এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা নাহিদ ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে একাধিক ক্লু পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে অপ্রতিমের গতিবিধি, তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের অবস্থান এবং মায়ের আইফোনটি উদ্ধারের বিষয়টি সামনে রেখে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার সন্দেহে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। এরই মধ্যে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক ক্লু পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোনটিই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ ছিল কি না, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত উদ্ঘাটন করা হবে। ঘটনায় যতজনই জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কয়েকজন পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানাধীন ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয় অপ্রতিম।
এরপর আর বাড়ি ফেরেনি সে।
পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেও তার সন্ধান না পেয়ে ওইদিন সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার।
নিখোঁজের পর থেকেই অপ্রতিমকে উদ্ধারে পুলিশ ও স্বজনরা তৎপর হয়ে ওঠেন। তার সর্বশেষ অবস্থান শনাক্তের পাশাপাশি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজও পর্যালোচনা করা হয়।
কিন্তু রাত পেরিয়ে গেলেও তার সন্ধান মেলেনি।
শনিবার দুপুরে কোটবাড়ি এলাকার দক্ষিণ মোড়ের দক্ষিণ পাশে একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
তদন্তে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার আগে কার সঙ্গে ছিল এবং তার গতিবিধি কোথায় ছিল এই দুই প্রশ্ন।
একাধিক সূত্রের দাবি, তুহিন নামে এক যুবক বিকেল থেকে অপ্রতিমের সঙ্গে ছিল। হত্যাকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। বর্তমানে ওই যুবক পুলিশের হেফাজতে রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে তুহিনের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এখনো পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
তদন্তকারীদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটি। নিখোঁজ হওয়ার সময় ফোনটি তার সঙ্গে ছিল। মরদেহ উদ্ধারের পরও ফোনটির সন্ধান পাওয়া যায়নি।
ফলে ফোনটি কোথায়, সেটি কে ব্যবহার করেছে এবং নিখোঁজ হওয়ার পর ফোনটির অবস্থান কোথায় ছিল এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের স্থান নিয়েও তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন।
শনিবার সকালে কোটবাড়ি এলাকার দক্ষিণ মোড়ের দক্ষিণ পাশে বাঁশ কাটতে গিয়ে প্রথম মরদেহটি দেখতে পান স্থানীয় কয়েকজন।
প্রথম প্রত্যক্ষদর্শী আবদুল কাদের জিলানীর ভাষ্য, তারা বাঁশ কাটতে ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। সঙ্গে মোবাইল ফোন বা ঘড়ি না থাকায় সঠিক সময় বলতে না পারলেও আনুমানিক সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে ঘটনাটি দেখতে পান তারা।
তিনি বলেন, তার সঙ্গে থাকা এক ছেলে ওই স্থানে কেউ ঘুমিয়ে আছে বলে জানায়। পরে কাছে গিয়ে তারা দেখতে পান, পড়ে থাকা ব্যক্তির মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। বিষয়টি দেখে তারা ভয় পেয়ে যান।
পরে মামুন নামে একজনকে বিষয়টি জানানো হয়। অপ্রতিম নিখোঁজ থাকার তথ্য জানার পর তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি শনাক্ত করেন।
এখন তদন্তকারীদের সামনে প্রশ্ন অপ্রতিম নিজে ওই নির্জন স্থানে গিয়েছিল, নাকি তাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?
অপ্রতিমের পরিবারের সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, মায়ের আইফোনটি নিয়েই সে বাসা থেকে বের হয়েছিল। মরদেহ উদ্ধারের পর ফোনটি না পাওয়ায় তদন্তে এ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে পুলিশ এখনো নিশ্চিত করে বলেনি যে ফোন ছিনিয়ে নেওয়াই হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল।
কুমিল্লার পুলিশ সুপারও বলেছেন, শুধু আইফোনকে কেন্দ্র করেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে কি না, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল, সেটি তদন্ত করে বের করা হবে।
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশ তার সর্বশেষ অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করেছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তদন্তে এসব ফুটেজের পাশাপাশি অপ্রতিমের সঙ্গে শেষ সময় কারা ছিল, তার সঙ্গে কার যোগাযোগ হয়েছিল এবং নিখোঁজ হওয়ার পর সম্ভাব্য কোন পথে তাকে নেওয়া হয়েছিল এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে।
আইফোনটি উদ্ধার করা গেলে সেটির অবস্থান, ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। একই সঙ্গে অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং তাদের গতিবিধিও যাচাই করা হচ্ছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক ক্লু পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম বলেন, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুলিশ, ডিবি ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
তবে শেষ পর্যন্ত তাকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
প্রক্টর আরও বলেন, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটিও পাওয়া যায়নি।
এদিকে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেন।
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে নিখোঁজের ঘটনায় অপেক্ষার অবসান হলেও এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং মায়ের আইফোনটির সন্ধান পাওয়া।
পুলিশের দাবি, পাওয়া ক্লুগুলো যাচাই করে দ্রুতই ঘটনার রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা চলছে।









