চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের সোনাপাহাড়ে কয়েকজন মিলে ঘন করে দেশি গাছের চারা লাগিয়েছিলেন। জাপানি মিয়াওয়াকি পদ্ধতি, যেখানে অল্প জায়গায় গাছ বসানো হয় গায়ে গায়ে। তেরো মাস পর জায়গাটা দেখতে বনের মতো হয়ে গেল। সরকারি প্রকল্প ছিল না, বিদেশি অনুদানও না, নিজেদের উদ্যোগে করা।
ওই গাছগুলো এখন প্রতিদিন বাতাস থেকে কার্বন টানছে। আর ঠিক এই টানাটুকুর জন্য ইউরোপ-আমেরিকা-জাপানের কোম্পানিগুলো টাকা দিতে রাজি।
বিষয়টা শুনতে অদ্ভুত। কিন্তু বিশ্বজুড়ে ৯০০ কোটি ডলারের একটা বাজার দাঁড়িয়ে আছে ঠিক এই কারণে। যে প্রতিষ্ঠান নিজের কারখানার ধোঁয়া কমাতে পারছে না, সে অন্য দেশের কোনো প্রকল্প থেকে কার্বন কমানোর স্বীকৃতি কিনে নেয়। এক টন কার্বন কমানোর স্বীকৃতি মানে এক কার্বন ক্রেডিট।

বাংলাদেশ এই বাজারে নতুন নয়। ২০০৬ সাল থেকে ইডকল সৌর গৃহ ব্যবস্থা আর উন্নত চুলার প্রকল্প দিয়ে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার তুলেছে। কিন্তু চুলা জ্বালিয়েছে যে গৃহিণী, কিস্তি শোধ করেছে যে পরিবার, তাদের কেউ জানেই না যে তাদের কাজের একটা দাম বিদেশে নির্ধারিত হয়েছিল।
এখন দুটো কারণে প্রশ্নটা নতুন করে সামনে এসেছে।
এক, ছাদের সোলার নিয়ে সরকারের তাগিদ। নেট মিটারিংয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে দিলে ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা ৫০ পয়সা দেওয়ার ঘোষণা এসেছে, এক বছরে ছাদ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট আনার কথা বলছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
দুই, কার্বন ক্রেডিটের নিয়মকানুন গত এক বছরে অনেকটা বদলে গেছে।
তাহলে ছাদে প্যানেল বসালে বিদ্যুতের দামের বাইরে কার্বন ক্রেডিট থেকেও কিছু আসবে? প্রশ্নটা অযৌক্তিক নয়, কিন্তু উত্তরটা যা ভাবা হচ্ছে ঠিক তা নয়। সহজ পথটা বরং সোনাপাহাড়ের দিকেই।
নিয়ম বদলেছে, বেড়েছে সুযোগ
গত বছর পর্যন্ত বলা যেত, দেশে কার্বন ক্রেডিটের কোনো জাতীয় কাঠামো নেই। এখন আর সেটা সত্যি নয়।
প্যারিস চুক্তির আর্টিকেল ৬-এর জন্য মনোনীত জাতীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করছে পরিবেশ অধিদপ্তর। ২০২৫ সালের শেষে তারা একটা খসড়া কার্বন মার্কেট ফ্রেমওয়ার্ক আর একটা ‘পজিটিভ লিস্ট’ জনমত যাচাইয়ের জন্য খুলে দেয়। ওই তালিকায় কোন কাজগুলো ক্রেডিট পাওয়ার যোগ্য তা লেখা আছে, যেমন নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরসেচ, ইটভাটার আধুনিকায়ন, মিথেন হ্রাস, ধান চাষের পদ্ধতি বদল, বনায়ন, ব্লু কার্বন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ।
জাতীয় রেজিস্ট্রি তৈরির জন্য বিশ্বব্যাংক দিয়েছে ২৪ লাখ ডলার। বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রথম আর্টিকেল ৬ অনুযায়ী কার্বন লেনদেন হয়ে গেছে। তার আগের বছর ইডকলের সঙ্গে আলাদাভাবে আরও ১ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার ডলারের একটা ক্রয়চুক্তি হয়েছিল, যার আওতায় ৩৩ লাখ সৌর গৃহ ব্যবস্থার নির্গমন হ্রাস কেনা হবে।
সুযোগ বেড়েছে, এখন দেখার বিষয় কারা সুযোগ নিতে পারবে।
আমিনবাজারে দারুণ উদ্যোগ, তবে জনগণের সুযোগ নেই
সাভারের আমিনবাজারে ল্যান্ডফিলের ময়লা সরিয়ে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রের জায়গা তৈরি হচ্ছে। কাঁচামাল ঢাকার প্রতিদিনের প্রায় তিন হাজার টন বর্জ্য, বিনিয়োগ চীনের সিএমইসি গ্রুপের, গ্রিডে বিদ্যুৎ যাওয়ার লক্ষ্য ২০২৮ সাল।

কার্বনের হিসাবে প্রকল্পটা যুক্তিসংগত, কারণ খোলা ল্যান্ডফিলে পচা বর্জ্য থেকে মিথেন বের হয়, আর মিথেন কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে অনেক বেশি তাপ ধরে রাখে। কিন্তু এখানে সাধারণ মানুষের ঢোকার জায়গা নেই। জমি সরকারের, বিনিয়োগ বিদেশি কোম্পানির, ক্রেডিটের আয়ও যাবে প্রকল্প মালিকের ঘরে। পাশের বাসিন্দারা গত ডিসেম্বরে কোন্ডা স্কুল মাঠে গণশুনানি করে প্রকল্পটি বাতিলের দাবি তুলেছিলেন।
এটা যেহেতু সরকার ও বিদেশি বিনিয়োগকারীর উদ্যোগ, সেজন্য সাধারণ মানুষের আয় হয় না। আয় হয় ছোট ছোট কাজ একসঙ্গে জড়ো করে একসঙ্গে করলে।
ছাদের সোলার: কী করলে ক্রেডিট মিলবে
সরকার যখন ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা ৫০ পয়সা প্রণোদনা দিয়ে নিজের লক্ষ্য পূরণ করাচ্ছে, তখন ‘অ্যাডিশনালিটি’ প্রমাণ করা কঠিন। দেখাতে হবে, ক্রেডিটের আয় না থাকলে কাজটা হতোই না। প্রণোদনা থাকলে সেই যুক্তি খাটে না। তার ওপর একই নির্গমন হ্রাস সরকার নিজের এনডিসির খাতায় তুললে আর বিদেশে বিক্রি করা যায় না।
তবু কিছু সুযোগ আছে।
এনডিসির নিঃশর্ত অংশের বাইরে যে কাজ, সেখানে অনুমোদন পাওয়ার সুযোগ বেশি। প্রকল্প সাজানোর আগে এই জায়গাটা পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছ থেকে লিখিতভাবে জেনে নেওয়া দরকার।
নেট মিটারিংয়ের বাইরের সোলারেও সুযোগ থাকে। অফ-গ্রিড এলাকা, মিনিগ্রিড, চর ও দুর্গম জনপদের সিস্টেম, যেখানে গ্রিডে বিক্রির সুযোগই নেই, সেখানে আর্থিক বাধা প্রমাণ করা সহজ। ইডকলের সৌর গৃহ ব্যবস্থার ক্রেডিট এভাবেই স্বীকৃতি পেয়েছে।
সবচেয়ে পরিষ্কার সুযোগ সোলার সেচপাম্পে। ইডকলের হিসাবে দেশে সৌরচালিত পাম্প চালু আছে প্রায় ১ হাজার ৫২৩টি, আর ডিজেলচালিত পাম্প প্রায় ১২ লাখ ৪০ হাজার, যেগুলোতে বছরে পোড়ে প্রায় ১০ লাখ টন ডিজেল। তথ্য বেশ স্পষ্ট, হিসাবও সহজ। পজিটিভ লিস্টেও সৌরসেচ আছে। এধারায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং বস্তি-ঘনবসতি এলাকায় কমিউনিটি সৌরপ্রকল্প নিয়ে আগানো যেতে পারে।
গাছেই সবচেয়ে বড় সুযোগ
নতুন সরকারের ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচির গাছগুলো বড় হলে বছরে প্রায় ৫৬ লাখ টন CO₂ শোষণ সম্ভব। টনপ্রতি ২০ ডলার ধরলে বছরে ১১ কোটি ডলার। কর্মসূচি এমনিতেই চলছে, শুধু হিসাব রাখার কাঠামোটা যোগ করতে হবে।
দেশের বিভিন্ন চর এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর জমি পড়ে আছে, এসব এলাকায় বনায়নের সম্ভাবনা সবচেয়ে শক্তিশালী। যমুনা, পদ্মা ও মেঘনার চরে নতুন জেগে ওঠা জমিতে আগে গাছ ছিল না, তাই আগের অবস্থা প্রমাণ করা সহজ। সঙ্গে মাটি ধরে রাখার লাভটাও পাওয়া যায়। সরকারও ইতিমধ্যে নতুন ধরণের ঘাস দিয়ে মাটি আটকানোর পরিকল্পনা করছে।
কাজটা কীভাবে হয়, সেটাও জেনে রাখা ভালো। চরের মাটি বালুমিশ্রিত, প্রতি বর্ষায় ডোবে, গরু-ছাগল ছেড়ে দেওয়া হয়। তাই জমিটা আগে ভাগ করে নেওয়া দরকার, বাঁধের ঢাল আর উঁচু অংশে সারি বেঁধে গাছ, মাঝের নিচু জমিতে ধইঞ্চা বা কাশ দিয়ে মাটি বাঁধা, পানির কিনারে বেত বা ঝাউজাতীয় গাছ। লাগানোর সময় বর্ষা নামার পর, যখন পানি সরেছে কিন্তু মাটিতে রস আছে। নিচু জায়গায় মাটির ঢিবি তুলে তার ওপর চারা বসাতে হয়, নইলে পরের বন্যায় ডুবে যাবে।
চারা বাছাইয়ের নিয়ম সহজ, যেসব গাছ ওই চরে এমনিতেই জন্মায়। বাবলা, শিশু, তাল, খেজুর, ইপিল-ইপিল চরের অবস্থা সহ্য করতে পারে। বিদেশি দ্রুতবর্ধনশীল গাছ প্রথম দিকে ভালো দেখায়, কিন্তু ভাঙনের সময় শিকড় ধরে রাখতে পারে না। তালিকাটা আবার এলাকাভেদে বদলায়, সিরাজগঞ্জের চর আর ভোলার চরে একই গাছ সমান চলে না, তাই স্থানীয় বন নয়তো কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া দরকার।
তবে চরে বনায়নের ঝুঁকিটা প্রথম দুই বছরে, গবাদিপশু আর ভাঙন। চারার চারপাশে বেড়া আর গ্রামের কাউকে পাহারার দায়িত্বে রাখার খরচটুকু বাদ দিলে পুরো প্রকল্পই মাঠে মারা যায়।
শহরের জন্য আছে মিয়াওয়াকি, সেই সোনাপাহাড়ের পদ্ধতি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও এভাবে বনায়ন শুরু করেছে, পাঁচ বছরে পাঁচ লাখ গাছের কথা বলা হয়েছে। স্কুলের মাঠ, মসজিদ চত্বর, অফিসের পেছনের জমি, পরিত্যক্ত খাসজমি, এসব ছোট ছোট টুকরো মিলিয়ে একটা পৌরসভা একটা প্রকল্প দাঁড় করাতে পারে।
উপকূলে ম্যানগ্রোভের সুযোগও আছে, ব্লু কার্বন পজিটিভ লিস্টে আছে আর বিশ্ববাজারে এর দামও বেশি।
শর্তটা কঠিন এক জায়গায়। গাছ লাগানো নয়, গাছ বাঁচিয়ে রাখাই আসল কাজ। নিয়ম অনুযায়ী বিশ থেকে ত্রিশ বছরের প্রতিশ্রুতি লাগে, প্রতি বছর গাছ গোনার হিসাব দিতে হয়। জমির মালিকানা অস্পষ্ট থাকলে বা পাঁচ বছর পর গাছ কেটে ফেলা হলে ক্রেডিট বাতিল।
ঘরের কাজ থেকেও আয় হয়
উন্নত রান্নার চুলায় কাঠ কম পোড়ে, ধোঁয়া কমে, নির্গমনও কমে। পাঁচশো পরিবারে চুলা দিলে বছরে ৫০০ থেকে ৮০০ টন CO₂ কমে। টনপ্রতি ৫ থেকে ১০ ডলার ধরলে বছরে আয় দাঁড়ায় ২৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার ডলার। ইডকল এই খাতে ৪১ লাখের বেশি চুলা বসিয়েছে।
গোবর খোলা জায়গায় পচলে মিথেন বের হয়, বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে গেলে সেটাই রান্নার গ্যাস হয়, সঙ্গে জৈব সার। তিন-চারটি গরু থাকলেই সম্ভব। দেশে এ পর্যন্ত হয়েছে ৭১ হাজারের কিছু বেশি।
পৌরসভার কম্পোস্ট প্ল্যান্টে পচনশীল বর্জ্য গেলে ল্যান্ডফিলের মিথেন কমে, সারও বিক্রি হয়। বর্জ্য আলাদা করার কাজটা করে প্রতিটি বাড়ি, তাই ভাগের দাবিও তাদেরই।
ধানের জমিতে অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং পদ্ধতিতে সারাক্ষণ পানি না রেখে পর্যায়ক্রমে শুকানো হয়। মিথেন কমে, সেচের খরচও কমে। জাপানি প্রতিষ্ঠান মিৎসুই আড়াই লাখ হেক্টর জমিতে এমন প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছে।
একা নয়, দলবদ্ধ হলে সুবিধা
নিবন্ধন, মেথডলজি, তৃতীয় পক্ষের যাচাই, বছরের পর বছর মনিটরিং রিপোর্ট, এসবে ১৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার লেগে যায়। একজন কৃষকের বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের জন্য এই খরচ অসম্ভব। এক লাখ বাড়িতে হলে সেটাই ভাগ হয়ে যায়।
ইডকল ২০০৩ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ৪০ লাখের বেশি সৌর গৃহ ব্যবস্থা বসিয়েছে। পরিবারগুলোকে পুরো দাম দিতে হয়নি, অংশীদার সংস্থার মাধ্যমে দুই-তিন বছরের কিস্তিতে ঋণ দেওয়া হয়েছে। আদায়ের হার ছিল ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত। একই কাঠামোয় হয়েছে ৪১ লাখ উন্নত চুলা আর ৭১ হাজার বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, সব মিলিয়ে এড়ানো গেছে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টন নির্গমন।
কাজটা করেছে পরিবারগুলো। ক্রেডিটের টাকা এসেছে ইডকলের নামে, কারণ কাগজের ঝামেলাটা তারা সামলেছে। এই জায়গাটা এবার সমবায় সমিতি, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা কৃষক সংগঠনও নিতে পারে। যার কাছে পরিবারের তালিকা আর মাঠকর্মী আছে, সে-ই পারে।
স্ট্যান্ডার্ড বাছাইয়ের সময় একটা নাম জেনে রাখা দরকার, প্ল্যান ভিভো। ভেরা বা গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড বড় প্রকল্পের জন্য, আর প্ল্যান ভিভো তৈরিই হয়েছে ছোট কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জমি নিয়ে কাজের জন্য।

এর নিয়মে বলা আছে, ক্রেডিট বিক্রির আয়ের অন্তত ৬০ শতাংশ অংশগ্রহণকারীদের হাতে যেতে হবে। আরেকটা সুবিধা হলো, বনায়নের ক্ষেত্রে যাচাই শেষ হওয়ার আগেই ভবিষ্যৎ ক্রেডিটের বিপরীতে কিছু টাকা আগাম পাওয়া যায়। চারা লাগানোর সময়েই যেহেতু খরচ সবচেয়ে বেশি, এই আগাম টাকাটা অনেক প্রকল্পের শুরু হওয়া না হওয়ার পার্থক্য গড়ে দেয়।
তবে উগান্ডার অভিজ্ঞতা থেকে একটা সতর্কতাও এসেছে। সেখানে প্ল্যান ভিভোর আওতায় কৃষকদের প্রায় ২৫ বছরের চুক্তিতে যেতে হয়েছে, আর যাদের জমি বেশি তারাই বেশি সুবিধা নিতে পেরেছে, কারণ ন্যূনতম জমির শর্ত ছোট চাষিকে আটকে দেয়।
শুরু করবেন কীভাবে, কার সঙ্গে
কার্বন ক্রেডিটের জন্য দেশে এখনো ‘ওয়ানস্টপ সেবা’ চালু হয়নি, সরকার এ বিষয়ে দ্রুত ভাবতে পারে। বর্তমানে কয়েক জায়গায় আলাদা করে যেতে হবে, আর তাদের কাছে যা জানতে চান তা লিখিতভাবে চাওয়াই ভালো।
শুরুটা হতে পারে দল গঠন দিয়ে। একক ব্যক্তির আবেদনে কেউ সাড়া দেবে না। কত পরিবার, কোন গ্রাম, কী কাজ, এই তিনটি তথ্য হাতে নিয়ে সমিতি বা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে এগোলে সুবিধা। সমবায় সমিতি নয়তো স্থানীয় সামাজিক সংগঠনদের জন্য বড় সুযোগ এটি।
এরপর শুরুর পরিবেশগত তথ্যটা লিখে রাখা (অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের দেখানো মতে)। এখন কী অবস্থা তার হিসাব না থাকলে পরে কতটা কার্বন কমল, সেটা প্রমাণ করা যায় না। কতটি পরিবার, কী জ্বালানি, মাসে কত খরচ, কতগুলো গাছ কোথায় লাগানো হলো, কোন জমিতে কোন পদ্ধতিতে ধান। এই কাজ শুরু থেকেই শুরু করা যায়, কারও অনুমতি লাগে না। বেশিরভাগ উদ্যোগ ঠিক এখানে এসে আটকায়।
নীতিগত জায়গাটার জন্য যেতে হবে পরিবেশ অধিদপ্তরে, পরিবেশ ভবন, ই/১৬, আগারগাঁও, ঢাকা। জানতে চাওয়ার বিষয় দুটি। আপনার কাজটি পজিটিভ লিস্টে আছে কি না, আর সেটি এনডিসির নিঃশর্ত অংশে পড়ে কি না। দ্বিতীয়টির উত্তর ‘হ্যাঁ’ হলে বিদেশে বিক্রির অনুমোদন পাওয়া কঠিন, তখন শুরুতেই পরিকল্পনা বদলানো ভালো।
খাত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান আলাদা। সৌর গৃহ ব্যবস্থা, বায়োগ্যাস, উন্নত চুলা ও সোলার সেচপাম্পের জন্য ইডকল, তারা অংশীদার সংস্থার মাধ্যমে কাজ করে। নেট মিটারিং ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়ে স্রেডা। বনায়নের জন্য বন অধিদপ্তরের সামাজিক বনায়ন শাখা, উপকারভোগীর সঙ্গে চুক্তির কাঠামো তাদের আগে থেকেই আছে। ধান ও সেচের জন্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার দপ্তর। বর্জ্য ও কম্পোস্টের জন্য নিজের পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন।
যাচাই আর নিবন্ধনের কাজ দল নিজে পারবে না। এটা করে দিতে পারে ইডকলের মতো প্রতিষ্ঠান, কিছু এনজিও, আর ভেরা, গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড বা প্ল্যান ভিভোতে অভিজ্ঞ পরামর্শক। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কার সঙ্গে চুক্তি করছেন, তার আগের কাজের তালিকা দেখে নিলে ভুল বা ভবিষ্যতে ঠকার শঙ্কা কম।

চুক্তি সই করার আগে
মাঠের কাজ করবে মানুষ, আয় থেকে যাবে মাঝখানের প্রতিষ্ঠানের কাছে, এটাই এই মডেলের বড় ঝুঁকি। খসড়া কাঠামোয় বেনিফিট শেয়ারিং আর অভিযোগ নিষ্পত্তির কথা আছে, তবে কথা থাকা আর কার্যকর হওয়া এক নয়।
আফ্রিকার দেশ ঘানা তাদের পরিবেশ সংস্থার ভেতরে আলাদা একটি ‘কার্বন মার্কেট অফিস’ খুলেছে, যারা হিসাব, রেজিস্ট্রি ও হস্তান্তরের কাজ দেখে।
তাই চুক্তির আগে চারটি প্রশ্ন করে নেওয়া ভালো। আয়ের কত শতাংশ পরিবার পাবে। টাকা কত দিন পরপর আসবে। ক্রেডিট কত দামে বিক্রি হলো, সেটা জানার অধিকার থাকবে কি না। আর কত বছরের জন্য বাঁধা পড়ছেন, কারণ গাছের প্রকল্পে সেটা বিশ বছরও হতে পারে।
শেষ কথা
ছাদের সোলারের প্রণোদনার মেয়াদ ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। কার্বন মার্কেট ফ্রেমওয়ার্ক এখনো খসড়া। ২৫ কোটি গাছের চারা লাগানোর কাজ এখনও চলমান।
এই সময়টুকুতেই আসল সিদ্ধান্তগুলো হবে। কারা অনুমোদন পাবে, কোন খাত বিদেশে বিক্রির জন্য খুলবে, আয় কোন পথে আসবে। নিয়ম একবার লেখা হয়ে গেলে পরে তাতে ঢোকা কঠিন, তাই এখনই জনগণের অংশগ্রহণের নিয়ম ও চাহিদার কথা বলে রাখা দরকার।
দেশে ইডকলের অভিজ্ঞতা বলছে, গ্রামের মানুষ এই কাজ বেশ ভাল পারে। ৯৬ শতাংশ কিস্তি আদায় তার প্রমাণ। বিভিন্ন ব্যাংকগুলোও এগিয়ে আসতে পারে এ ধরণের প্রকল্পে। তবে প্রশ্ন হলো, সামনের দিনগুলোতে গ্রামের মানুষদের নাম শুধু সুবিধাভোগীর তালিকায় থাকবে, নাকি কার্বন বিক্রির আয়ের ভাগীদার হিসেবেও থাকবে? যে যাইহোক, থেমে থাকলে চলবে না। গাছ লাগানো বা চুলা বদলানোর কাজটা এমনিতেই দরকার। প্রকৃতি ও পরিবেশ বাঁচানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক দূষণের হাত থেকে নিজেদের ও প্রজন্মকে রক্ষা করতে নেমে তারসঙ্গে যদি কিছু ডলার আয়ও হয়, তা বাড়তি পাওয়া।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









