ভর করেছে ততোদিনে, ছবি নির্মাণের ভাবনা দূরে থাক, এক লাইন কবিতাও উঁকি দিবে না, এ কেমন সময় পার করছি!
অন্যদিকে দোকানিদের অনেকেই আমার সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করলেও কেউ কেউ খুবই বাজে ব্যবহার করতে শুরু করলো, হয়তো এটাই স্বাভাবিক ব্যবহার আমি অভ্যস্ত নই বলে তা নিতে পারছিলাম না, এমনটাও হতে পারে। আবার অনেকেই সুন্দর ব্যবহার করলেও তাদের আচরণে আমি বুঝতে পারি তারা আমাকে হকার হিসেবেই ট্রিট করছেন কিন্তু ভেতরে আমিতো একজন আর্টিস্ট! একদিন এক দোকানি আমাকে আচমকা ধমকাতে শুরু করলেন, আমি কারণ বুঝতে পারছিলাম না, পরে সে জানালো আমার প্রডাক্টটা আমাকেই সাজাতে হবে , আমি সবসময় তার হাতে কেন তুলে দেই! আমি তার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে নিজের অনভিজ্ঞতার দ্বায় স্বীকার করার পরেও সে থামলেন না। এমন আরো কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনায় প্রায়ই আমার মন খারাপ হয়ে যেত।
সবমিলিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরে গোল্লাছুট বিক্রি করা আমার কাছে যুদ্ধের মত মনে হতে লাগলো, যুদ্ধ শেষে খালি বাক্সটা নিয়ে আমি যখন বাড়ি ফিরতাম প্রায়ই আমার চোখ ছলছল করতো। চোখের পানি গড়িয়ে পড়লে আমি আরামবোধ করতাম। নানান জায়গায় স্কুটিটা থামিয়ে নির্মোহ চোখে নিজের দিকে তাকাতাম, দাঁড়িয়ে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ধীরে ধীরে ভেতরে অতল জমাট বাধতে শুরু করে। মনে হতে থাকে আমি এই সময়টাই শ্যুট করবো!
চলবে…..









