ভালোবাসা কি শুধু হৃদয়ের ব্যাপার? নাকি এর পেছনেও লুকিয়ে আছে এমন কোনো হিসাব, যে হিসাব দিয়ে বোঝা যায়—কখন দুজন মানুষ আরও কাছে আসে, কখন দূরে সরে যায়, আর কখন ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক আবারও জোড়া লাগে?
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, একটি সম্পর্ক কীভাবে শক্তিশালী হয়, কোথায় দুর্বল হয়ে পড়ে, এমনকি ঝগড়ার পর কীভাবে আবার স্বাভাবিক হয়ে ওঠে—এসবও গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। অর্থাৎ, প্রেমে শুধু কবিতা নয়—সমীকরণও আছে!
ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি অব লিয়ন–১–এর গণিতের অধ্যাপক লরাঁ পুজো–মেনজুয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয় নিয়ে কাজ করছেন। বহু বছরের গাণিতিক গবেষণা, আগের বিভিন্ন গবেষণা, ঐতিহাসিক উদাহরণ এবং সম্পর্কের আচরণ বিশ্লেষণ করে তিনি প্রেমের সম্পর্ককে একটি ডায়নামিক্যাল সিস্টেম হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। ২০২৬ সালে প্রকাশিত তাঁর বই ‘Love! Valour! Equations!’–এ তিনি দেখিয়েছেন, সময়ের সঙ্গে মানুষের অনুভূতি, আচরণ, আকর্ষণ এবং একে অপরের প্রতি প্রতিক্রিয়াও পরিবর্তিত হয়।
বিষয়টা সহজ করে বললে—একদিন স্বামী বললেন, “আজ কিন্তু তোমার জন্য চা বানিয়েছি!” স্ত্রী হেসে বললেন, “চা বানিয়েছ ঠিকই, কিন্তু চিনি দিতে ভুলে গেছ!” দুজনেই হেসে ফেললেন। এই হাসিটাও কিন্তু সম্পর্কের হিসাবে একটি ছোট্ট জমা। অন্যদিকে দুজনের ঝগড়া হয়েছে। স্বামী ভাবছেন, “আগে ও ফোন করুক।” স্ত্রীও ভাবছেন, “আগে ও–ই ফোন করুক!” দুজনের হাতেই মোবাইল, কিন্তু কেউ ফোন করছেন না। অথচ একটি ফোন, একটি “ভুল হয়ে গেছে”, অথবা শুধু—“চলো, আবার কথা বলি”—এই ছোট্ট কথাটিই সম্পর্ককে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে।
ঝগড়া হওয়াটাই সমস্যা নয়। ঝগড়ার পর দুজন মানুষ একে অপরের কাছে কীভাবে ফিরে আসে, সেটাই বড় কথা।
সম্পর্ককে তাই অনেকটা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মতো ভাবা যায়। ভালোবাসা জমা হয়, যত্ন জমা হয়, আবার কষ্ট আর অভিমানও জমা হয়। ভালোবাসার হিসাব থেকে যদি শুধু তুলতেই থাকেন, একসময় ব্যালেন্স কমে যেতে পারে। গাণিতিক মডেলে এমন একটি ‘থ্রেশহোল্ড’ বা সীমা–র ধারণাও রয়েছে। সম্পর্কের শক্তি যদি দীর্ঘসময় সেই সীমার নিচে থাকে, তাহলে সম্পর্ক অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
গাণিতিক মডেল মূলত সম্পর্কের প্রবণতা ও সতর্ক সংকেত বোঝার চেষ্টা করে। ভবিষ্যতে AI-এর সঙ্গে এসব মডেল যুক্ত করে সম্পর্কের জন্য এক ধরনের ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক লরাঁ পুজো–মেনজুয়ে
তবে শেষ কথা হয়তো বিজ্ঞানের নয়—মানুষের। কারণ ভালোবাসা কোনো ক্যালকুলেটর নয়। “আমি দুঃখিত”, এক কাপ চা, একটি আলিঙ্গন, অথবা চুপচাপ প্রিয় মানুষটির পাশে বসে থাকা—কখনো কখনো সবচেয়ে জটিল সমীকরণকেও সহজ করে দিতে পারে।
গণিত হয়তো বলে দিতে পারে, সম্পর্ক কোন দিকে যাচ্ছে। কিন্তু সেটিকে কোন দিকে নিয়ে যাবেন—সেই সিদ্ধান্তটা শেষ পর্যন্ত নিতে হবে দুজনকেই। কারণ ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর সমীকরণ হয়তো খুবই সহজ—দুজন মানুষ + পারস্পরিক যত্ন + সম্মান + একসঙ্গে থাকার ইচ্ছা = ভালোবাসা। আর এই সমীকরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা কোনো সংখ্যা নয়—দুজনের মন।








