এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
ড. আজিম ইব্রাহিম: প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর সংকট সমাধানে আবারও আঞ্চলিক কূটনীতির দিকে তাকাচ্ছে বাংলাদেশ।
চলতি মাসে ঢাকা জানিয়েছে, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে চীন ও মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গার বাস্তুচ্যুতি শেষ করতে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন। বাংলাদেশ বরাবরই বলে আসছে, প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই।
এই প্রক্রিয়ায় চীনের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—দুই দেশের সঙ্গেই চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশেই চীনের বড় অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে এবং বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতার প্রতিও বেইজিংয়ের সরাসরি আগ্রহ রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে চীন দীর্ঘদিন ধরেই কূটনৈতিকভাবে যুক্ত। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় কাঠামো গঠনে সহায়তা করেছিল দেশটি। এর লক্ষ্য ছিল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সহজ করা এবং রাখাইন রাজ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সমস্যা হিসেবে না দেখে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত একটি সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
রাখাইনে স্থিতিশীলতা ফিরলে চীনও বিভিন্নভাবে লাভবান হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়টি। চীনের আঞ্চলিক যোগাযোগ পরিকল্পনায় রাখাইনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে চীন চায়না-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডরের বিভিন্ন প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে। এর মধ্যে কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর অন্যতম। মিয়ানমারের উপকূল থেকে চীনে যাওয়া তেল ও গ্যাস পাইপলাইনও এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
গত জুনে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের চীন সফরেও দুই দেশ করিডরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে অঙ্গীকার করেছে।
তবে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এসব অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, নিরাপদ পরিবহনপথ এবং কার্যকর স্থানীয় অর্থনীতি। রাখাইনের বর্তমান সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতি এসবের বিপরীত পরিস্থিতি তৈরি করছে।
বাংলাদেশের সঙ্গেও চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দ্রুত বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ বছরের চীন সফরে অবকাঠামো, বিনিয়োগ, বন্দর, জ্বালানি ও আঞ্চলিক যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে যুক্ত করে একটি অর্থনৈতিক করিডর নিয়েও আলোচনা চলছে। চলতি মাসেও ঢাকা ও বেইজিংয়ের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
ফলে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে আলাদা কোনো বিষয় নয়। রাখাইনে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা হলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুধু সীমান্ত পার করে মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে টেকসই হবে না। প্রত্যাবাসনের পর তাদের জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার বিকল্প হিসেবে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে দেখা যাবে না। তবে সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা হলে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন একটি রাজনৈতিক সমাধানকে দীর্ঘস্থায়ী করার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে চীনের বিশেষ সক্ষমতা রয়েছে। মিয়ানমারের সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ, বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং বড় অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগের সক্ষমতা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে চীনকে অন্য অনেক দেশের তুলনায় আলাদা অবস্থানে রেখেছে।

মিয়ানমারের ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপ থাকলেও চীন দেশটির সরকারের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক বজায় রেখেছে। একই সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গেও সম্পর্ক গভীর করেছে। যদিও এতে কূটনৈতিক সাফল্যের নিশ্চয়তা নেই। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতিকে আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল করে তুলেছে।
তবু চীনের এই যোগাযোগ একটি সম্ভাবনা তৈরি করে। ধীরে ধীরে স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের পরিবেশ, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও রাখাইনে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার দিকে এগোনো গেলে এর সুফল শুধু রোহিঙ্গাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের শরণার্থী চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। মিয়ানমার গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরে পেতে পারে। চীন পেতে পারে আরও নিরাপদ অবকাঠামো ও শক্তিশালী আঞ্চলিক যোগাযোগ। একই সঙ্গে বাড়তে পারে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সংযোগ।
নিরাপত্তার দিক থেকেও সংকটের সমাধান গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটের সঙ্গে দারিদ্র্য, শিক্ষার ঘাটতি, মানবপাচার, অনিয়মিত অভিবাসন ও সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নিয়োগের মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এসব ঝুঁকি কমানো পুরো অঞ্চলের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে টেকসই সমাধানের পথে বড় প্রশ্নগুলো থেকেই যাচ্ছে। রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, নাগরিকত্ব, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং রোহিঙ্গারা ফিরে গেলে তাদের বসবাসের এলাকার প্রশাসনিক ব্যবস্থা—সব বিষয়েই সমাধান প্রয়োজন। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের কারণে এসব প্রশ্ন আরও জটিল হয়েছে।
তবু চীনের অবস্থান দেশটিকে আলোচনার প্রয়োজনীয় পক্ষগুলোকে এক জায়গায় আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার সুযোগ দেয়। রাজনৈতিক সমাধান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে পরস্পরের বিকল্প হিসেবে না দেখে একই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে একটি সম্ভাব্য পথ।
লেখক: ওয়াশিংটনভিত্তিক নিউ লাইনস ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসির স্পেশাল ইনিশিয়েটিভস বিভাগের পরিচালক।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আইয়ের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









